ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশের সমস্যার অন্ত নেই। তাঁরমধ্যেও মানুষ বসবাস করছে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ আয়োজিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত হয় মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি। বাংলায় যাকে বলা হয় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য। যেখানে ১৯২ টি জাতিসংঘের সদস্যভূক্ত রাষ্ট্র এবং ২৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০১৫ সালের মধ্যে কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করে একমত হয়ে স্বাক্ষর করেছে। মূল ৮টি টার্গেট রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২০১০ সাল পর্যন্ত টার্গেট দেওয়া হয়। সরকার এসমস্ত টার্গেট পূরণে আশাবাদী হলেও তা সম্ভব হবে না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন না হওয়ায়। বিশেষ করে কয়েকটি ক্ষেত্রে টার্গেট অর্জনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন না হওয়ায় পিছিয়ে পড়বে। ক্ষেত্র সমূহ হচ্ছে-

১.চরম দারিদ্র ও ক্ষুধা দুর করা;
২.সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার্জন;
৩.নারী পুরুষের ক্ষমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন;
৪.শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস;
৫.মাতৃস্বাস্থের উন্নতি;
৬.টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা;
৭. এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হচ্ছে প্রতিবন্ধী নারী। একদিকে নারী অন্যদিকে প্রতিবন্ধিতার কারণে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার। ফলে অধিকাংশ প্রতিবন্ধী নারীকে চরম দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করতে হয়। আর দারিদ্র এবং প্রতিবন্ধিতার মধ্যে রয়েছে একটা নিবিড় সম্পর্ক। আমাদের দেশে চরম দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে প্রায়………। এমডিজি- ২০০৯ এর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২ কোটি ৪৪ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০০-২০০২ সালে এ হার ছিল ৮ শতাংশ। ১০ বছরে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েছে ১০ শতাংশ। বেকারত্বের সংখ্যা তৃণমূল প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যেই বেশি। তারা ঘর থেকে বের হয় না। অন্যদিকে সরকারী এবং বেসরকারী সংস্থাসমূহ কাজ করলেও তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে তেমন কাজ হয়নি বলে আমাদের বলতে কোন দ্বিধা নেই। ফলে চরম দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে প্রতিবন্ধী নারীরা।

আমাদের দেশের ১ কোটি ৫০ লাখ প্রতিবন্ধী রয়েছে। যার অর্ধেক প্রতিবন্ধী নারী। স্কুলে ভর্তির উপযোগী শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। যার মধ্যে সুযোগ পাচ্ছে ৪ ভাগ। তবে প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষার হার মাত্র ১ ভাগ। বিশেষ করে দৃষ্টি, বুদ্ধি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষার ব্যাপারে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার ব্যয় বেশি হওয়ায় দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। ইনক্লুসিভ ইডুকেশনের দোহাই দিয়ে গলার স্বর উঁচু করলেও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ প্রতিবন্ধী শিশুরা ঝরে পড়ে। এদের অধিকাংশ পরিবাররের অভিভাবকদের সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বেসরকারি সংস্থা সমূহ শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন করতে সক্ষম হয়নি। ২০১৫ সালের মধ্যে ১০০ ভাগ অন্যান্য শিশুদের স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হলেও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় এমডিজি অর্জনে সরকার ব্যর্থ হতে পারে।

প্রতিবন্ধী নারী ও প্রতিবন্ধী পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে তুলনা করলে সহজভাবে ফুটে ওঠে প্রতিবন্ধী নারীরা রয়েছে। ফলে সমাজে ঘটেনি প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষমতায়ন। মুষ্টিমেয় অল্প সংখ্যক প্রতিবন্ধী নারী শিক্ষিত। উচ্চ শিক্ষিথ প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যে সম্মানজনক চাকুরি করছে এমন সংখ্যা অতি নগণ্য। তাও আবার শহরে বসবাসকারী প্রতিবন্ধী নারী। তৃণমূল প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষমতায়নের নামে একশ্রেণীর বেসরকারী সংস্থা সভা, সেমিনারে উচ্চ-বাক্য করলেও আসলে তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে। ফলে আশাতীত প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষমতায়ন ঘটেনি। প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন নেটওয়ার্কিং সংগঠনের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

শিশুর মৃত্যুর হার কমায় প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হারও কমেছে। ২০০৮ সালে শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৩ দশমিক ৩ দাঁড়িয়েছে। যা ৯০ সালে ৯২ জন। ২০১৫ সালের মধ্যে তা ৩১ জনে নামিয়ে আনার ব্যাপারে কাজ চলছে। কিন্তু দুর্গত এলাকায় এখনও আগের মত রয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রতিবন্ধী শিশু মৃত্যুহার বাড়বে। এ ব্যাপারে সরকারের তেমন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বেসরকারী সংস্থা সমূহেরও কার্যক্রম তেমন দেখা যাচ্ছে না।

মাতৃস্বাস্থের উন্নয়ন সাধারণত: উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারেই ঘটেছে। চরম দারিদ্র পরিবারের মধ্যে ঘটেনি। ফলে দরিদ্র পরিবারের মায়েরা অপুষ্টিহীনতার শিকার। যার প্রভাব পড়ে শিশুর ওপর।

টেকসহ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থান পিছিয়ে। আত্মকর্মসংস্থানের অভাব, পুঁজির অভাব, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাবে প্রতিবন্ধী নারীরা পিছিয়ে থাকবে। অনেক প্রতিবন্ধী নারীর ছবি তুলে কিছু সংগঠন দেখায় যে, তাঁরা স্বাবলম্বী। কিন্তু বাস্তবে ওদের সাথে সরাসরি কথা বললে বুঝা যায় তাদের অবস্থান টেকসই নয়। কোন মতে জীবন যাপন করছে। তারা যে কর্মের সাথে সম্পৃক্ত তা ঝুঁকিপূর্ণ। অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যে ভাতা প্রদান করা হয় তার পরিমাণ কম হওয়ায় এ ভাতা দিয়ে তাদের জীবন যাপন করা অসম্ভব। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে বর্তমান সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সঠিক মনিটরিং না করতে পারলে প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থান টেকসই হবে না। প্রতিবন্ধী নারীদের চাকুরির ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না বললেই চলে। নানা অজুহাতে চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান সমূহ তাদের বঞ্চিত করে।

এইচআইভি/এইডস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে সচেতনতার অভাব। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী নারীদের শারীরিক শক্তি অন্যান্য নারীদের চেয়ে অনেক কম। সে জন্য প্রতিবন্ধী নারীরা দূর্বৃত্তদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষক এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রতিবন্ধী নারী আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইদানিং কয়েকজন প্রতিবন্ধী নারী বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। যেসব প্রতিবন্ধী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তাঁদের এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশি। এ ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না বলে এমডিজি অর্জনে কিছুটা সমস্যা হবেই এ ক্ষেত্রে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক আইন, দলীল এবং নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ওসবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্বাক্ষরও করেছে। কিন্তু তেমন উন্নয়ন ঘটেনি প্রতিবন্ধী নারী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে। সর্বশেষ “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন ২০১০” এর প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে চলছে ছলচাতুরি। সেখানে তৃণমূল প্রতিবন্ধী নারীদের সম্পৃক্ত বা মতামত গ্রহণ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ওই আইনে রয়েছে অনেক অস্পষ্টতা। ফলে গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পার্লামেন্টারিয়ানস্ ককাস অন ডিজঅ্যাবিলিটিজ এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা আইন ২০১০’ এর প্রস্তাবিত খসড়া চুড়ান্তকরণের লক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আইনের অস্পষ্টতা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। আইনের ফাক ফোকর এবং অস্পষ্টতা দুর না করলে সংশ্লিষ্ট আইন থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কোন উপকার পাবে এ নিয়ে যেমন প্রতিবন্ধী নারী, প্রতিবন্ধী পুরুষ এবং তাঁদের অভিভাবকদের মনে সন্দেহ রয়েছে তেমনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বসংগঠনের প্রতিনিধিদেরও মনে সন্দেহ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সনদের আলোকে হলে দেশের দেড় কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হবে। আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হলেই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।