ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

আমার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সত্রাজিতপুর নামে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে আমি বড় হয়েছি। সালটি মনে আছে কিন্তু তারিখটি মনে নেই। ২০০৩ সাল। বাড়িতে বসে সংবাদপত্র দেখছি। হঠাৎ গ্রামে কান্নাকাটির আওয়াজ পেলাম। গ্রামের লোক জন দৌড়াচ্ছে। আমিও ছুটলাম। মাত্র ১০০ গজ যেতে না যেতে কান্নাকাটির দৃশ্য দেখতে পেলাম। যার বাড়ি থেকে কান্নার রোল ভেসে আসছে সে একজন দিনমজুর ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। দু’ এক শতক ভিটে মাটি ছাড়া যার কোন সম্পদ নেই। সম্পদ বলতে দুই ছেলে নুরু ও কালু ও দুই মেয়ে। একসময় যার কষ্টে কেটেছে দিন। ছেলে দুটি বড় হয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসারের সচ্ছলতা এনেছে।

দেখা গেলো কালো বিষ খেয়েছে। কেন খেয়েছে জানতে চাইলে বাবা মা উভয়ে কিছু বলতে পারছে না। চিকিৎসার জন্য কোথায় পাঠানো হয়েছে জানতে চাইলে বলল, শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। আমিও ছুটলাম সেখানে বাস যোগে। মাত্র ৬ কিলোমিটারের রাস্তা। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে প্রকাশিত একমাত্র দৈনিক নবাব পত্রিকায় লেখা-লেখিও করতাম। হাসপাতালে গিয়ে দেখি কালুর ভাই নুরু ও বাবা আস্তারুল ছাড়া পাশে কেউ নেই। বাবার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু বের হচ্ছে। নুরুকে জিজ্ঞাসা করলাম ডাক্তার কি চিকিৎসা করেছে? উত্তর দিল না। আমি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ডা. শরিফুল ইসলামের নিকট গেলাম এবং বিষয়টি অবহিত করা মাত্র উনি এলেন। তারপর ইমারজেন্সি বিভাগে নিয়ে গেলাম। ঔষুধ কেনার মত টাকা নেই। কি করবো। মাত্র একশ টাকা ছিলো দিলাম। ঔষুধের ডিসপেন্সারির মালিককে বললাম ঔষুধ যা লাগবে দিন। পরে টাকা দেওয়া হবে। তারপর আমি বাড়ি চলে এলাম। বিকালে শুনি কালু আর নেই। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে পরবাসে। ওর পরিবারের কান্নায় ভারি হয়ে যাচ্ছে গোটা গ্রাম। মারা যাওয়ার সংবাদ শুনে ইউপি সদস্যরা থানায় ছুটাছুটি করছে ইউডি মামলার জন্য।

কিন্তু সেই দৃশ্য দেখে নিজের মধ্যে কান্না এলো। প্রাথমিক অবস্থায় যদি এরূপ ছুটাছুটি করা হতো তবে হয়ত: কালু বেঁচে যেতো। পরিবারে সুখের আলো জলতো। কিন্তু হায়! দেশের গণ্য মান্য ব্যক্তিরা। কেউ এগিয়ে এলো না ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সন্তানকে বাঁচানোর জন্য। মানবতা, দয়া ও মমতা কোথায় গেলো। নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখলাম। কারণ, কিছু করার ছিলো না।

দৃশ্য-২:
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) নামক একটি বেসরকারি সংস্থাতে চাকুরি করার সুবাদে গত ০৭-০৯-২০০৮ ইং তারিখে ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে হলো। বাস যোগে রওয়ানা হয়ে নবাবগঞ্জ সদরে পৌঁছলাম। ব্যাগটা অফিসে রেখে ফ্যাসিলিটেটর সোহেল রানা ও সমন্বয়কারী নুৎফর নাহার আপার সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক হাসপাতালে ছুটলাম। যাওয়ার ব্যাপারে তাদের নিকট জানতে চাইলে তারা বলল: হাসপাতালে দেখতে পাবে একটি দৃশ্য। যা আপনার কাজে লাগবে।
হাসপাতালের রোগীদের কক্ষে ঢুকলাম। দেখলাম একজন বৃদ্ধা একা শুয়ে রয়েছে বেডে। পাশে কেউ নেই। বৃদ্ধা আবার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী (সাওতাল) নারী।

জানতে চাইলাম ওর কি হয়েছে? সোহেল রানা জানালো: ও আমাদের সংগঠনের সদস্য। সে চোখে দেখতে পায় না। গত রাতে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বাঁশের কঞ্চিতে ডান চোখে আঘাত লাগে। এতে ডান চোখটি উপড়ে যায়। চোখ উপড়ে গেলেও বুঝতে পারে নি সে। পাশের একজন আদিবাসী কিশোরীকে ডাকে। কিশোরী দেখে হতবম্ব হয়ে যায়। অবশেষে সোহেল রানা ও নুৎফন নাহার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসক তার চোখটি তুলে ফেলে ব্যন্ডেজ করে দেয়।

আমরা দেখতে যাওয়া মাত্র সোহেলের কণ্ঠ পেয়ে আপেল ও কিসমিস ফল খেতে চাইলো ওই আদিবাসী মহিলা। আমরা কিনে এনে দিলাম। আসার সময় বলল: আবার আমাকে দেখতে আসবেন।

কিন্তু কাজের ব্যস্ততার মাঝে ওর কথা ভূলে গিয়েছিলাম। দেখতে যাওয়া হয় নি তাকে। কোন খোঁজ-খবর রাখতে পারি নি। সেদিন মনে হয়েছি, দেশে লাখ-লাখ পিছিয়ে রাখা ও সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী রয়েছে। যাদের কেউ নেই। যাদের বিপদে কেউ এগিয়ে আসে না। চিকিৎসার অভাবে তারা অকালে প্রাণ হারায়। অথচ দেশের নাগরিক হিসেবে রয়েছে তাদের অধিকার। নির্বাচন আসলে এমপি থেকে শুরু করে উপজেলা, ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীরা ঠিকই ভোট ভিক্ষা করতে তাদের দোয়ারে যান। কিন্তু নির্বাচনে বিজয় লাভ করার পর তাদের ভূলে যান।

লেখক-

আজমাল হোসেন মামুন
(azmal22@gmail.com)
উন্নয়নকর্মী,
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)
দক্ষিণখান, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।
মোবাইল নং-০১১৯১০৮৯০৭৫।