ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

২০১১-২০১২ অর্থবছরের জাতীয় রাজস্ব বাজেট কিছু দিন পরেই ঘোষণা করা হবে। এবারের বাজেটকে প্রতিবন্ধী বান্ধব হিসেবে দেখার জন্য বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থার তথ্য মতে, আমাদের দেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। সবচেয়ে সুবিধা বঞ্চিত দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণ্য করে বিগত কয়েক অর্থবছর থেকে এদের প্রতি একটু সুনজর দিয়েই বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ফলে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা, প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ঋণ প্রদান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন সমূহকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অনুদান প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের পথকে এগিয়ে নিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

বিগত কয়েক বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে প্রতিবছর। অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা বিগত কয়েক বছরের বাজেটের দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারি যে, ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র ১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটের মোট ১৮টি খাতের ১ হাজার ৩২টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৫টি প্রকল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিলো।

২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন কে পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ১৫০ কোটি টাকা। প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি বাবদ রাখা হয়েছিলো ৬ কোটি টাকা। অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতা বাবদ রাখা হয়েছিলো ৬০ কোটি টাকা।

বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতার আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ ৬০ করে মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ ৩০০ টাকা উন্নীত করায় ৯৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো। এসিডদগ্ধ মহিলা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন তহবিলে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো। প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়ক কেন্দ্র শীর্ষক একটি নতুন কর্মসূচী গ্রহণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ৫ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা।

২০১০-১১ অর্থবছরে বাজেটে এসিডদগ্ধ মহিলা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন এবং মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানে বিশেষ তহবিল গঠন করা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা বাবদ ১০২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়ক কেন্দ্র শীর্ষক’ একটি কর্মসূচী প্রবর্তন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি, সমাজ কল্যাণ পরিষদ ও প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের এনডোমেন্ট ফান্ড ইত্যাদি বাবদ ৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

পূর্বের বাজেটকে বিশ্লেষণ করা হলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, প্রতিবন্ধী নাগরিকদের নায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তবে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কিছুটা বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ১০.৬ নং পয়েন্টে প্রতিবন্ধী কল্যাণের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে- “২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক প্রণীত প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন যুগোপযোগী ও বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ সহজ করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীদের সম্পৃক্ত না করলে তারা মর্যাদা ও সকল আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবে। সে জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নের খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে তার ১৫ ভাগ প্রতিবন্ধীদের মানব সম্পদে পরিণত করার জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষ মানব সম্পদরূপে গড়ে তুলতে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব-সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অর্থাৎ ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। যা কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব সংগঠন ও তাদের সদস্যদের শক্তিশালী করতে ব্যয় হবে।

প্রতিবন্ধীদের রয়েছে সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও অধিকার যা বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীদের সমস্যার সীমা নেই। তবে যেসব সমস্যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা তা হলো, তথ্য-প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের অভাব, নির্মাণ-কাঠামোগত পরিবেশ ও জনপরিবহন সমূহে অভিগম্যতার অভাব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব-সংগঠন কাঠামো দুর্বল, সক্ষমতা উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবিকা কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাব। ফলে বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সকল উন্নয়ন খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা যেমন উচিত। তেমনি জাতীয় ব্রেইল প্রিন্টিং প্রেস ও ইশারা ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা যুগোপযোগী, সহায়ক উপকরণ উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যানবাহনকে উপযুক্ত করার জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখার যুক্তিযুক্ত। গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য “গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিবাস” স্থাপনের জন্য বাজেটে বরাদ্দ করা দরকার। এছাড়াও জাতীয় বাজেট এর সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে দেশের যেমন উন্নয়ন হবে দ্রুত ঠিক প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীরাও আশার আলো দেখতে পারবে। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

***
লেখক- উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক,
azmal.mamun@gmail.com