ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

কেস স্টাডি-১:মনোয়ারা বেগম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অধিবাসী। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে সংসার। স্বামী ছোট খাট ব্যবসা করে। কিছু জমিও রয়েছে। সংসার চলে মোটামুটি ভালোভাবে। বড় ছেলে ঢাকা কলেজ থেকে এমএ (বাংলা) পাস করে একটি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করছে। মেজ ছেলেটি একটি সরকারি কলেজে ইংরেজীতে অনার্স পড়ছে। সবার ছোট মেয়ে জামিলা (ছদ্মনাম) মাদরাসাতে দাখিল পরীক্ষা দিবে আগামী বছর। মেয়েটি প্রাথমিক অবস্থায় ভালো ছাত্রী ছিলো। এখন গণিতে খুব দুর্বল। প্রাইভেট পড়তে চাইলে বাবা-মা উভয়ে বাঁধা দেয়। এমনকি মা তাকে প্রহারও করে। তারা বলে, মেয়ে মানুষকে বেশি পড়িয়ে লাভ কি? বিয়ে হলে স্বামীর ঘরে সংসার করবে। ছেলেদের পড়াতে পারলে লাভ আছে।’’ জামিলার বড় ভাইয়ের নিকট প্রাইভেট পড়ার টাকা চাই। বড় ভাই এক হাজার টাকা পাঠায় তার নামে। কিন্তু মা-বাবা উভয়ে ধমক দিয়ে টাকা কেড়ে নেয়। এভাবেই চলছে তার শিক্ষা জীবন।

কেস স্টাডি-২: নওগাঁর আজরিন খাতুনের (ছদ্মনাম) বাবা মা উভয়ে শিক্ষিত। তিন ভাই ও দুই বোন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বড় বোনের বিয়ে হয় এক ব্যবসায়ীর সাথে। আজরিন খাতুনের ভাইয়েরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স কমপ্লিট করে শিক্ষকতা করছে। মা-বাবা উভয়ে বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কোনমতে পাত্রস্থ করতে পারলেই মাথায় দায় শেষ হবে। স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে বাড়ির সব কাজ করতে হয় তাকে। কারণ ভাইদের বিয়ে হয়নি। তার বিয়ের পরে ভাইয়ের বিয়ে দিবে মহা ধুমধাম করে। মা-বাবা বলে, ‘‘বেশি পড়লে বিয়ে দিতে সমস্যা হইবে। শিক্ষিত পাত্রদের মোটা অংকের যৌতুক লাগবে। লেখা-পড়া শিখিয়ে টাকা খরচ করতে হবে আবার বিয়েতে জামাইকে যৌতুক দিতে হবে। অথচ মেয়ে চাকুরি করলে সব টাকা জামাইয়ের সংসারে খরচ করবে।’’

কেস স্টাডি-৩: শামীমা আকতার (ছদ্মনাম) বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্সে অধ্যয়ন করছে। ছিমছাম চেহারা। বাবা একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। মা গৃহিণী। ২ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে সে সবার বড়। এসএসসি পাসের পর বে-সরকারি কলেজের প্রভাষক বিয়ের প্রস্তাব দেয়। শুধু তাই নয়, একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারও বিয়ের প্রস্তাব দেন শামীমার বাবাকে। কিন্তু অভিভাবক সম্মত হয়নি। শামীমার ইচ্ছা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষের মত মানুষ হয়ে নিজের পায়ে দাড়িয়ে যোগ্য পাত্রকে বিয়ে করা। অভিভাবক এব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করে।

কেস স্টাডি-৪: জরিনা খাতুন (ছদ্মনাম) ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ১ম বর্ষে অধ্যায়ন করছে। ২ভাই ২বোন। বাবা ছোট খাট একটি সরকারী চাকুরী করে। বড় ভাই সিএ ফার্মে কর্মরত। সে দ্বিতীয় ভাই বোনদের মধ্যে। সবাই স্কুলে লেখা-পড়া করছে। তাই বাবা কষ্ট করে টাকা পাঠায়। বিভিন্ন স্থানের যোগ্য পাত্রদের নিকট থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছে। কিন্তু সে ও পরিবার উভয়ে রাজি নয়। ডাক্তারী পাস করে বিয়ে করবে।

অভিভাবকেরা কি বলে: নান্নু নামের এক জন অভিভাবক জানান, কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অমানবিক কাজ। কন্যা শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশি বৈষম্যের শিকার। এতে শুধু কন্যা শিশুর পরিবারই ক্ষতিগ্রস্থ হয় না সমগ্র জাতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

মুরশেদ হাবিব নামের এক অভিভাবক বলেন, ছেলে-মেয়ে আল্লাহর দান। কন্যা শিশুদের অবহেলা করা মোটেই উচিত নয়। ছেলে হোক আর মেয়ে হোক প্রতিষ্ঠিত হলেই পরিবারের গর্ব।
তাসলিমা বেগম নামের এক মা জানান, আমি মনে করি কন্যা সন্তান ভালো। কারণ কন্যা সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে যোগ্য পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়া যাবে। বৃদ্ধকালে ছেলেরা ভাত-কাপড় না দিলেও মেয়েরা কোনদিন মা-বাবাকে ফেলে দিতে পারে না। সে জন্য কন্যা সন্তানকে ছেলেদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

ধর্ম কী বলে:
সকল ধর্মে মতে শিশুরা নিষ্পাপ। শিশুরা পবিত্র। ইসলাম ধর্মের নেতা প্রিয় নবী হযরত মূহাম্মদ (সাঃ) শিশুদেরকে ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি পবিত্র হাদীস শরীফে ইরশাদ করেছেন, ‘‘সেই ব্যক্তি উত্তম যার প্রথম সন্তান কন্যা সন্তান।’’ অন্য স্থানে হযরত (সাঃ) বলেছেন, ‘‘একজন কন্যা সন্তানকে লালন পালন করে সুপাত্রের নিকট পাত্রস্থ করার সাথে সাথে জান্নাতের দরজা খোলে যায়।’’ আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত ও জাতির কর্ণধার। এরাই বড় হয়ে একদিন দেশ গড়বে। পুরুষ শিশু হোক আর কন্যা শিশু হোক সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কন্যা শিশুরা সবদিক দিয়ে বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মে এখনও কন্যা সন্তানকে সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবিচার করা হয়। কন্যা শিশুদের মূল সমস্যা গুলো হচ্ছে, শিশু পাচার, শিশু শ্রম, কন্যা শিশুর অগ্রহণযোগ্যতা, শিশুর বিকাশে বৈরী পরিবেশ, কাজের মেয়ের প্রতি অকথ্য নির্যাতন, ধর্ষণ এবং বাবা-মা শিশুর কম সময় দেয়াসহ নানা সমস্যা।

আমাদের বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি কন্যা শিশু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ মিলিয়ন প্রতিবন্ধী কন্যা শিশু রয়েছে। প্রায় দেড় মিলিয়ন ৬ থেকে ১৫ বয়সী কন্যা শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রায় ১৭ লাখ কন্যা শিশু ঝুকি পূর্ণ কাজ করে। ছিন্নমূল পথ কন্যা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। ইউনিসেফের এক জরিপ থেকে জানা যায়, এইসব কন্যা শিশুদের মধ্যে যারা ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী তারা শতকরা ৮৮ জনই বাল্য বিয়ের শিকার। বাল্য বিয়ের কোন রেজিস্ট্রি হয় না। জাতি সংঘ জনসংখ্যা তহবিলের মতে, দেশের নারীদের গড় বয়স ১৬.০৯ বছর। এই কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য না করে সম-অধিকার প্রদান করা হলে একদিন ওরা বিশ্ব জয় করবে। ওরা একদিন মাদার তেরেসা, কবি বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া, সিরিন এবাদীর সমপর্যায়ে যেতে পারবে।

লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
উন্নয়নকর্মী এবং ফ্রিল্যান্স লেখক