ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

আজকাল পত্রিকা খুললে প্রতিবন্ধী নারী নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে। যদিও মিডিয়া এ সম্পর্কিত সংবাদ কম প্রকাশ করে থাকে। প্রতিবন্ধী নারীদের অসহায়ত্বের সুযোগ খুজে তাদেরকে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করে। প্রতিবন্ধী নারী ও তার পরিবার লোক লজ্জার কারণে সমাজে তা বলতে সাহস পায় না। আবার যারা বিচারের আশায় মামলা মোকাদ্দমা করে তারাও বিচার তো পায় না উল্টো ধিক্কার সহ্য করতে হয়।

সমাজ এখনো প্রতিবন্ধী নারী নির্যাতনের ব্যাপারে সচেতন নয়। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী নারীরা শারীরিকভাবে অন্যান্য নারীদের চেয়ে দুর্বল। দুর্বলতার সুযোগে অনেক বখাটে ও মানুষ নামের নর পশুরা যৌন নির্যাতন চালায়। এতে একদিকে যেমন মারাত্মক ভাইরাস এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে অন্যদিকে গর্ভবতী হয়ে থাকে। মাস চারেক আগে সাতক্ষীরা জেলায় রহিমা (ছদ্মনাম) এক শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে পাশ্ববর্তী গ্রামের এক যুবক বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অবাধ মেলামেশা করে। এতে গর্ভবতী হয়। পরবর্তীতে জোর করে তার ভ্রূণ নষ্ট করে দেয়। এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠন ও নারী সংগঠন সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সভা করলেও আসামীদের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষ। মামলাটি সাতক্ষীরা আদালতে চলছে। এ ছাড়াও বেশ কয়েকমাস আগে খাগড়াছড়িতে এক আদিবাসী শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠকর্মী কর্তৃক জোরপূর্বক ধর্ষিত হয়েছিলো। ঘটনাটি দেশের প্রথম শ্রেণীর সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়েছিলো। বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতি দিয়েছিলো। কিন্তু তেমন কিছু হয় নি। পরবর্তীতে ওসব সংগঠন সমূহ ফলো আপ করেনা বলে বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে।

প্রতিবন্ধী নারীরা অন্যান্য স্বাভাবিক নারীদের চেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আবার ওসব নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে কম প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী নারীরা নির্যাতনের পর আদালতে মামলা দায়ের করেও অনেক সময় বিপাকে পড়ে। বাংলাদেশে বছরে কতজন প্রতিবন্ধী নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয় তার পরিসংখ্যান নেই। তবে পূর্বের তুলনায় এখন বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতে অনেক পরিবার তাদের প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, প্রতিবন্ধী নারীরা একসময় ঘর থেকে বের হতে না পারলেও এখন সে ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এখন রাস্তা-ঘাটে চোখে পড়ে প্রতিবন্ধী নারীরা হুইলচেয়ারে বা ক্রাচে ভর করে চলাচল করছে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারীরা সাদাছড়ি হাতে নিয়ে একা চলাফেরা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে অনেক প্রতিবন্ধী নারী। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও কাজ করছে প্রতিবন্ধী নারীরা। যা দেখলে আমাদের ভালো লাগার কথা।

কিন্তু অনেক সময় তাদের অসহায়ত্বের কারণে নানাভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ওসব কথা পরিবার জেনেও কিছু বলতে পারছে না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব প্রতিবন্ধী নারীরা লেখা-পড়া করে তারাও প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী বয় ফ্রেন্ডের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তবে দৃষ্টি এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী নারীদের যৌন নির্যাতনের হার বেশি।

প্রতিবন্ধী নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নির্যাতনের বিচার ২০০৯ সালেও মারাত্মক ব্যহত হয়েছে। কারণ, আদালতে মামলার প্রমাণাদি নথিপত্র উপস্থাপন করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি। আর যেসব মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে তা তদন্ত ও সাক্ষীর অভাবে বিচারকার্য দ্রুত নিস্পন্ন হচ্ছে না। ফলে অনেকে নির্যাতনের শিকার হলেও মামলা করলে ঝামেলা পোহাতে হবে বলে মামলা করতে কুণ্ঠাবোধ করে। বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিত নারী ও কন্যা শিশুর সহায়তার জন্য একটি মহিলা সহায়তা কেন্দ্র চালু করেছে। এ কেন্দ্রে নির্যাতিত নারীদের আশ্রয়, বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ ও মামলা পরিচালনার জন্য সহায়তা দিয়ে থাকে। পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীলতার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেশের ১০ জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত স্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারী সংগঠন কাজ করছে। তারপরেও অন্যান্য নারীদের মতো প্রতিবন্ধী নারী নির্যাতনের সংখ্যা কমে নি। একটি কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, নারী নির্যাতনের খবর শুনতে খারাপ লাগে সবার কিন্তু প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরী নির্যাতিত হলে তা হৃদয়কে আরো নাড়া দেয়। বুক কেপে ওঠে।

প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন বন্ধে সমাজে সচেতনতার সাথে সরকারি কঠোর আইন প্রণয়ন করা জরুরী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
উন্নয়নকর্মী এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
মোবাইল নং-০১১৯১০৮৯০৭৫.