ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

স্ট্রিট চিলড্রেন- পেশাদার অপরাধী তৈরির আঁতুড়ঘর (০১)

কেন ওরা অপরাধী হয়ে উঠে?
ডাঃ নিতাই চন্দ্র হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃতদের সাথে আমার সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়নি তবে জামানের সহযোগীতায় অসহায় জীবন ও তার দলের সাথে আমার একান্তে কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাদের অপরাধী হয়ে উঠার গল্পের সারাংশ ছিল এ রকম-

“স্যার আমরা নিজেদেরকে অপরাধী মনে করি না। আপনি দেখেন সবাই কোন না কোনভাবে উপার্জ্ন করছে। আমাদের সে সুযোগ নেই। আমাদের শিক্ষা নেই, আমাদের ব্যবসা করার কোন টাকা নেই, আমাদের থাকার কোন ঘর নেই। আছে শুধু একটা জীবন। এমপি, মন্ত্রি, সরকারী কর্মচারী, সাংবাদিক সবাই অবৈধভাবে আয় করছে। আমাদের সে সুযোগ নেই তাই ছিনতাই- চুরি করছি । এতে দোষের কিছু নেই।”
বিষয়টি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা অপরাধ বিজ্ঞানের সহায়তা নিতে পারি। অপরাধ বিজ্ঞানের অনেক থিওরির মধ্যে অন্যতম একটি থিওরি হল “ডিফারেনসিয়াল এসোসিয়েশন” থিওরি। যেখানে বলা হয়েছে অপরাধ হল সংক্রামক রোগের মত। একজন থেকে অনেকজনের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। সমাজের অন্য অপরাধীর অপরাধ কর্মকান্ড ও তাদের শাস্তি না হওয়া, অপরাধের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া একজন নিরাপরাধ ব্যক্তির মধ্যে সংক্রামিত হয়। নিরাপরাধ (non-criminal) ব্যক্তি তখন নিজের মত করে ব্যাখ্যা দাড় করায় এবং তার অপরাধমূলক কাজ যে অপরাধ নয় তা যেকোন ভাবে প্রমাণ করতে চায় ও করে। সমাজের সুবিধাবণ্চিতরাই সাধারণত এই দলের হয়ে থাকে যা অসহায় জীবন ও তার সহযোগীদের ক্ষেত্রে হয়েছে।

অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই অপরাধী ( লম্ব্রসো থিওরি) । ব্যাখ্যায় দাড়ায় এরকম যে কিছু মানুষের গঠন দেখেই বোঝা যায় যে সে অপরাধী। যেমন অতিরিক্ত লম্বা হাত বা পা (বক্তিয়ার খলজি অপরাধী ছিলেন কি?), বড় কপাল, টেরা বা এক চোখ অন্ধ, হাতপা অস্বাভাবিক, অতিরিক্ত লোমশ শরীর, বড় বা কুতকুতে চোখ । সাধারনত inferiority complex থেকেই তারা অপরাধমূলক কাজকর্ম করে থাকে। থিওরিটি প্রসিদ্ধ নয়।

আরেকটি থিওরি এরকম যে অপরাধীরা অপরাধ করার আগে হিসেব করে নেয় যে ঐ অপরাধমূলক কাজ থেকে লাভ কত আসবে, তাতে ঝুকি কেমন বা শাস্তির মাত্রা বা সম্ভাবনা কেমন। যদি দেখে লাভের অংক ভারী তখন তারা সে কাজ করে অন্যথায় করে না। সাধারনত হোয়াট কলার ক্রিমিনালরা এধরনের হিসেবে যায়। তবে সব ক্রিমিনালরাই এধরনের হিসেব করে বলে আমার মনে হয়।
অসহায় জীবন ও তার দলের সাথে কথা বলে আমার যা মনে হয়েছে তা হল তারা –

প্রথমত, তারা তাদের মা-বাবার কাছ থেকে পারিবারিক শিক্ষাটি একেবারেই পায়নি যা ন্যায় অন্যায়ের প্রভেদ বুঝতে সহায়তা করে। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা হল তার পারিবারিক শিক্ষা। যার এ শিক্ষায় গলদ আছে তার জীবনের সব যায়গাতেই গলত থাকবে বলে সমাজবিজ্ঞানীগন মতপ্রকাশ করেন। তবে যাদের জীবনের শুরুই হয় রাস্তায় তাদের পারিবারিক শিক্ষাটা কেমন হয় তা সহজেই অনুমেয়।
দ্বিতীয়ত, মা-বাবার সংসার ভেঙ্গে যাওয়া ও তাদের অনাদর অবহেলায় জেদি হয়ে যাওয়া। এই কারণটি শুধুমাত্র রাস্তার সন্তানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়, সমাজের বিত্তবান শ্রেণীতেও সমান ও ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য যেহেতু বিষয়টি সার্বজনীন।

তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাও হয়নি যা তাদেরকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তোলা যায় বলে অপরাধ বিজ্ঞানীগন মনে করেন।
চতুর্থ্ত, তারা সমাজের অন্য আইন ভঙ্গকারীর দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করেছে সমাজের একজন সুবিধা বণ্চিত মানুষ হিসেবে।

পণ্ঞমত, রাস্তায় বেড়ে ওঠায় এবং তাদের স্থায়ী কোন ঠিকানা ও অভিবাবক না থাকায় তাদেরকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এবং খুব সম্ভবত প্রধান কারণ হল অভাব ব্যাখ্যায় পেটের আহারের অভাব। এই কারণটি রাস্তার সন্তানদের জন্য বিশেষভাবে ও সর্বোত্তমভাবে প্রযোজ্য হলেও সমাজের উচ্চ শ্রেণীর জন্য একেবারেই প্রযোজ্য নয়। কারণ অভাব বিষয়টি আপেক্ষিক।

অপরাধী হিসেবে গড়ে ওঠার আগেই তাদের ন্যুনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন আমার আপনার বাজারের ব্যাগ (মানি ব্যাগ তারা এখনই কেড়ে নেয়) কেড়ে নিবে আর আমি আপনি তাকিয়ে দেখব।