ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি নতুন কোন বিষয় নয়। প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কর্মকান্ড সুত্রপাত হয় প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে অর্থাৎ ষাটের দশকে। তখন প্রতিবন্ধিতা বিষয়টিকে প্রধানতঃ একটি মানবিক ও কল্যাণের বিষয় বলেই ধরা হতো। শুধু দৃষ্টি (অন্ধ) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী হিসেবে গণ্য করতো। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে বৃহৎ সংখ্যক যুদ্ধাহত সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় রিহ্যাবিলিটেশন ইনস্টিটিউট এ্যান্ড হসপিটাল ফর দি ডিজএ্যাবল্ড (আরআইডিএইচডি) যা পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত। এছাড়াও ইস্পাহানি (ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল), জাতীয় অন্ধ ফেডারেশনের হাসপাতাল, ফিরোজা বারি পঙ্গু হাসপাতাল ও কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসার জন্য কয়েকটি মিশনারি হাসপাতালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতার সাথে চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্য সেবার সংশি¬ষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয়। গড়ে উঠে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য জাতীয় অন্ধ সংস্থা (এনএফবি), জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি), ভোকেশনাল ট্রেনিং অব দ্যা ব্লাউন্ড, হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টার লাইফ প্রভৃতি। এর কয়েক বছর পর সরকারি ও বে-সরকারি উদ্যোগে মূক বধির ও দৃষ্টিহীনদের জন্য কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি কম।

৮০ দশকে তথা ১৯৮১ সালে ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী বর্ষ’ উদ্যাপন শেষে ১৯৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৩৭/৫২ নং রেজুলেশনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য পূর্ণ অংশগ্রহণ, সামাজিক সাম্য ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এক বিশ্ব কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় যাতে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র সমূহ সমর্থন প্রদান করে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূল পর্যায়ের সকল ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)। ১৯৯৬ সাল থেকে ইউকে কর্তৃক পরিচালিত একশন ডিজএ্যাবিলিটি এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এডিডি) তৃণমূল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ আরম্ভ করে। এছাড়াও পরবর্তীতে সংশি¬ষ্ট সংস্থা সংগঠন সমূহকে অনুকরণ করে শত শত সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সংস্থা সমূহের মধ্যে দু’ একটি ব্যতীত সব গুলো সংগঠন স্বার্থ সিদ্ধির আশায় কাজ করে। তাদের নেই দক্ষ কর্মী। নেই তাদের উপকারভোগী।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থার উন্নয়ন, প্রতিবন্ধিত্ব নিবারণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, রিসোর্স কেন্দ্র, পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং কর্মী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গবেষণা কাজ অব্যাহতভাবে করার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বিশ্বের সকল উন্নত দেশ সমূহে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালানো হচ্ছে। ফলে তারা প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হচ্ছে। এমনকি বিশ্ব বিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহে প্রতিবন্ধী বিষয়ে গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে। ডিজএ্যাবিলিটি-এর উপর অর্নাস, মাষ্টার্স ও ডিপ্লোমা কোর্স রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক গবেষণা করার প্রবণতা অদ্যাবধি চালু হয় বললেই চলে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে।

আমাদের দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বা গবেষক প্রতিবন্ধী বিষয়ক কোন বিষয়ে গবেষণা আগ্রহী প্রকাশ করে তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপর গবেষণা করে। সরকারি সিস্টেম থাকলে গবেষণা করা সহজ হতো। সংশি¬ষ্ট বিষয়ে গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেটে সংস্থান রাখা আশু প্রয়োজন। যাতে বাজেট অনুযায়ী দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হয়। নইলে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে থাকবে। আর এদের উন্নয়ন না ঘটলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে না। তাই এ বিষয়ে সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
উন্নয়নকর্মী এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
(azmal22@gmail.com)