ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠেছে লাল ফুল!
কি ব্যাপার? নীল ফুলের ঘুম ভাঙ্গছে না কেন? অথচ কাল রাতেও সে ছিল হাসিখুশি উচ্ছল। এত বেলা করে উঠার অভ্যেস নেই ওর। সূর্য উঠে গেছে প্রায় মাথার উপর। হলোটা কি?
‘কি জানি! হয়তো ওর জমজ বোনটির কথা মনে পড়েছে।’স্বগত ভাবে নিজেকে শোনাচ্ছে লাল ফুল। গতকাল ওর হাসিখুশি বোনটাকে মালী এসে তুলে নিয়ে গেছে। এজন্যই হয়তো ওর মন খারাপ।
কিন্তু…।আনমনে মাথা নাড়ল লালফুল, যেন মেনে নিতে পারছেনা। এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাই বলে এতোক্ষণ মন খারাপ করে থাকতে হবে? লাল ফুলের ভাবনায় এবার একটু অনুযোগ।
দুপুরের শুষ্ক বাতাসে একটু দুলে উঠল সে। খুব অসহায় বোধ করছে। সুখবরটা এক্ষুণি ওকে জানানো দরকার।
এবার সে ছটফট করে উঠল।
নতুন অতিথি আসছে আজ ওর বাড়ি। তার জন্য সারারাত ভরে তৈরি করেছে মৌসুমের শ্রেষ্ঠ মধু। আজ যে ওর আনন্দের দিন! নিজেকে প্রথমবারের বিলিয়ে দেবার দিন-যেখানেই ফুলের ধর্ম নিহিত। আনমনে হেসে ফেললো সে। তার ছিপছিপে লাল রঙ আরো গাঢ় হয়ে উঠল। এবার লাল ফুলটাকে ছোট্ট পরীর মত লাগছে। আড়মোড়া ভেঙ্গে, সে নিজের পাপড়ি গুলোকে আরো একটু ছড়িয়ে দিল।

চুপচাপ মুখোমুখি চেয়ে আছে লাল ফুল আর নীল ফুল। লাল যেন বিশ্বাসই করতে পারছেনা! ফুলের জীবনেও এমন হয়! যেই নীল তাকে মধু বানাতে শেখালো, সেই নীলের গায়ে আজ বিষের ছোপ? এই মৃদু হাওয়াতেও ওরা যেন দুলতে ভুলে গেছে। অথচ কত মজা করেই না তারা দুলে দুলে একে অন্যের গায়ে লুটিয়ে পড়তো। হেসে কুটি কুটি হত।
‘বিশ্বাস কর লাল, আমি মধুই বানিয়েছি!’ ডুকরে কেঁদে উঠল নীল। ‘কিন্তু এই মধুই তো ওর জন্য বিষ! আহ! কত পতঙ্গের মৃত্যুর বান ডেকেছে আমারই গর্ভে! আমিই ওদের হত্যাকারী!’ যেন স্বীকারোক্তি দিচ্ছে সে। হ্যাঁ আমিই। নয়তো কি? এরচে’ ভালো ছিল কোন দুষ্ট শিশু যদি আমার গলাটা চেপে ধরে ছিঁড়ে নিত। বৃতির গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। সময় ফুরিয়ে এসেছে। সেই বিষাক্ত পতঙ্গের প্রলম্বিত পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হু হু করে উঠলো সে-‘কিছুই করার নেই আমার’। ঝলমলে নীলফুলের রঙ যেন কালচে হয়ে উঠেছে অনাগত দূর্ঘটনার আশঙ্কায়।

এই দুটি ফুল একসঙ্গে বসে দেখছে দুটি পতঙ্গের আগমন। মৌমাছি আর মাকড়শা। একজন বাতাসের মত চঞ্চল, অন্যটি বিভীষিকার মত ধীর। প্রথমটা লাল-এর অতিথি। দ্বিতীয়টা নীল-এর আগন্তুক! পাশাপাশি দুটি ফুলের একই সঙ্গে সম্প্রদান চলবে মধু এবং বিষের। ওরা দুজন ভাবছে-একই মমতা দিয়ে বানানো একই ক্ষরিত অশ্রু কেন দুটি বৈপরীত্য সৃষ্টি করবে? দুটি নিষ্পাপ ফুলের এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? নীল ফুল তো কোন অন্যায় করেনি! লালফুলও না। জানিনা সেদিন ফুলের কান্না শুনে বিধাতা নড়েচড়ে বসেছিলেন কিনা, তবে মুচকি হেসে নির্বোধ এক প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন।

পরদিন সকালে মালী এসে সবকয়টি ফুলের উপর জাল পেতে দিল। কারণ হিসেবে জানা গেছে, পতঙ্গরা এসে ফুলের লাবণ্য নষ্ট করে দেয়। যেহেতু মধুক্ষরা ফুল একই সঙ্গে বিষক্ষরা-সুতরাং চলবেনা কোন ক্ষরণ। তাই এই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। দুটোই বন্ধ।
মালী নিজের বুদ্ধিতে সন্তুষ্ট হয়ে হো হো করে হেসে উঠল। দুহাত দিয়ে মাকড়শার বাসা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে অশ্রাব্য গালাগাল করে উঠল। ‘এবার বানাও বিষ!’ মালীর কন্ঠে শ্লেষ।
সে দেখতে পেলনা, তার ঠিক মাথার উপরেই একটা মৌমাছি-ঘুরঘুর করছিল। ফুলের গায়ে জাল পাতা থাকলে তো আর মধু বানানো যায়না!
তার পাখার ঝাপটা কান্নার শব্দের মত শোনাচ্ছিল।

পরিশিষ্টঃ
পরাগায়ন বন্ধ হয়ে যাবার কারণে, ওই বাগানের সব ফুল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে।
মোমের অভাবে ও বাড়ির ছেলেটা পরীক্ষায় খারাপ করেছে। কি এক অদ্ভুত কারণে এদিকের বাজারে সেদিন আলো জ্বালাবার জন্য কোন মোম খুঁজে পায়নি।
বাসার ফুলদানী গুলোতে মাকড়শা বাসা করেছিল যেন উপহাস করতেই!