ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

শারীরিক প্রতিবন্ধী রিয়াদ। (ছবিটি লেখক নিজেই ক্যামেরাবন্দী করেছে)

সুর্যের তাপ কমে আসছে। সুর্যের লালিমা দেখা দিবে ঘণ্টাখানেক পরেই।তারপরে আসবে সন্ধ্যা। অনেকে ফিরছে নিজের বাসায়। ঠিক এমন সময় হযরত শাহ জালাল (রহঃ) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সংলগ্ন দক্ষিণখান বাজারের পূর্ব পার্শ্বে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) নামে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কর্মরত সংগঠনে আসার সময় রাস্তায় সাক্ষাৎ হয় শারীরিক প্রতিবন্ধী রিয়াদের (২৩) সাথে। পরে বাসায় নিয়ে আলাপচারিতায় মেতে ওঠলাম। এক পর্যায়ে ওঠে আসে জীবনে ঘটে যাওয়া নানা সুখ-দুঃখের কাহিনী। সে জানায়, ‘জন্ম বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার অন্তর্গত নরসিংহ নামক নিভৃত এক পল্লী গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারে। বাবার নাম আবুল হোসেন ও মাতার নাম কোহিনুর হোসেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি বড়। জীবিকার তাগিদে বাবার সাথে চলে আসি ঢাকায় জন্মের পরপরই। বাবা নবীনগর ক্যান্টঃ এলাকায় মুদি দোকান দেন। কিন্তু মুদি ব্যবসা ভাগ্য বদলাতে পারেনি বলে মা-বাবা উভয়ের টিউশনিতে কোন মতে চলে ৪ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের সংসার।‘ প্রতিদিন সুর্য ওঠার সাথে সাথে মাশরুম ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রিয়াদ। পরনে জিনসের প্যান্ট, গায়ে কালো গেঞ্জি, মাথায় ক্যাপ। সাভারের সিআরপি, রেডিও কলোনী, নবীনগর সহ ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে মাশরুম প্রিয় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মাশরুম বিক্রি এবং মাশরুমকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতার জন্য।

আপন মনের টানে গায়, ‘‘থাকবে না কোন ঝুট ঝামেলা, মাশরুমে মাশরুমে ভরে যাবে বাংলা।’’ অনেকে হাসির ছলে তাকে বলে, ‘‘জাতে মাতাল, কাজে তাল।’’
প্রতিবন্ধী কিভাবে হয়েছে প্রশ্ন করলেই উত্তর আসে, ‘ভাইয়া এটা কি জানা খুবই জরুরী? তাহলে বলি, শুনেন মন দিয়ে।‘মায়ের ২০ ঘণ্টা প্রসব বেদনার পরে আমার জন্ম হয় ৮৮ সালের মে মাসে দুপুর সাড়ে ১২ টায়। জন্মের পর ২ ঘণ্টা আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ছিলো না। সবাই ভাবছিল আমি মৃত অবস্থায় এ সুন্দর পৃথিবীতে এসেছি।কিন্তু বিধাতা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।কেন বা রেখেছিল তাও জানি না। রাখলেও কেন প্রতিবন্ধী বানালো সেটাও জানি না।‍’ কথা বলার সময় চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরছিল অশ্রু।তারপর আবার বলতে শুরু করলো তার প্রতিবন্ধিতা হওয়ার কথা।

‘দশ মাস বয়সে আমি টায়ফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হই।এরপর দেড় বছর পর্যন্ত কথা বলতে এবং হাটতে পারিনি। সেটা কারো নজরে পড়েনি। কেউ খেয়ালও করে নি যে, আমার জীবন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে’।এক আত্মীয়ের পরামর্শে তাকে ঢাকা শহরের অবস্থিত বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে সুচিকিৎসার নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি রিয়াদ। নিঝুম রাতে প্রতিবন্ধিতার বিড়ম্বিত জীবনের বিষাদ নিয়ে লিখেন কবিতা। কিন্তু ওসব কবিতা প্রকাশিত হয় নি কোন পত্রিকায়। সে জানেও না কিভাবে পত্রিকায় যোগাযোগ করতে হয়। এ পর্যন্ত ৪০ কবিতা লিখেছে। কবিতাগুলো তার ব্যাগে থাকে সবসময়। কবিতা প্রেমী মানুষকে পড়তে বলে। সে আমাকে বলল, ‘ভাইয়া ! কবিতার খাতাটি কি দেখবেন?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই দেখবো’। খাতাটি খুলার পর নজরে পড়লো একটি কবিতা। কবিতাটি পড়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। কবিতাটির নাম ‘তরুণীর একটু ভালবাসা চাই’। কয়েকটি চরণ কবিতার, ‘আমার কোন তরুণীর বাহু ধরে হাঁটা হবে না, কারণ, হাঁটতে পারি না ঠিকমত।
কোন তরুণীর কাছে পত্র লেখা হবে না, কারণ, পত্রের ভাষা আমার জানা নেই
কোন তরুণীকে বলতে পারবো না তোমাকে ভালবাসি, কারণ, মুখের ভাষা অস্পষ্ট
কোন তরুণীকে ভালবেসে ঘরে নেওয়া সম্ভব হবে না, কারণ, নিজস্ব ঘর নেই
তারপরেও তরুণীর একটু ভালবাসা চাই’।

মাশরুমের ব্যবসায় কিভাবে আসলে? সে জানায়, ‘‘সাভারের ‘বিডিসাস’ বে-সরকারি সংস্থায় কাজ করতে গিয়ে আমার পরিচয় হয় আনোয়ার স্যারের সাথে। তিনি আমাকে সাভার সোবহানবাগ মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে সাত দিনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেয়।’’ প্রশিক্ষণ শেষে ২০ প্যাকেট মাশরুম উপহার দেয়া হয় তাকে। তখন থেকেই শুরু করে মাশরুম উৎপাদন। তারপর ‘‘এ্যাসিসিয়েশন ওয়েলফেয়ার অব ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ (এডব্লিউডিপি)-এর কোর্ডিনেটর মরহুম মোঃ মাহবুবুল আশরাফ তাকে সুদ মুক্ত ৩ হাজার টাকা ঋণ দেন। সাভারের ধলেশ্বরে তার বাড়ির আঙিনায় মাশরুমের উৎপাদন শুরু করে। যার নাম দেন ‘মাশরুম পল্লী’। মাশরুম কাটা ও পানি দেওয়ার সময় বাবা-মা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু অর্থাভাবে বড় ধরনের মাশরুম উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিতে পারে নি। গত ৬ সেপ্টেমর ২০১০ মোঃ মাহবুবুল আশরাফের মৃত্যুতে সে খুবই কষ্ট পেয়েছে। কারণ, তাকে সব কাজে সহযোগিতা করতো মরহুম আশরাফ ভাই। অনেক সময় আর্থিক সহায়তাও করতো। তবে পরামর্শ খুবই কাজে লাগতো। কথার ফাকে ফাকে আরো বেরিয়ে আসে তার নিত্য দিনের কাজের কথা। তার সখ দেশি-বিদেশী ডাক টিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহ করা। এ পর্যন্ত দেশী ও বিদেশী ২৫০ টি ডাক টিকিট ও ৫০ টি বিদেশী মুদ্রা সংগ্রহ করেছে। ওসব তার বাড়িতে অতি যত্নে সংগৃহীত রয়েছে। নতুন নতুন মসজিদে নামায পড়তেও সে খুব ভালো বাসে। এ যাবৎ সে ৩০০ মসজিদে নামাজ আদায় করেছে। সময় পেলে গীর্জায়ও যায়। কেন গীর্জায় যায় জিজ্ঞাসা করা হলে হাসি হাসি মুখে জানায়, আমার কাছে ধর্ম হচ্ছে মানবধর্ম। কোন ধর্মের প্রতি আমার ঘৃণা নেই।সব ধর্মেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে পূণ্যের কাজ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভ্রমণ খুবই তার জন্য আনন্দদায়ক। আগামী কয়েকবছরের মধ্যে সে যদি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পায় তবে ‘বাংলাদেশ চিনবো’ এই শ্লোগানকে সামনে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারী, ২৬ মার্চ অথবা ১৬ ডিসেম্বর বেরিয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশ ভ্রমণে। সকল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করে তুলে ধরবেন প্রতিবন্ধী এবং দেশের সার্বিক সামাজিক সমস্যাসমূহ। সাথে থাকবে মাশরুমের প্রচারণা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান, শহীদদের স্মৃতি সৌধ, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়, উপজাতিদের জীবন চিত্র ঘুরে ঘুরে দেখবেন। পাশাপাশি সচেতন করবে সাধারণ মানুষকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার, ধুমপান বিরোধী এবং দেশের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করার জন্য। ২০০৭ সালে উন্মুক্ত বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে রিয়াদ। ২০১১ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। কোন বেসরকারি বা সরকারি সংস্থা বা দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোন উপবৃত্তি বা সহায়তা পায়নি সে। অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাও সে পায়নি। সমাজ সেবা অধিদপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঋণও পায়নি প্রতিবন্ধী হিসেবে।তবে কারো কাছ থেকে কোন সহযোগিতা আর চায় না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যই মাশরুমের ব্যবসা ধরেছে।

অক্লান্ত পরিশ্রম করে ২০০৮ সালের বই মেলায় একটি ‘‘মাশরুমের চলার গতি, হাঁটি হাঁটি পা পা’’ নামে একটি বই বের করেছিল। বইটি সব সময় তার ব্যাগের ভেতরে থাকে। কেউ দেখতে চাইলে বা কাছে আসলে বইটি দেখিয়ে মাশরুম চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। প্রতিদিন মাশরুম বিক্রি করে যে টাকা আয় হয় নিজের চলার খরচ রেখে বাকিটা সংসারে বাবা-মাকে দেয়। সে টাকা দিয়ে ছোট ভাই তানভীর হোসেনের পড়ার খরচ চালায়। তানভীর বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞন ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ অনার্সে অধ্যায়ন করছে।

ছোট খাট সরকারি চাকুরিও চেষ্টা করছে। বেসরকারি সংস্থাতে চাকুরি করেছে কিন্তু সুযোগ সুবিধা কম। অপরদিকে যে কোন সময় চাকুরি চলে যায় বলে বেসরকারি চাকুরির জন্য চেষ্টা করে না । তারপরেও ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকুরি পেলে করবে। তবে সে ভারি কাজ করতে পারে না। কম্পিউটারও চালাতে পারে।কিন্তু চাকুরি মিলছে না ভাগ্যে। একদিকে কথায় জড়তা, শরীরে শক্তি কম, অন্যদিকে শিক্ষিত কম।
রিয়াদ আরো জানায়, ‘যখন মানুষকে আনন্দ দিতে পারি তখন সবচেয়ে বেশি সুখী হই। যখন মানুষ আমাকে ভুল বুঝে তখন আমি সবচেয়ে দুঃখ পাই’। তার দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের পর প্রিয় মানুষ হচ্ছে যে, বিনা স্বার্থে অন্যের কল্যাণে কাজ করে সে মানুষ। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের মধ্যে এমন মানুষ কয়েকজনকেই খুঁজে পেয়েছে জীবনে। তারা হলেন, ভেলরী এ টেইলর, সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী, মরহুম মোঃ মাহবুবুল আশরাফ এবং মোঃ রূহুল আমিন, সাবেক পরিচালক, জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন সম্প্রসারণ কেন্দ্র। ২০ জুন ৪ ঘণ্টা আলাপচারিতায় রিয়াদের জীবনের গল্প ওঠে আসে। বিদায় কালে জানায়, ‘ভাইয়্যা! আসি! আবারও দেখা হবে। ফোন করবেন কিন্তু। সময় পেলে সাভারে একবার আমার বাড়িতে আসবেন’। রিয়াদের শুধু অধ্যায়নই প্রধান কাজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দারিদ্র্যতার কারণেই কলেজে না গিয়ে ব্যাগে মাশরুম নিয়ে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে। মাশরুম বিক্রি করে নিজের যেমন লেখা-পড়ার খরচ চালাচ্ছে। ঠিক তেমনি লাভের কিছু অংশ তুলে দিতে হচ্ছে বাবা মায়ের হাতে। পরিবারে লেগেই আছে অভাব। অভাব যেন নিত্য দিনের সাথী রিয়াদের। তবুও রিয়াদ স্বপ্ন দেখে আর দশজন স্বাভাবিক, সুস্থ মানুষের মতো লেখা-পড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। তা কতখানি তার ভাগ্যকে হাতছানি দিবে তা ভাগ্য বিধাতায় জানে।

লেখক-

আজমাল হোসেন মামুন
উন্নয়নকর্মী এবং নাগরিক সাংবাদিক