ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

২৩ জুলাই, শামসুন্নাহার হল নির্যাতন দিবস। ২০০২ সালের ২৩ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ শামসুন্নাহার হলে ঢুকে ছাত্রীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে এবং অসংখ্য নিরপরাধ ছাত্রীদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও শামসুন্নাহার হলে প্রতিবাদী দেয়াল চিত্র অঙ্কন, মৌন মিছিল, সমাবেশ, আলোচনা সভা সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করার কথা আছে।

জানা যায়, পুলিশ সদস্যদের বিচার তো দূরের কথা, আজ পর্যন্ত মূল ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি। শুধু শামসুন্নাহার হলই নয়, অনেক স্থানে নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু তারা বিচার না পেয়ে সমাজ কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছে সেই সময়। আমরা ওই ঘটনায় স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে লজ্জিত হয়েছিলাম। স্বাধীন দেশে এভাবে পুলিশ সর্বোচ্চ দেশের বিদ্যাপীঠের উচ্চ শিক্ষিত নারীদের নির্যাতন করতে পারে তা দেখে সুশীল সমাজ হতবাক হয়েছিল।

আসা যাক মূল কথায়, আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কবির ভাষায়- ‘‘কোন কালে একা হয়নি জয়ী পুরুষের তরবারী, শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে বিজয়ী লক্ষী নারী।’’ আমরা ইতিহাস থেকে লক্ষ্য করেছি যে, অতীতে নারীদেরকে ভোগের বস্ত্ত মনে করা হতো। ফলে অধিকাংশ যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটতো। আইয়্যামে জাহেলিয়াত তথা অন্ধকার যুগে কন্যা সন্তান জন্মলাভ করা ছিলো পরিবারের জন্য লোক লজ্জার ব্যাপার। লোক লজ্জা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে কন্যা সন্তান কে জীবন্ত কবর দিতে কুণ্ঠাবোধ বলতে কিছু ছিলো না। ইসলাম ধর্মের প্রাণ পুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সর্বপ্রথম নারীদের কে মর্যাদা দিয়েছেন।

হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিলো। স্বামী মারা গেলে স্বামীর সাথে আগুনে পোড়া হতো। বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ ছিলো সমাজে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সমাজ সংস্কারকদের প্রচেষ্টায় বিধবা বিবাহ চালু হয়। হিন্দু ধর্মালম্বী নারীদের বিয়েতে প্রচুর যৌতুকের রেওয়াজ ছিলো। ১৬ বছর বয়সের পূর্বে কন্যার বিয়ে দেওয়াকে বলা হতো গৌড়ী দান। ধারণা করা হতো ‘কুড়িতে নারী হয় বুড়ি। এভাবে একসময় আমাদের দেশে যৌতুক প্রথা ব্যাপক আকার ধারণ করে।

বর্তমানে আমাদের দেশে যৌতুক ছাড়া বিয়ে সচরাচর কম দেখা যায়। যৌতুকের টাকা মেটাতে না পারায় ঘর ভাঙছে নারীর, স্বামী ও স্বামীর পরিবারের লোকজন দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, অনেকে আত্মহত্যা করছে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে, যৌতুকের কারণে অনেক নারীকে হত্যা করা হচ্ছে। যৌতুকের জন্যে বিয়ে না হওয়ায় বেঁচে থাকার তাগীদে বাধ্য হয়ে অনেক দরিদ্র নারী পতিতাবৃত্তি পেশা বেছে নিচ্ছে। উল্টো সমাজ আবার তাদের ধিক্কার দেয়।

এছাড়াও নারীদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। দিন-দুপুরে নারী ধর্ষিত হচ্ছে। শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত হচ্ছে ছাত্রী। আবার প্রেমিক কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে। বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ বেড়েই চলেছে। ১২ বছরের মেয়ের সাথে ৮০ বছরের বৃদ্ধের বিয়ে হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে।

আধুনিককালেও নারীদের ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে- নারীর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকাকে এড়িয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ সংবিধানে নারী পুরুষের সর্বক্ষেত্রে সমতা বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলন নেই। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। এসব আইন কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। অনেক নারী নির্যাতনের বিচারের জন্যে আদালতে মামলা করা সত্ত্বেও সাক্ষীর অভাব ও অপরাধীদের মামা-খালুর জোর এবং টাকার কালো পাহাড়ের জন্যে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। অথচ ১৯৫২ সালের ‘ভাষা আন্দোলন’ এবং ১৯৭১ সালে ‘মুক্তি যুদ্ধে’ নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এমনকি অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তবুও শির নত করেনি।

বর্তমানে দেশে প্রায় শতাধিক বেসরকারি সংস্থা রয়েছে, যেখানে নারীর অধিকার, ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে পিছপা হয় না। প্রকৃতপক্ষে ওসব সংগঠন সমূহ নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে নারীবাদী তথা ত্রাণকর্তা হিসেবে সমাজে সাধু সাজে। কিন্তু দেখা যায় গ্রাম-গঞ্জ এলাকার নিম্ন স্তরের সাধারণ নারীরা বিভিন্নভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরিবার এবং সামাজিকভাবে লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হওয়ার পর আদালতে মামলা-মোকাদ্দমা করে । পত্রিকার মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে দেশের মানবাধিকার সংগঠন সমূহের মধ্যে অনেক সংগঠন আইনী সহায়তা দেওয়ার জন্যে স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে আসে। কিছুদিন মামলার তদবির করে । পরবর্তীতে আর কোন খবরাখবর রাখে না। ফলে অধিকাংশ নারী নির্যাতনের মামলা সমূহ সাক্ষীর অভাবে অপরাধীরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এতে হাজার-হাজার নারী নিরাশ হয়ে বিড়ম্বিত জীবনের বিষাদ নিয়ে দিনাতিপাত করছে। প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থা আরো করুণ। কারণ, একদিকে তারা নারী, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী। এদের বিয়ের কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। তারা বদ্ধ ঘরের বন্দি খাঁচায় থেকে জীবন অতিবাহিত করে। সব দিক থেকে তারা কষ্ট অনুভব করে। তারা বেশি নির্যাতিত ও নিপীড়িত। অনেক সময় ধর্ষণের শিকার হলেও আইনের আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হয় না।

স্বাধীনতার মূল্যবান ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের দেশের নারীরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি, পায় নি তারা নারী হিসেবে তাদের নায্য অধিকার, পায়নি নির্যাতনের বিচার। ভোগের বস্ত হিসেবে নারীরা সমাজে এখনও রয়ে গেছে। অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্র দেয় নি উপযুক্ত মর্যাদা। দু’জন নারী নেত্রী দেশের প্রধান মন্ত্রী হয়েছেন। তবু আজও এদেশে বন্ধ হয়নি বিয়েতে যৌতুক, বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ, নারী নির্যাতন। সর্বক্ষেত্রে ঘটেনি নারীর ক্ষমতায়ন। নারী নির্যাতন বন্ধ ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে আর কতকাল বাংলার নারীদের চোখের জল ফেলতে হবে, কত নারীকে আত্মবিসর্জন দিতে হবে, কত নারীকে যৌতুকের বলি হতে হবে ? কত নারীকে নির্যাতিত হতে হবে পুলিশের হাতে? ইতোপূর্বে ১৯৯৫ সালের ২৪ আগষ্ট দিনাজপুরের কতিপয় পুলিশ কর্তৃক ১৪ বছর বয়সের নিষ্পাপ কিশোরী ইয়াসমিন উপর্যুপরি ধর্ষিত হওয়ার পর অকালে প্রাণ হারিয়েছিল। এ ব্যাপারে কয়েকজন পুলিশের ফাঁসিও হয়েছিল। কিন্তু শামসুন্নাহার হলের ঘটনার ব্যাপারে কোন কিছু হয়েছিল কি না তা আজও অজ্ঞাত।

পরিশেষে দেশের একজন সচেতন মানুষ হিসেবে শামসুন নাহার হলের ছাত্রীদের ওপর নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার চাই। এ ধরনের ঘটনা আমরা দেখতে চাই না বাংলার মাটিতে। কারণ, এদেশের ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল উভয়ের নেত্রী নারী।