ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমার এক ছোট বোন ভার্সিটিতে পড়ছে কম্পিউটার সায়েন্সে । ভার্সিটি নাম করা নয়। তবে নাম শুনলেই লোকে জামাত জামাত গন্ধ খোঁজে। তার কারণও অবশ্য স্বাভাবিক। শিবিরের যতগুলো শক্তিশালী ঘাঁটি তার মধ্যে এইটা অন্যতম। তো একদিন বোনটি আমাকে ধরল তার একটা চ্যাপ্টার বুঝিয়ে দিতে। আমি বললাম আমি তো এর কি্ছুই জানি না বুঝি না, তোকে বোঝাব কি করে? তোদের স্যাররা তো আছেন উনাদের কাছে যা। শুনে সে বলল-এই কোর্স্ যিনি পড়ান তিনি আমাদেরকে পড়ে আসতে বলেন পড়ান না । আর প্রয়োজনে বড় ভাইদের সাহায্য নিতে বলেন। আমি তার শিক্ষকের নাম জিজ্ঞাসা করলাম। যে নামটি শুনলাম তার সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তাকে আমি চিনি। তার সাথে আমার খুব ঘনিষ্ট এক বন্ধু পড়ত। মাঝে মধ্যে ওদের ডিপার্টমেন্টে আমার যাওয়া আসা ছিল যদিও আমি ঐ ভার্সিটির ছাত্র ছিলাম না। বাড়িতে গেলে যেতাম। তো আমি বললাম পরীক্ষার সময় কি করবি? আমার বোনটি বলল- ভাইয়া তুমি তো সাপ্তাহিক নামাজি। ইমাম সাহেবের সাথে নামাজ পড়লে কি করতে হয় জানো? নিয়ত করেই তো আল্লাহ আল্লাহ করে আশরাফুলের মত কোনমতে পার করে দাও। আমরাও ঐরকম আল্লাহ আল্লাহ করে পার করে দেই। তবে তোমাদের নিয়ত আর আমাদের নিয়তের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। আমি বললাম যেমন। ও বলল আমরা নিয়ত করি এই ভাবে- আমরাও কিছু জানিনা আমাদের স্যারও কিছু জানে না, আল্লাহ তুমি পাস করিয়ে দিও।হাঃ হাঃ।বড় আপুরা বলেছেন এইভাবে নাকি তারাও পাস করেছেন। স্যারের তো খাতা দেখারই সময় নেই। সারাদিন পলিটিকস করে বেড়াই। আমার মুখে আর কোন কথা যোগাল না।

আমি আমার সেই ঘনিষ্ট বন্ধুকে ফোন করলাম এবং জানতে চাইলাম। ও বলল –ও কি পড়াবে ও কি কিছু জানে যে পড়াবে। আমি বললাম তুমি ঐখানে যোগদান করলে না কেন? তুমি তো প্রথম ছিলে? শুনে সে বলল- ভাই আমি তো তোমাদের মতাদর্শের না। আমার গায়ে তো গন্ধ আছে। বলে রাখা ভাল যে ঐ ভার্সিটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এবং ঐ ডিপার্টেমেন্ট চালু হওয়ার পর এ পর্য্ন্ত আমার বন্ধুটিই সবচেয়ে বেশি মার্ক্ নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার পরও তাকে ঐ ডিপার্টমেন্টে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি এবং যে শিক্ষকের কথা আমার ছোটবোন বলেছে সে প্রথম শ্রেণীতে নবম কি দশম। এই চিত্র এখন দেশের প্রায় সব ভার্সিটিতেই। আমার আশংকা যে কজন ভাল মানের শিক্ষক আছেন তাদের অবসরের পর শিক্ষাদানের মত কেউ থাকবেন কিনা। দলীয় পরিচয় যদি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচ্য হয় তবে তা শুধু অন্যায়ই নয় অপরাধও। কারণ দলীয় পরিচয়ে (যে দলেরই হোক না কেন) যদি আল্লাহ আল্লাহ করে পার করে দেওয়া বিজ্ঞ স্যারেরা আসেন তা হলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে জাতি বঞ্চিত হবে এবং এক সময় জাতি মেধাশূন্যদের দিকে ধাবিত হবে। ৭১ সালে যুদ্ধের শেষদিকে শুধু এদেশের মহান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে যাতে সদ্য স্বাধীন দেশকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়ে উন্নতির দিকে নিতে না পারে। এছাড়া পলায়নপর হানাদার পাকিস্তানিদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার মনে হয় না।

বর্তমানে বুয়েট সহ সব ভার্সিটিতে যে অস্থিরতা, তার মূল কারণ শিক্ষকদের অতিমাত্রায় দলীয় লেজুড়বৃত্তি বলে আমি মনে করি। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে শিক্ষকগন পড়ানোর থেকে দলীয় ব্যানারে আন্দোলন করতেই বেশি উৎসাহি। আর তাদের এই উৎসাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আগুনে ঘি ঢালছে ছাত্ররাজনীতির সংগে জড়িত মেধাবী ছাত্ররা। যারা দলের পোষ্টের সুবিধা! নিতে দু একবার ড্রপ দেওয়াকে কিছুই মনে করে না। এরাই আবার শিক্ষক হয়ে একই ভাবে চলতে থাকে। দেশ এগিয়ে যায় না কি হয়, এই বিষয়ে তাদের কোন খোজ নেই।

দেশের সকল রাজনৈতিক দলের কাছে আমার অনুরোধ আর যায় করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন জঘন্য কাজ করবেন না। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে সবাইকে এক হতে হবে। না হলে দেশ একদিন মেধাশুন্য হয়ে যাবে ।অবশ্য এতে লাভই হবে। আমার মত যে কটা গবর গনেশ থাকবে তাদের মাথায় আরামসে কাঠাল কেন যা খুশি ভেংগে খাওয়া যাবে এমনকি বেল, নারকেল সব । আর যারা এধরনের কাজ করছেন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরি করছেন তাদের সন্তানেরা তো এদেশে পড়ে না। কোন একটা লেভেল পাশ দিয়ে ইউরোপের, বিশেষ করে লন্ডনের কোন এক কুখ্যাত/অখ্যাত বা বিখ্যাত ল কলেজে ভর্তি হয়েই ব্যারিষ্টার বনে যাচ্ছে।সেখানে উনারা পড়ালেখা করেন কি কি করেন সে খবর তো কেউ রাখে না। বিলেত গেলেই ব্যারিষ্টার ব্যাপারটা এই রকম আর কি। আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল ইতোমধ্যেই কয়েকজন ব্যারিষ্টার এদেশে এসে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সামন্ত প্রভু বনে গেছেন এবং যথারীতি আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন।

এখনই সময় সচেতন হওয়ার। এইভাবে নিরবে আমরা আমাদের মেধাবীদের হারাতে পারি না। এটা অন্যায় এবং অপরাধ।এই অপরাধের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে তা জাতির জন্য এক ভয়ংকর বিপদ হবে।

ও হ্যা । আমার ঐ বন্ধুটি বর্তমানে প্রবাসী। আর আসবে না বলে জনিয়ে দিয়েছে। আমি অনুরোধ করেছি। বলেছি যে যাই করুক এদেশের সাধারন মানুষের ঋণ তুমি অস্বীকার করতে পার না। তোমার পিছনে সরকার যে টাকা খরচ করেছে তার মধ্যে একজন ভিক্ষুকেরও ট্যাক্স আছে। অবশ্য তাতে তার মন গলবে বলে মনে হল না। সে এতটাই হতাশ।