ক্যাটেগরিঃ কৃষি

আমাদের এলাকাতে ক্ষুদ্র ঋণকে লোকে কিস্তি ঋণ হিসেবেই জানে। মোটামুটি প্রায় ১০/১২ টা ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসায়ী এই এলাকাতে ব্যবসা করছে। এবং মজার ব্যাপার হল একজন ঋণ গ্রহিতা একই সাথে ২ এর অধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে। এ বিষয়ে আমি আমার এক শ্রদ্ধেয় স্যার জনাব বাকী খলিলী কে প্রশ্ন করেছিলাম। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। উনি আমাকে বললেন “এ টাকে overlapping বলে। যদি কারো ঋণের চাহিদা থাকে এবং সে তার বর্তমান প্রতিষ্ঠান থেকে না পায় তবে সে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে তার চাহিদা পূরণ করে। এটা এমন কিছু না। তবে আরো একটা কারণ হল লোন রি-পেমেন্ট। লোন রি-পেমেন্ট এর জন্য অনেকে একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়।” বিষয়টি আরো জানার জন্য ২০০৬ এর দিকে আমি একটি জরিপ কার্য চালায়। আমি উপজেলা শহর, শহরের উপকণ্ঠ এবং প্রত্যন্ত কৃষি প্রধান (যেখানে কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোন কিছু করার সুযোগ নেই) এলাকাকে নমুনা হিসেবে বেছে নেই। আমি খুজে বের করি একের অধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ করেছে এমন ঋণ গ্রহীতাকে। তারপর তাদের একাধিক সদস্য হওয়ার বিষয়ে জানতে চায় এবং একই সাথে অন্যান্য সদস্যের সাথে আলাপ করি। আমার ঐ কাজের ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। পঞ্চাশ শতাংশের বেশি লোক একের অধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ করেছে এবং তাদের মধ্যে মাত্র দু জনকে পেয়েছিলাম যারা তাদের অতিরিক্ত চাহিদার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়েছিল। এবং তারা দু’জনই কৃষির সাথে জড়িত নয়। তারা দু জনই ব্যবসার সাথে জড়িত। একজন মিষ্টির ব্যবসা করে অন্য জন মুদি দোকানদার এবং সাথে চাষাবাদও করে। বাকি সবাই লোন পরিশোধ করার জন্যই একের অধিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়েছিল। বিষয়টা দরিদ্রের দুষ্ট চক্রের মত। ঘুরে ফিরে সেই ঋণ গ্রহিতা। এর থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই। আর এটাই কিস্তি ঋণের ব্যবসা প্রসারের অন্যতম কারণ। তবে একেবারেই যে কিছু হয়নি তা নয়। আমি ঐ জরিপে এমন কিছু লোককে পেয়েছিলাম যে আগে খুবই কষ্ট করে চলত। এখন তারা বেশ ভাল। তারা কেউ ভ্যানগাড়ি কিনেছে কেউ ছোট ব্যবসা করেছে। তারা সবাই ভাল করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র কৃষিতে ঋণ করে কেউ কিছু করতে পারেনি। বরং তাদের কেউ কেউ অভিমত দিয়েছে আগেই ভাল ছিলাম বলে।

তাহলে কৃষকেরা কিস্তি ঋণ নিচ্ছে কেন? প্রথম কথা হল জামানত ছাড়া কেউ তাদের ঋণ দেয় না। আর তাদের টাকা দরকার তা পেটে খাওয়ার জন্যই হোক আর উৎপাদনের জন্যই হোক। ব্যাংক ঋণের আরেকটা খারাপ দিক হল বেশ ক’দিন ঘোরার পরেও ঋণ নাও হতে পারে। এখানে তাদের একটা খরচ হয়ে যায়। শুধু যাতায়াত খরচই নয়, জন (কামলা) খরচও একটা বড় ইস্যু। যা কিস্তি ঋনের জন্য হয় না। এই কারনে কৃষকরা কিস্তি ঋণের দিকে যায়।

প্রশ্ন হল, কেন কৃষিতে ক্ষুদ্র ঋণ সফল হয় না?
এর উত্তর এভাবে দেওয়া যেতে পারে। ঋণ নেয়ার পরের সপ্তাহ থেকেই কিস্তির টাকা জমা দিতে হয়। আমাদের দেশে এমন কোন কৃষি নেই যা পরের সপ্তাহেই বিক্রয়যোগ্য হয়। তাহলে ঐ কিস্তিধারী কিভাবে পরের সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ করবে?

কৃষিতে ঋন এ কোন সময় বেধে দেওয়া হয় না যে এই সময়ের পর থেকে ঋণ পরিশোধযোগ্য হবে। যা অন্যান্য ঋণের বেলায় দেওয়া হয় ।

আমাদের দেশে কৃষি খুবই ঝুঁকির বিনিয়োগ। শস্য বীমা নেই। খরা, অতি বৃষ্টি, ঝড় শিলাবৃষ্টিতে প্রায়ই আমাদের কৃষি পন্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আর এটা হলে ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা। নিজের জীবন বাঁচানোই কষ্টকর।

আমাদের দেশে কৃষি পন্যের ন্যায্য মূল্য নেই। উৎপাদনে রেকর্ড্ করলেও উৎপাদন খরচই উঠাতে পারে না আমাদের কৃষক।
সুতরাং কৃষিতে কিস্তি ঋণ কোন ভাবেই সফল হবে না। তবে কি কিস্তি ঋণ ব্যর্থ্? না, আমি সে কথা বলিনি। কিস্তি ঋণ কখন কোথায় সফল হতে পারে তা পরের কোন এক কিস্তিতে আলোচনার আশা রাখি।