ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

গত ১২ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমে স্বামীর নির্যাতনে ঢাবি শিক্ষিকা রুমানার চোখ হারানোর আশঙ্কা শিরোনামে সংবাদ পড়লাম। ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রধান চক্ষু বিশেষজ্ঞ ড. আনসারুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ওই শিক্ষিকার দুই চোখের টিস্যু মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”তার চোখ ভালো করতে এখন আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিদেশের বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতালের কোনো বিকল্প নেই।”গত ৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই শিক্ষক ধানমণ্ডি এলাকায় তার বাবার বাড়িতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন। ডা. আনসারুল হক বলেন, তাকে যে কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে তার চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো। কোনো বিবেক সম্পন্ন মানুষের পক্ষে এ ধরনের কাজ করা অসম্ভব।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের জানা গেছে, ওই শিক্ষক সাত বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। গত অগাস্ট মাসে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা যান। তারপর দেশে ফিরে আসেন এ বছর ১২ই মে। থিসিস পেপার জমা দেওয়ার জন্য আগামী আগস্ট মাসে আবারো কানাডা যাওয়ার কথা। কিন্তু বিদেশ আর না যাওয়ার জন্য স্বামী তাকে চাপ দিচ্ছিলেন। এ নিয়ে স্বামী তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার খারাপ আচরণ করেন। নির্যাতনের কাহিনী সম্বন্ধে দৈনিক মানব জমিন আজকে লিখেছে, নির্যাতন শুরুর আগে রুমের ভেতর থেকে লক করে দেয়া হয়েছিল। ছোট্ট ফুটফুটে শিশুর সামনেই নির্মম নির্যাতন চালানো হয় রুমানার ওপর। শিশুটি তার মাকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। অনেক অনুনয়, বিনয়, কান্নাকাটি, চিৎকার চেঁচামেচি করেছে আনুষা। কোন কিছুতেই পিতার হৃদয় গলাতে পারেনি ওই শিশু। রুমানার নাকের বাম পাশের অংশ কামড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। নাখ, মুখ, কানসহ শরীরের অনেক জায়গায় মাংস ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। রুমানাকে বাসার নিচে নামানোর পর যারা তাকে দেখেছে তাদের একজন বলেন, রুমানা ম্যাডামের অবস্থা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছি। তার চোখ, মুখ, গাল, নাক এবং কপাল বেয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছিল।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করা হাসান সাইদের এ নির্যাতনের কাহিনী শুনে আমরা খুবই মর্মাহত। কারণ, শিক্ষিত মানুষ যখন নিরক্ষর বা অসভ্য সমাজের কার্যকলাপ ঘটায় তখন মনে হয় দেশের নৈতিক শিক্ষা বলতে কিছুই নেই। দুই পরিবারের সম্পর্কও বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ। স্বামী-স্ত্রীর বাবারা দুজন ঘনিষ্ট বন্ধু বলে জানা গেছে। তারপরেও হাসান সাইদ ঘর জামাই থাকতো। অর্থাৎ গ্রামের নারীরা কাজ করে স্বামীকে খাওয়ায় আর স্বামী নারীকে তরকারিতে লবন কম হওয়ার অজুহাতে লাঠি দিয়ে পিটায়। তার চেয়েও জঘন্য এবং সমাজ গর্হীত কাজ করেছে হাসান সাইদ। সম্ভ্রান্ত পরিবারে এ ধরনের ঘটনা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক এবং মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান হাসপাতালে গিয়েছেন রুমানাকে দেখতে। আমরা জানি, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সংসদে ৪৫টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকুরিতে ১০ ভাগ এবং তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরিতে ১৫ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে নারীরা পিছিয়ে নেই। ক্ষমতায়ন ঘটেছে নারীর। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সমূহও কাজ করছে নিরলসভাবে। তারপরেও নারী নির্যাতন কমেনি। স্বাবলম্বী তথা আত্মনির্ভরশীল, উচ্চ শিক্ষিত, এবং সম্মানজনক পদে আসীন রুমানা ম্যাডাম যদি স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয় তবে তৃণমূল পর্যায়ের নিরক্ষর পরিবারের নারীর অবস্থান কতই যে, উদ্বেগ জনক তা কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরানুল কারীমে বলেছেন, স্বামীরা যেমন স্ত্রীদের লেবাস (পোশাক)স্বরূপ ঠিক তেমনি স্ত্রীরাও স্বামীদের লেবাস স্বরূপ। বিদায় হজ্জের ভাষণে হযরত (সাঃ) ঘোষণা করেছেন, স্বামীদের ওপর যে রকম স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে ঠিক স্ত্রীদেরও স্বামীর ওপর সেরকম অধিকার রয়েছে। তোমরা তাদের সাথে কর্কশ ব্যবহার করিও না। কারণ, তোমরা আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে তাদের ব্যবহার করছো।

আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগে কন্যা সন্তানদের জীবিত কবর দিতো। তখন নারীর কোন অধিকার ছিল না। আজকে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে নারীর প্রতি নির্যাতনের কাহিনী আইয়্যামে জাহেলীয়াত যুগকেও হার মানিয়ে দেয়। কারণ, এখনকার মানুষ সভ্য জাতি হিসেবে দাবী করে। বসবাস করে সভ্য সমাজে। হাসান সাইদ বুয়েট থেকে পাস করা একজন সভ্য সমাজের মানুষ হয়ে যে, কাজ করেছে তাতে তার দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। এটি সময়ের দাবী। শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে অশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে। আর আমরা সাইদ হাসানের কার্যকলাপে দেখলাম যে, তিনি অসভ্য মানুষের চেয়ে নিকৃষ্ট কাজ করেছেন। তিনি বুয়েটের শিক্ষক এবং শিক্ষিকাদের মান সম্মানকে ডুবিয়েছেন। তিনি ঢাবির শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মান সম্মান ডুবিয়েছেন।
পরিশেষে, হাসান সাইদকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি।