ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

১.
ঢাকায় আমরা দুই অবিবাহিত তরুন থাকি একরুমের এক বাসায়। রুমের ভেতরে বাড়ীওয়ালা সুকৌশলে রান্না ও ধোঁবার জায়গা এবং ইটের ওপর ইট গেঁথে পরিচ্ছন্ন হবার ঘর বানিয়েছেন। মাথার ওপরে টিনের চাল আর তার নীচে ভদ্রতা দেখাতে হার্ডবোর্ডের স্তর। বাসাটার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উত্তরমুখি খোলা বারান্দা। যা আমার অনেকদিনের কাম্য ছিলো। আশপাশে দম ফেলার মতো ফাঁকা জায়গা পাওয়া গেছে পশ্চিম পাশে টিনশেড বসত এবং উত্তরে দুই বাসার মাঝখানে রাস্তা একে ফেলাতে। তাই মোটামুটি খোলামেলা এ বাসা আমার প্রচন্ড ভালোলাগায় গেঁড়ে ফেলেছে। যদিও ছাদের ওপর অবৈধ বর্দ্ধিত অংশ হিসেবে একটু বেশী ভাড়ায় একরুমের বাসা, তাতে কি। অন্ততপক্ষে অবিবাহিত হিসেবে বিনা শর্তে ভাড়াতো থাকতে পারছি। আর প্রতিবছর কোন কারন এবং নিয়ম ছাড়াই ভাড়া বাড়ার ভয় তাতেই বা কি এসে যায়। আমার মতো আরো তিন পরিবার তো আছে এখানে। ও গাঁয়ে সয়ে গেছে। আমি না থাকলে আর একজন এসে থাকবে। তাই ভেতো বাঙ্গালি হিসেবে সে সুযোগ কাউকে না দিয়ে দিব্যি আমার এ চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি।
২.
একদিন রাতে বাজার করে বাসায় ফিরে রান্না শুরু করতে, আমার আবাসভাগীর (Conventional) সঙ্গে কথাচ্ছলে বললাম
: ভাই যাই করেন তাই করেন, ঢাকায় কিছু করার চিন্তা কইরেননা।
উনি স্বভাব বিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন : কেনো।
আমি চটপট উত্তর দিলাম : দেখেন ঢাকা শহরের অবস্থা খুব বেশী ভালো না। যে হারে ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে জীবন স্থবীর হতে খুব বেশী সময় লাগবে না। আপনার জীবদ্মশা বলতে কিছুদিনের মধ্যে দেখবেন শহরে পানি, বিদ্যুত, গ্যাস সহ যেসব নাগরিক সুবিধা আছে তা একবারে মুখ থুবরে পড়বে।
: তাতে আমার কি, আমি হচ্ছে ভালো চাকরি করবো খাবোদাবো আর নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াবো।
: ভাইরে বুঝতেছেননা, যে শহরে এসব সুবিধা নেই সেখানে থাকবেন কি করে, চাকরিতো পরের কথা। আর সবাই এখন ঢাকা-মুখি। তারমানে ঢাকার বাইরে ফাঁকা। এই ফাঁকা মাঠে গোল দিতে আপনি যাবেন বাইরে। তাতে জীবন এবং ভবিষ্যত দুটোই সুরক্ষিত হবে। আপনি পড়াশুনা করছেন ব্যাবসায় ব্যাবস্থাপনার ওপর, গ্রামে বা অন্য শহরে গিয়ে আপনি যদি কোন উদ্যোগ নেন তবে আপনার চাইতে কে বেশী সফল হবে ভেবে দেখছেন কখনো। আপনারা পড়ে থাকবেন সেই মধ্যবিত্ত ধ্যানে। ঝুকি নিবেননা অথচ থাকতে চান ভালো। আপনারইবা দোষ কি, আপনার বাপতো আপনারে পড়াইতেছে বড়সর কোন কোম্পানি বা ব্যাংকে মোটা বেতনে চাকনি করার জন্য। চাকরিই করবেন যখন করেন সমস্যা নাই তয় ঢাকা ছাড়েন।
: ঢাকার বাইরে কোথায় চাকরি আছে?
: আছে আপনার চাহিদা অনুযায়ী খোঁজ নিয়ে দেখেন। ব্যাংক বলেন আর কোম্পানি বলেন বাংলাদেশের সব বড় শহরে তাদের শাখা আছে। এইকি যে কর্পোরেট টেস্ট পাবেননা। নগরায়ন এখন গ্রাম গ্রাস করতেছে, যার প্রমাণ থানা সদরে এটিএম বুথ। সো সময় থাকতে থাকতে ঢাকা ছাড়েন।
( প্রকৃতপক্ষে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছি অন্য কারনে। )
রীতি মোতবেক সে কিছুক্ষণ পর বলে : আপনি মিয়া ভবিষ্যতের কথা কন। আমি কালকের কথাই চিন্তা করিনা। আইজকে কি হবে সেটা কন।
: আমি ভাই ভবিষ্যতের কথা ভাবি।
: আইজকে বাঁচলেই আমার চলবে।
৩.
আমার আবাসভাগীর কিছুটা পরিচয় দিতে হয়। তিন ভাইবোন আর বাবা-মায়ের সংসারের বড় সন্তান তিনি। একমাত্র উপার্জনকারী বাবা পেশায় দলিল লেখক। সীমান্ত এবং চরমপন্থী এলাকা মেহেরপুরের গাংনিতে বসবাস তাদের। বয়োপ্রাপ্তির পর উচ্ছন্নে যাবার প্রেক্ষিতে অনেকটা সময় নষ্ট করে হলেও প্রজন্ম রক্ষার চিন্তায় চিন্তিত বাবা শেষ পযর্ন্ত ছেলেকে ভর্তি করেন এক স্বনামধন্য উন্নয়ন সংস্থার নামে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানে।
৪.
তার বর্তমান সময় কাটে ফোনে কথা বলে আর ঘুমিয়ে। কিছুদিন আগে অবশ্য আর একটা কাজ ছিলো। চাপে পড়ে বন্ধ রেখেছেন অথবা বাইরে সেরে আসছেন সে কাজটি। বিবিএ শেষ করা উনি কখনো প্রকল্প () পত্র নিজে করেননি। এমনকি শেষ প্রকল্প পত্রে শিক্ষক নির্দেশনা দিলেন এবং বলেছিলেন এভাবে করলে তিনি এ মাইনাসের উপর মার্কস পেতে পারেন। তার থোরাই কেয়ার। এভাবে কোন না কোন বন্ধুর সহায়তায় শিক্ষার এক স্তর পার করে তিনি জানেননা Conventional মানে কি! অথচ সভ্য জগতে ভাববার অযোগ্য শব্দাবলীতে অলংকৃত করেন তার সম্মানিত শিক্ষককে।
৫.
আজকে আবার মনে হলো সে কথা, নাহ্ এ কোনমতেই ঢাকা থাকার যোগ্য না। রাগেই মাথায় আসলো কথা। যার কারন বলতে আরেক গল্প শুরু হবে। তার চেয়ে ঠিক ঐ সময়ে আমাদের দুজনের অবস্থা বর্ণনা করি।
আমি বাসায় ঢুকেই রান্নার জন্যে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম।
আসলে আমি নিজে রান্না খেতে খুব পছন্দ করি এবং অন্যরাও করে। তাই আমি যখন আমার রান্না করি সাথে ওনারটা যোগ করে দিতে কোন আপত্তি করিনা। অন্ততপক্ষে আমার উছিলায় বিনা পরিশ্রমে বেচারা দুটো খেতে পাচ্ছে।
উনি বাসায় ঢুকেছেন কানে ফোন নিয়ে। সন্ধ্যায় দেখা হতেই জানিয়েছে নতুন মাল পেয়েছে। ঐ তার সাথে কথা চলছে আর কি।
৬.
তিনি এরকম আরো অনেক মালের সাথেই টাংকু মেরে থাকেন যতদিন পযর্ন্ত পাত্তা পান। আমার প্রশ্ন এর দরকার কি? উত্তর : সেক্স এর জন্য। এক্ষেত্রে উনার আবার বিশেষ পছন্দ বিবাহিত মহিলা। কারন তাদের সঙ্গে বাঁধা পড়ার ভয় নেই। যতদিন পারো মধু খাও নিশ্চিন্তে। আমি বলি : তাই যদি হয়, তাহলে আপনি দেখেশুনে একটা ভাড়ায় চালিত ইঞ্জিন নিয়ে নেন। কারন আপনি ফোনে তো প্রতিদিন ১৫০ টাকার ওপরে খরচ করছেন। আমার মনে হয় চুক্তি করলে আপনি ওই টাকায় ভালোই পাবেন। তিনি জানান : ওইসব সেফ না। আমি বলি : তাহলে নির্দিষ্ট একজন বেছে নেন। এখন এরকম ডেসপারেট এবং উইলিং মেয়ে পাওয়া যায় এই ঢাকা শহরে। তিনি বলেন : দরকার নেই আমার। আমি বলি : তাহলে আর একটা সংসার ভাঙ্গার কারন হবেননা দয়া করে।
৭.
তিনি দিনে কমপক্ষে ১৫ টার মতো বেনসন সিগারেট টানেন অথচ বাজার করার টাকা থাকেনা পকেটে। তার ধারণা মেয়েদেরকে পটানো খুব সহজ। তারা শুধু প্রেম চায়। এছাড়া আর কোন কাজে নেই। তিনি মেয়েদেরকে শারীরীক ভোগের পণ্য ব্যাতিত আর কিছু ভাবতে পারেননা। তবে তারও একটা বোন আছে। আমি জিজ্ঞেস করিনি তার সর্ম্পকে। ভয় করে।
৮.
আজ চুঁলোয় রান্না বসিয়ে পুরোনো ‘সিল্করুট’ পড়ে জানতে পারলাম সরকার এসপিআর না মেনে ওভারপাস এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করছে। এ প্রসঙ্গে ড. মাহামুদুল বারী, ড. সরওয়া জাহান এবং ড. শামসুল হকদের আশঙ্কার বাণীও যোগ করা হয়েছে উক্ত সংখ্যায়। অনেকদিন আগে কোথাও পড়েছিলাম প্ল্যানিং ইজ্ঞিনিয়ার এসোসিয়েশন ঢাকার চর্তুদিকে ৩০ বা ৪০ মাইল পযর্ন্ত আটলেনের রাস্তা করার প্রকল্প প্রস্তাব করেছিলো সরকারের কাছে। জানিনা তার কি দশা। শুনছি মেট্রো রেলও হবে।
৮.
‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’এখন পুরোনো স্লোগান। তার মানে এখন আমরা? আমাদের দেশে উন্নয়ন আসছে উন্নত দেশের পরামর্শে ও সাহায্যে। এক্ষেত্রে আমরা হচ্ছি তাদের গিনিপিগ অথচ কারো কোন মাথাব্যাথা নেই। সম্ভবত মাথাই নেই! বর্তমানে আমেরিকান আমার এক ভাস্তি ছোটবেলায় এক বুলি শিখেছিলো। বুলিটি হচ্ছে : তোমার মাথায় কি আছে জানো! তোমার মাথায় গু আছে গু। হে হে হে!

চিন্তামন তুষার
কাজীপাড়া, ঢাকা
রাত ০৪.০৩
তারিখ- ২৬/০১/১২

দ্রষ্টব্য : ১. সিল্করুট : বণিক বার্তা পত্রিকার সাময়ীকি। সংখ্যা-২৮, তারিখ- ১৮/০১/১২