ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

গনি মিয়া একজন কৃষক। অবশ্যই তিনি গরীব বর্গাচাষী নন। তিনি উত্তরাধীকারসূত্রে ও নিজগুনে অত্র এলাকার এমনকি উপমহাদেশের একজন নামীদামী ক্ষমতাবান কৃষকে উপনিত হইয়াছেন। তাহার বিষয় সম্পত্তি এত্ত যে তিনি নিজেও তাহার সঠিক হিসেব বলিতে পারিতেন না। এজন্য তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা টাইপ উপদেষ্টা রাখিয়াছেন। তাহারাই সমস্ত হিসেব নিকেষ করিয়া কী সব কঠিন ফর্মুলায় ফেলিয়া ফলনের হিসেব বাহির করিয়া দিতেন। গনি মিয়া জনসেবায় এতই ব্যস্ত থাকিতেন যে তাহার কোন মাঠের কোন দাগের কোন জমিনটাতে ধান বপন করা হইয়াছে, কোনটাতে কুষ্টা বপন করা হইয়াছে বা কোনটা “আগাছায়” ভরিয়া উঠিয়াছে তাহার খবর রাখার সময় করিয়া উঠিতে পারিতেন না। অবশ্য তাহার কতিপয় ভক্তকুল সেসমস্ত খবর করিয়া দিতেন বটে তিনি তাহা কানে তুলিতেন না। গনি মিয়ার কর্মীকুল উপদেষ্টাকুল গত বারের বাম্পার ফলনের ফল ভোগ করিয়া শেষ করিলেও এবারের ”কেতাড়ির” ফলন গতবারের মেহনতের ফলনের তুলনায় এতই ফলিয়াছে যে আগামী কয়েক পুরুষ তাহা বসিয়া খাইতে পারিবেন বলিয়া ভাবিতেছেন। তাহারা ক্ষেত পরিচর্যার কথা ভুলিয়া নিজ উদরপূর্তি লইয়া মাতিয়া রহিলেন।

এদিকে অনাদরে অবহেলায় গনি মিয়ার সোনার ক্ষেত ক্রমে ক্রমে আগাছায় ভরিয়া উঠিল। কিন্তু তাহার উপদেষ্টাকুল এ বিষয়ে তাহাকে কিছুই অবগত করিলেন না। গনি মিয়ার তথ্য সেরেস্তা সমস্ত তথ্য বন্ধক লইয়া লইলেন।

মার্কিন মূল্লুকের এক যুবক এক ভয়াবহ ধারাপাতের পুস্তক আবিস্কার করিয়া বিশ্বে হইচই ফেলিয়া দিলেন। প্রযুক্তির কল্যাণে তাহার ধারাপাত পুস্তকখানি বায়ুর বেগে ছড়াইয়া পড়িল। ইহা এমনই ধারার ধারাপাত যে কোন ধারাই মানিতে চাহে না। গনি মিয়াও সেই ধারাপাত স্কুলে ভর্তি হইলেন। তিনি এখন নিয়ম করিয়া এই ধারাপাত পুস্তকখানিতে নজর বুলাইতেন। তাহার জনসেবার মাধ্যম হইয়া উঠিল এই ধারাপাত স্কুল। আষাড়ের বর্ষন থেকে শুরু করিয়া শিশু কন্যার ধর্ষনের খবর পর্যন্ত এই ধারাপাতের ধারা হইয়া উঠিল। কোথায় মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধ হইল, কোন পন্ডিত মনের দুঃখে গলায় দড়ি লটকাইবার ইচ্ছা পোষন করিলেন, কোথায় উর্দি পরা কিছু শিকারী পাখি শিকার করিয়া ফেলিলেন তাহার খবর পর্যন্ত দিতে লাগিল এই ধারাপাত। একদিন গনি মিয়ার তথ্য সেরেস্তার বন্ধক রাখা তথ্যরাজি কে বা কাহারা কেমন করিয়া যেন চুরি করিয়া এই ধারাপাতের এক পাতায় নতুন ঘরের নামতা নামাইয়া দিলেন।

এইবার গনি মিয়া সত্যি সত্যিই ভাবনায় পড়িলেন। তাহার সোনার ক্ষেত আগাছায় ভরিয়া উঠিয়াছে। এই বতরের ফলনে ধ্বস নামিতেছে ইহা এক প্রকারে নিশ্চিত হইলেন। তিনি উপদেষ্টাগনকে ডাকিয়া ইহার প্রতিকার চাহিলেন। তাহারা বলিয়া উঠিলেন ”এইটা কুনু বিষয়ই না। আমরা অতিশীঘ্রই উচ্চ ফলনশীল “হাইব্রিড” জাতের আমদানী করিব। গত বতরের তুলনায় কিভাবে জ্যামিতিকহারে ফলন বাড়িবে তাহার হিসাব করিয়া দিলেন। শুনিয়া গনি মিয়া আবার জনসেবায় মনোনিবেশ করিলেন। আগাছা পরিস্কার কথা বলিয়াও তিনি তাহা করিলেন না। এদিকে আমদানীকৃত হাইব্রিড সহজেই অরিজিনাল ফসলকে টপকাইয়া গনিমিয়ার পছন্দনীয় হইয়া উঠিল। সে বতরের উচ্চ ফলনে গনি মিয়া ও তার পরিবার খুশি হইলেন। পরের বতরে আর নতুন চাষ হইল না।’’কেতাড়ি”এইবার এমনভাবে ফলিল যে আগামী বিশ বছর কি তারও বেশি সময় খাইয়াও ইহা শেষ করা যাইবে না বলিয়া গনি মিয়ার উপদেষ্টাগন আঙ্ক কষিয়া বাহির করিলেন। এইবার তাহারা হাইব্রিডকে অতি আদর করিতে লাগিলেন। অতি আদর পাইয়া উহারা বাদরে পরিনত হইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে উহা ভয়ংকর আগাছায় পরিনিত হইয়া গনি মিয়ার সোনার ক্ষেত আগাছাময় করিয়া ফেলিল। গনি মিয়া এইবার নিজ হাতে আগাছা বাছিবে বলিয়া ঠিক করিলেন। তিনি নিজে তাহার সোনার ক্ষেতে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন অনাদরে অবহেলায় তাহার সোনার ফসল দুর্বল হইয়া মরিয়া পড়িয়া রহিয়াছে আর আগাছা সমস্ত ক্ষেত দখল করিয়া ক্ষেতের শোভা বর্ধন করিতেছে। আগাছা বাছিতে গেলে তাহার সোনার ক্ষেত এখন বিরান ভূমিতে পরিনত হইয়া যাইবে। ভাবিয়া ভাবিয়া গনি মিয়া অসুখ বাধাইয়া ফেলিলেন। ঘুমের মধ্যে প্রায়ই তিনি “আগাছা বাছিয়া ফেল” “আগাছা বাছিয়া ফেল” বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিতে লাগিলেন। তাহার এই অবস্থা দেখিয়া উপদেস্টাগন কবিরাজ ধরিয়া আনিলেন। এতবড় একজন ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য কবিরাজ আনিতে হইল কেন সে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি। সে বছর মেডিকেলে যাহারা ভর্তি হইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে শেষপর্যন্ত কেউই পাশ করিতে না পারিয়া কবিরাজি শিখিয়া দু পয়সা করিয়া খাইতেছেন। আর অতি অল্প সংখ্যক যাহারা পাশ করিয়াছিলেন তাহারা অপমানে ও অতিহুমকির কারনে জীবন বাচানোর তাগিদে দেশ ছাড়িয়ছিলেন। সেই সময় হইতে কবিরাজিই একমাত্র ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা বলিয়া স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে।