ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

‘বাবার বাড়ি এই গেরাম শ্বশুর বাড়ি ওই, তবে তোমার বাড়ি কইগো নারী’ গান টি সকল পুরুষের মনে বেদনার সৃষ্টি না করলেও নারীবাদী পুরুষ ও সকল ধরনের নারীর কোমল হৃদয়ে বেদনার সৃষ্টি করে। গানের কথা গুলো চির সত্য। যা এই দেশের হাজার হাজার নারী ভাগ্যে ঘটে থাকে। মাসুমা বেগম (ছদ্মনাম) ৫৬ বছরের গ্রামের অশিতি নারী। একটি মাত্র ছেলে ও পাঁচটি মেয়ে। সবার বিয়ে দিয়ে মাথার দায় শেষ করেছে দুই যুগ আগে। স্বামী মারা গেছে মাত্র কয়েক বছর পূর্বে। স্বামীর ১৫ কাঠা বসত ভিটা ও ২৫ কাঠার একটি বাগান ছিলো। একমাত্র ছেলে পাশের বাড়ির এক মৌলভী সাহেবর মাধ্যমে মা-বাবা উভয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বসত ভিটা নিজ নামে উইল করে নেন। বিষয়টি জানাজানি হলে মেয়েদের জামাইগণ নানা নির্যাতন শুরু করে মেয়েদের ওপর। মেয়েরা মা-বাবা উভয়ের ওপর চাপ দেয় আমের বাগানটি তাদের নামে উইল করার জন্য। নইলে স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হয়ে ঘরে ফিরতে হবে।

ঘর ফিরলে আবার মহা বিপদ। তাই মাসুমা ও স্বামী উভয়ে হাতের পাঁচ আমের বাগানটি মেয়েদের নামে উইল করে দেন ছেলের অজান্তে। কিছুদিন পর স্বামী মারা যায়। এবার মাসুমাকে ছেলের বউ নানা মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। পড়শিদের কাছে অভিযোগ করলেও সকলে হি-হি করে হাসে। এতে সে আগের পরামর্শ দাতা মৌলভীর নিকট এর বিচার দাবি করে। মৌলভী তাকে উল্টো গালি-গালাজ করে তাড়িয়ে দেয়। নিস্তার পাওয়ার আশায় কিছু দিন পর রাগ করে মেয়েদের বাড়ি চলে যায়। কিন্তু সেখানেও জামাইয়ের প্যানপ্যানানি মোটেই সহ্য হচ্ছিল না বলে আবার ছেলের কাছে আসে। ছেলে ও তার বউ তাড়িয়ে দেয়। এবার মাসুমা বেগম অগত্যা । কী করবে ভেবে কূল পায় না। সম্পদ হাত ছাড়া না করলে হয়ত মাসুমাকে এরূপ কষ্ট থাকতে হতো না। অবশেষে কোন গতি না থাকায় গ্রামের গেঞ্জু বিবি নামের এক মহিলার সাথে দ্বারে-দ্বারে ভিা শুরু করে। রাতে গেঞ্জু বিবির সাথে এক বিছানায় ঘুমায়। দিনে ভিা করে। একসময় মাসুমা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। কিন্তু কে করবে তার চিকিৎসা। সঠিক চিকিৎসা না করায় সে একদিন মারা যায়।
শুধু মাসুমা বেগম নয়, দেশে হাজার হাজার নারী তার মত করুণ পরিণতির শিকার হচ্ছে। নিজের সম্পদ ছেলে-মেয়েদের নামে উইল করার পর ছেলেরা ভাত-কাপড় না দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। অনেকের স্থান হয় বৃদ্ধ নিবাসে। আবার অনেকে ভিক্ষা করে। অথচ মা অনেক কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করে। তারপরে একদিন তাকে বাড়ি ত্যাগ করতে হয়। থাকে না তার একুল ওকুল। হতে হয় পথের ভিখারী। ভিা করে অনেক নারীকে বেঁচে থাকতে হয়। এ ধরনের অনেক নারী রয়েছে যাদের কোন গতি নেই। নেই বাড়ি-ঘর। অথচ ছেলে-মেয়েদের কষ্ট করে বড় করেছে। তাই নারীদের প্রতি দরদ দেখিয়ে কবি বলেন: তোমার বাড়ি কই গো নারী…।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়, অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি যেখানে নারীদেরকে সাধারণত পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। বাবার কাছ থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে হাত খরচ নেওয়া বা ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় ভাইকে সাথে নেওয়া ছাড়া নারী একরকম অসহায় বললে ভুল হবে না। অথচ আমরা একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে সহজেই উপলব্ধি করতে পারি যে, পুরষেরা নারীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা । এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা গুরুত্বপূর্ণ ৭টি কাজে নারীদের ওপর নির্ভরলীল। নিচে তা তুলে ধরা হলো

১.নারীরা পুরষের জীবনে শৃঙ্খলা আনেন
কর্মস্থল থেকে ফেরার পর যথেচ্ছভাবে ছুঁড়ে ফেলা মোজা জোড়া কি আপনি কখনো খুঁজে পেতেন যদি আপনার মা, বোন বা স্ত্রী সেটি তুলে এনে না রাখতো বা পরিষ্কার না করে রাখতো? বেশিরভাগ পুরুষই এ প্রশ্নের না বাচক উত্তর দিবেন। কারণ একজন নারীই বন্য ও ডেমকেয়ার বালকটিকে একজন দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন পুরুষে রূপান্তরিত করেন এবং তার জীবন ও ঘরে শৃঙ্খলা আনয়ন করেন।

২.পুরুষদের খাবারের বিষয়টিও নারীদের ওপরই নির্ভর:
ভারতের শীর্ষস্থানীয় পাঁচকরা পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও বাড়িতে রান্নার প্রশ্ন উঠলে একজন নারীর চেয়ে ভালো পাঁচক আর কেউই হতে পারেন না। তাদের উপরই এ বিষয়টি নির্ভর করে যে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কতদিন পরপর স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন, না খাবেন। এমনকি তাদের খবরদারির কারণেই আপনি কখনো বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় লাঞ্চবক্স সঙ্গে না নিয়ে বের হন না!

৩.পরিবারের নারীরাই বাচ্চাদের দেখভাল করেন:
নারীরা শুধু সন্তান জন্ম দিয়েই ক্ষ্যান্ত হন না বরং তারাই বাচ্চাদের দেখভাল ও লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেন। একজন নারী কর্মজীবী বা গৃহীনি যাই হোন না কেন সন্তান লালন-পালনের েেত্র তিনি কোনো গাফিলতি করেন না। সন্তাানদের সাথে মায়েদের স্বভাবতই খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। আর এ কারণে তারাই সন্তানদের দরকার-অদরকার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল থাকেন। মায়েরাই সাধারণত রান্না-বান্না, কেনাকাটা ও সন্তানদের বিদ্যালয় সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে বেশি সংশ্লিষ্ট থাকেন। ফলে সন্তান লালন-পালনের ইস্যুতে পুরুষরা সাধারণত স্ত্রীদের উপরই বেশি নির্ভরশীল থাকেন।

৪.পরিবারের মুরুব্বীদের দেখভালও নারীরাই করেন:
একজন নারী বিয়ের পর তার নিজ বাবা-মাকে ছেড়ে স্বামীর পরিবারে যোগ দেন। ফলে তিনি স্বামীর বাবা-মা বা শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মার মতোই আপন করে নেন। এবং তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো এমনকি ভালোবাসার চাহিদা পুরণেও প্রাণপণ চেষ্টা করেন। পুরুষরাও তাদের স্ত্রীর বাবা-মার ব্যাপারে অনেকসময় যত্মশীল হয়ে থাকেন। কিন্তু একজন পুরুষ কখনোই পরিবারের মুরুব্বীদের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ম-আত্মিয়তার ক্ষেত্রে একজন নারীর সমক হতে পারেন না।

৫.নারীরাই পুরুষদেরকে ফ্যাশন সচেতন করে তোলেন:
হাতে গোনা কয়েকজন ফ্যাশন ডিজাইনারের কথা বাদ দিলে বেশিরভাগ পুরুষেরই ফ্যাশন বিষয়ে রুচি খুব একটা ভালো নয়। পুরষদেরকে যদি তাদের বোন, প্রেমিকা বা স্ত্রীরা ফ্যাশন বিষয়ে সচেতন না করতো তাহলে তারা হয়তো চিরকালই এ বিষয়ে ভোতা থেকে যেতো। নারীরা না থাকলে পুরুষকে কে শেখাতো যে হলুদ প্যান্টের সাথে গোলাপি শার্ট মানায় না?

৬.বিপদের সময় অর্থের উৎস:
স্ত্রী যদি সবসময়ই কিছু অর্থ সঞ্চয় করে না রাখতো তাহলে পুরুষরা বিপদের সময় কার কাছে হাত পাততো? স্মরণাতীতকাল থেকেই আমাদের সমাজের নারীরা তাদের সঞ্চয়ী মানসিকতা ও মিতব্যায়ীতার জন্য আদৃত হয়ে আসছেন। যদিও পুরুষরা নারীদেরকে সাধারণত অতি বেশি খরচে হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন তথাপি বাজার থেকে ফিরে আসার পর ব্যাগ খুলে পরীা করলে দেখা যাবে যে পরিবারের প্রয়োজনাতিরিক্ত কিছুই কেনেন নি। এবং যা কিনেছেন তাও দরদাম খুব কষেই কিনেছেন!

৭.পুরুষের সাফল্যের পেছনে নারীর অবদানই সবচেয়ে বেশি:
স্মরণাতীতকাল থেকেই এই প্রবাদ-প্রবচনটি প্রচলিত আছে যে, ‘প্রতিটি পুরুষের সাফল্যের পেছনেই কোনো না কোন নারীর অবদান থাকে।’ আমাদের সমাজের নারীরা সধারণত নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে হলেও স্বামীর স্বপ্ন পুরণে সহায়তা করে থাকেন। তারাই পুরুষের প্রতিটি কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা যুগিয়ে নারীরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণার যোগান দেন।

এভাবেই একজন পুরুষ কোনো নারী তার উপর যতটা না নির্ভরশীল থাকেন তার চেয়ে তিনিই ওই নারীর উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে থাকেন। তাই প্রতিদিনই একজন নারীর জয়গান গাওয়ার জন্য একজন পুরুষ হিসেবে আপনার, আমার সবার জীবনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পরিশেষে বলতে চাই, অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান। নারীর অবদান পুরুষের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ আসুন, আমরা নারীর অধিকার, মর্যাদা সমাজে প্রতিষ্ঠা করি। এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
সহকারী শিক্ষক
হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
মোবাইল নং-০১৭০৪২৪৪০৮৯