ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

বিশ্বব্যাপী যখন ক্ষুদ্র ঋণের মডেল যুগোপযোগী তখন ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে অনেকে নিজেদের উন্নয়নতো দুরের কথা সহায় সম্বল হারিয়ে পথের ভিখারী পর্যন্ত হচ্ছে। অনেকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে এনজিও কর্মীদের ধিক্কার ও হুমকির কারণে আত্মহত্যা করছে। এরূপ ঘটনা অহরহ ঘটছে। অধিকাংশ এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সমূহ শুধু মাত্র তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করে। যে সব নারীদের ঋণ প্রদান করা হয় তাদের পূর্ব থেকে আয় বর্ধকমূলক কাজের ওপর কোন প্রশিক্ষণ থাকে না। এনজিও কর্মীরা তাদের টার্গেট পূরণ করতে পারলেই বেতন পাবে। তাই তারা যাচাই ছাড়া যাকে তাকে ঋণ প্রদান করে থাকে। এতে অনেক নারীর ঘর পর্যন্ত ভেঙ্গে যাচ্ছে। অনেক নারী ঋণের টাকার পরিশোধ করার জন্য বাধ্য হয়ে গোপনে সেক্স ওয়ার্ক করছে। যা স্বামী জেনেও না জানার ভান করছে। এসব ঘটনা অবিশ্বাস্য নয়।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতা নারীরা ঋণ নিয়ে তাদের স্বামীর হাতে তুলে দেয়। স্বামী কোন ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে ইচ্ছানুযায়ী খরচ করে। ফলে কৃস্তির দায় এসে পড়ে নারীর ঘাড়ে। কৃস্তির টাকা না দিতে পারলে নারীকে লাঞ্চনা, গঞ্জনা করে এনজিও কর্মীরা। ফলে অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী আত্ম হত্যা করে। অনেকে আবার কৃস্তির টাকা পরিশোধ করতে বসত ভিটা পর্যন্ত বিক্রি করে। অথচ এনজিও সমূহের ঋণ নীতিমালায় রয়েছে এক এনজিওর সদস্য অন্য এনজিওর সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু এনজিও কর্মীরা তাদের উধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে নিজের চাকুরি টিকানোর জন্য সেই নীতিমালাকে অগ্রাহ্য করে। শুনা যাক তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতা কয়েকজন নারীর কেস স্টাডি:

মোসাঃ মুনা বিবি (৩৭) একজন গৃহিণী। স্বামী বর্গাচাষী। দু’ মেয়ে ও দু’ ছেলে নিয়ে সংসার। পরের জমি চাষাবাদ করে সাচ্ছন্দে জীবন যাপন করত। গ্রামীণ ব্যাংক যাওয়ার কার্যক্রম শুরু করার পর প্রথমে ঋণ নেয়। এতে ভালোভাবে জীবন কাটছিলো। কিন্তু একসময় ব্যাঙের ছাতার মত এলাকায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন এনজিও। এমনকি জাতীয় পর্যায়ের এনজিও সমূহ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে। ওসব এনজিও কর্মীরা ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকে। মুনা বিবি এভাবে প্রায় ৭টি এনজিওতে ক্ষুদ্র ঋণ নেয়। স্বামীর একমাত্র সম্বল দু’টি হালের গরু। হঠাৎ একটি হালের গরু মারা যায়। এতে স্বামীও বেকার হয়ে যায়। কারণ হাল কিনে বর্গা চাষ করে কোন লাভ হয় না। জোতদারেরা সব ফসল নিয়ে যায়। এভাবে এখন প্রায় দেড় লাখ টাকা দেনা হয়েছে।

এমেলি বেগম (৩৫) চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বামী দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে বসবাস করে। স্বামী শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের স্বাবলম্বী তথা আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সেই গ্রামে কার্যক্রম শুরু করে। অন্যান্য নারীদের মত এমেলি বেগম প্রথমে গ্রামীণ ব্যাংক পরে আশা, প্রশিকা, ব্র্যাকসহ কয়েকটি স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নেয়। ফলে স্বাবলম্বীতো দুরের কথা ঋণের দায়ে শেষ পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক দায়ের করা মামলায় জেল হাজতে যেতে হয়। সে জানায়, এনজিও সমূহ শুধু ঋণ দিয়ে কিস্তি আদায়ের জন্য আসে। কিন্তু ঋণের টাকা নিয়ে কী করা যায় এই বিষয়ে কেউ পরামর্শ দেয় না। ফলে ঋণ নিয়ে ফেসে গেছি। জানি না কখন দেনার দায় থেকে মুক্ত হতে পারব।

সুখী বেগম (৪৫) তিন মেয়ে ও চার ছেলে নিয়ে সংসার। স্বামী একজন ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী। গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, প্রশিকা, ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘসহ কয়েকটি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে ব্যাবসা করতে দেন। ব্যাবসাতে বড় ধরনের লোকসানের সম্মূর্খীন হয়। ফলে ভিটা মাটি পর্যন্ত বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারে নি। একসময় ঋণের দায় থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে অপ্রাপ্ত ছেলেদের বিয়ে দিয়ে যৌতুকের টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। সে জানায়, ঋণ প্রদানের সময় গ্রুপ তৈরীর জন্য এনজিও কর্মীরা বাড়িতে ধন্না দেয়। কিস্তি আদায়ের সময় অমানবিক আচরণও করে। তবে মাঠ কর্মীদের কোন দোষ নেই। কারণ, তারা চাকুরি বাঁচাতে এই অশোভন ব্যবহার করে থাকে।

জিন্নাত আরা বেগম (৪১) চেহারা কালো ও দরিদ্র ঘরের মেয়ে হওয়ায় এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর সাথে তার বিয়ে হয়। বিবাহিত জীবনে এক ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম গ্রহণ করে। স্বামী কাজ কর্ম করে কোন মতে ভালোভাবে সংসার চলছিল। লোভে পড়ে কয়েকটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়ে। এমনকি কিস্তি সময়মত পরিশোধ না করতে পারায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক মামলার আসামী হন। ভিটা মাটি বিক্রি করে শেষ পর্যন্ত দেনা পরিশোধ করতে পারে নি। ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অপ্রাপ্ত ছেলের বিয়ে দিয়েছে তিন বার। দুই অপ্রাপ্ত কন্যা শিশুকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে হচ্ছে। সে জানায়, ছেলে কোন খোঁজ খবর রাখে না। মেয়েরা পাঁচ-ছয় মাস পরপর সামান্য কিছু টাকায় পাঠায়। বর্তমানে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ভিক্ষা করছি। জানি না কখন দেনা থেকে মুক্তি পাব। হয়ত: মরার পর মুক্তি পাব।
মাঠ কর্মীদের বক্তব্য:
আসলাম নামের রুরাল রি-কন্সট্রাকসন ফাউন্ডেশন (আরএমএফ) নামক এনজিওতে কর্মরত এক মাঠ কর্মী বলেন, কিস্তির টাকা আদায় করতে খুবই কষ্ট হয়। বৃষ্টি বাদলের সময় ঋণ গ্রহীতারা কিস্তি দিতে পারে না। অফিসের বসদের চাপের কারণে আমরা অভদ্রোচিত আচরণ করতে বাধ্য হই। কিস্তি আদায় করতে না পারলে বেতন থেকে কেটে নেয়। অনেক সময় সদস্যরা মোবাইল, টিভি, কাঁথাসহ যাবতীয় আসবাব পত্র পর্যন্ত পানির দরে বিক্রি করে।
ব্র্যাক ও বাইস নামের এনজিওতে কর্মরত সাবেক এক মাঠ কর্মী ফারুক জানান, ব্র্যাকে কাজ করতে গিয়ে মানুষের ঘরের টিন বিক্রি করে কিস্তি আদায় করেছি। বাইস এনজিওতেও একই সমস্যা। ফলে রাগ করে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে মুদি দোকান দিয়েছি। যাদের কোন গতি নেই তারা ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পে চাকুরি করে।
ঋণ গ্রহীতারা ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণ: ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের স্বাবলম্বী তথা আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার নাম করে অনেক এনজিও ব্যাবসা চালাচ্ছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়ম কানুনকে অমান্য করলেও অদৃশ্য শক্তির বলে কিছুই হয়। কারণ, অধিকাংশ স্থানীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের রেজিঃষ্টেশন পর্যন্ত নেই। সুদের হারও অনেক বেশি। প্রতিটি এনজিওদের নীতিমালায় উলে¬খ রয়েছে, একজন নারী একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের সদস্য হলে অন্য এনজিওতে তাকে সদস্য হিসেবে নেওয়া যাবে না। কিন্তু মাঠ কর্মীদের ম্যানেজারেরা সদস্য করার টার্গেট দেয়। এতে মাঠ কর্মীরা চাকুরি বাঁচানোর জন্য নিয়ম-নীতি অমান্য করে। এতে যে নারীর ঋণ প্রয়োজন নেই তাকেও ঋণ দিতে আগ্রহী দেখায়। এছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা অশিক্ষিত ও অদক্ষ। নেই কোন প্রশিক্ষণ, নেই ব্যাবসার মত উপযুক্ত পরিবেশ। জানে না কী কাজে ব্যবহার করতে হবে ঋণের টাকা। অনেকে আবার ঋণ নিয়ে স্বামীর হাতে দেন। স্বামী ইচ্ছে মত খরচ করে। সব দায় এসে পড়ে নারীর ওপর।