ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

ভিক্ষুক থেকে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী এখন দোকানদার। নিশ্চয় কথাটি আজব কথা। কিন্তু এটি কোন আজব কাহিনী নয়। সত্যি। এই ধরনের একজন ব্যক্তি মামুন (২৫)। সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। ভিক্ষার কথা শুনলে যার কলিজা এখনও কাঁপে।

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নং রূপসা (দক্ষিণ) ইউপির ৭ নং ওয়ার্ডের উত্তর সাহেবগঞ্জ গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারে তার জন্ম । তার বাবার নাম আবু তাহের পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। মাতার নাম হালিমা খাতুন একজন গৃহিনী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে প্রতিবন্ধী এবং মেজ।

মামুন ও তার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, মামুনের বয়স যখন মাত্র ৫ বছর তখন পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে দুই পা একেবারে অকেজো হয়ে যায়। ফলে ঘরের কোনে বসে থেকে মূল্যবান ১৪ টি বছর অতিক্রম করে। জন্মের পর থেকেই তার প্রতি পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসা থাকলেও ১৪ বছর পর যেন তাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, পরিবার তাকে দু মুঠো ভাত দিলেও আউট খরচ দেওয়ার মত সামর্থ ছিল না।

এতে বাধ্য হয়ে সে ভিক্ষা বৃত্তি বেছে নেয়। রাস্তায়-রাস্তায়, বাজারে-বাজারে বিয়ারিং-এর গাড়িতে চড়ে ভিক্ষা আরম্ভ করে। এই কষ্ট দেখে ফরিদগঞ্জের এক শিল্পপতি লায়ন হারুনার রশীদ তাকে বিনা মূল্যে একটি হুইলচেয়ার প্রদান করেন। টাকার প্রয়োজনে সে হুইল চেয়ারটি পার্শ্ববর্তী এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দেন।

এরপর গ্রামের রুবেল, ল্যাচা ও বিল্লাল নামের কতিপয় রিক্সা চালক রিক্সায় ভিক্ষার জন্য উৎসাহিত করে। তখন মামুন তাদের রিক্সায় চড়ে ভিক্ষা করতে থাকে দুর-দুরান্তে। ভিক্ষার টাকা দুই ভাগ করা হতো। একভাগ মামুন ও আরেক ভাগ পেত রিক্সা চালকরা। রিক্সায় ভিক্ষায় করে ২ থেকে আড়াই’শ টাকা আয় হতো। ওই টাকা সে কোন দিন পরিবারকেও দেয়নি এবং নিজেও জমা রাখেনি। সন্ধ্যার পর বন্ধুদের নিয়ে খরচ করত। এভাবে কেটে যায় আরো ৬ টি বছর।

একদিন চাঁদপুর-ডিপিওডি’র সহায়কের নজরে পড়েন সে। সহায়ক তাকে ভিক্ষা থেকে বিরত থেকে আয়বর্ধনমূলক কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। ট্রাই সাইকেল সহায়ক উপকরণ ব্যবহারের জন্য চাঁদপুর ডিজএ্যাবল্ড পিপল অর্গানাইজেশন টু ডেভেলপমেন্ট (চাঁদপুর-ডিপিওডি) তাকে পরামর্শ দেন। পরামর্শ অনুযায়ী সে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে উপযোগী একটি ট্রাই সাইকেল ক্রয় করে। সে চাঁদপুর ডিপিওডির আওতায় উত্তর সাহেবগঞ্জ তৃণমূল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের সদস্য হন। সেখান থেকে ‘উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব-উদ্যোগ (পিএসআইডি)’ অ্যাপ্রোচের অনুকূলে আত্ম উন্নয়নের ওপর ১২ টি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে ওঠে।

ভিক্ষা ছেড়ে আয়বর্ধনমূলক কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে চাঁদপুর-ডিপিওডি’র নিকট সহযোগিতা চাইলে তাকে ৫ হাজার টাকা সাহায্য করে। উক্ত ৫ হাজার টাকা নিয়ে একটি ছোট দোকান দিয়ে মালামাল ক্রয়-বিক্রয় আরম্ভ করে। ১৬ নং রূপসা(দক্ষিণ) ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী অসচ্ছল ভাতার ব্যবস্থাও করে। তারপর থেকেই ক্রমেই ব্যবসার উন্নতি হচ্ছে। এখন তার দোকানে বেচা-কেনা ভালোই হয়। বর্তমান আয় দৈনিক প্রায় দুই’শ টাকা। লাভের টাকা থেকে একটি মোবাইল ফোন কিনেছে। সে এখন স্বপ্ন দেখছে একটি গাভী কেনার।

গজারিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আলমগীর হোসেন জানান, ‘‘আমি সময় পেলেই মামুনের দোকানে বসি। সে পূর্বের চেয়ে অনেক চালাক হয়েছে। চাঁদপুর-ডিপিওডি’র মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়ে ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে দোকান দিয়েছে। এতে আমরা ধন্য। আমরা কখনও কল্পনা করিনি মামুন ভিক্ষা বৃত্তি ছেড়ে একদিন দোকানদার হবে।’’

মামুনের মা ও বাবা বললেন, ‘‘মামুন আগে সবার নিকট ভিক্ষুক হিসেবে পরিচিত ছিলো। কেউ দাম দিতো না। কিন্তু এখন তার কদর বেড়েছে। মুদি দোকানদারী করছে দেখে খুবই আনন্দিত। কেউ আর ভিক্ষুক বলে উপহাস করে না। তবে মামুনের উন্নয়নে ক্ষেত্রে এখন বড় বাধা হচ্ছে, পাশের লোকজন বিয়ের জন্য খুবই মরিয়া হয়ে ওঠেছে। আর মামুন আরো স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে করবে।’’
শুধু তাই নয়, তার কাছে প্রতিনিয়ত বড় বড় লোকেরা আসে এবং খোঁজ-খবর রাখে।

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের শারীরিক প্রতিবন্ধী মামুন নিজের দোকানে বসে বেচা বিক্রি করছে বিভিন্ন পণ্য। (ছবিটি লেখক নিজেই মোবাইল ফোনে ক্যামেরাবন্দী করেছে).