ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

কর্মব্যস্ততার মাঝেই দিন কাটে আমাদের । প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনার ক*টি খবরই বা রাখি আমরা । তবুও যতটুকু বেদনাবিধূর ঘটনার খবর জানি তাতেই আহত হচ্ছি প্রতিনিয়ত । সকাল বেলা পত্রিকা হাতে পেয়ে আর খুলতেই ইচ্ছা হয় না । না জানি কোন খবরে মনটা ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে । দিনের পর দিন এক একটি হৃদয়বিদারক ঘটনায় বিষাদে ছেয়ে যায় মনটা । এমনিতে তো কোন আশাব্যঞ্জক ঘটনা আমাদের জীবনে খুব একটা ঘটে না । আমরা কি কেবল হতাশার দোলাচলে ভাসবো ।

মিরসরাইয়ের কান্না তো এখনও থামেনি । মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যে সকল কোমলমতি শিশুরা প্রাণ হারিয়েছে ,তাদের মা-বাবা ও স্বজনদের আহাজারি থেমে যাবার নয় । কেঁদে চলেছে তাদের শিক্ষক সহপাঠি বন্ধুবান্ধব । আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো অন্যান্য বিদ্যালয়ে শোকের আবহ এতো তাড়াতাড়ি মুছে যাবার না । সদ্য কৈশোরে পা রাখা অনেকের জীবন অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে গেল ।
কত আনন্দ নিয়ে খেলা উপভোগ শেষে ফেরার পথে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে গেল অনেকগুলো সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ ।

এতগুলো তাজা প্রাণ নিঃশ্বেষ করে দিলো যে চালক তার কি বিচার হবে ? আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেসব চালকদের বিরুদ্ধে যারা গাড়ি চালানো অবস্থায় অনবরত মুঠো ফোন ব্যবহার করে চলে । একটি ট্রাকে গাদাগাদি করে এতগুলো স্কুলছাত্র উঠলো তখন স্কুল কর্তৃপক্ষ কোথায় ছিলেন । টুর্ণামেন্ট যখন স্কুলভিত্তিক তাহলে ছাত্রদের যাওয়া আসার ব্যবস্থা কেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হবে না । আজকালকার কিছু শিক্ষকরাও যেন গা বাঁচিয়ে চলা এবং দায়সারা দায়িত্ব পালনে স্বস্তি বোধ করেন ।

এইতো গতকাল টিভি তে দেখলাম আরেক হৃদয়ভাঙা দুর্ঘটনার খবর । সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন যুগ্ম বার্তা সম্পাদক । আজও কি পত্রিকাটা খুলতে ইচ্ছা হবে ! কি করে হবে । উদীয়মান একজন সাংবাদিকের অপমৃত্যুর খবর দিয়ে নিশ্চয় সাজানো হয়েছে আজকের প্রতিটি সংবাদপত্রের পাতা ( আজকের সংবাদপত্র এখনো হাতে পাইনি) । কি নিদারুণ যন্ত্রণায় পতিত হলো আরেকটি পরিবার । আমাদের পরিত্রাণ কোথায় ?

প্রতিদিন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ । দুর্ঘটনার শিকার অনেক পরিবারের অসহায়ত্বের খবর আমরা জানতেও পারিনা ,জানার চেষ্টাও করি না , করলেও সে সংখ্যা নগণ্যই হবে । সংসারের কর্মক্ষম ব্যক্তি যখন জীবন থেকে হারিয়ে যান তখন সে সংসারে কি দুর্দশা নেমে আসে সে ভুক্তভোগী ছাড়া কে জানে । এক্ষেত্রে শুধু কি সরকারেরই দায়িত্ব সকল প্রকার দুর্ঘটনা রোধে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার? হ্যাঁ অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব অনেকখানি তবে এককভাবে না । মাঠ প্রশাসনের ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে এখানে । মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলা প্রতিনিয়ত চলতে থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি কোনো কালেও হবে না । (এখানে সরকার বলতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বুঝাতে চেয়েছি কারণ সাধারণ জনগণ সরকার বলতে শুধু মন্ত্রী এমপিদেরকেই বুঝে থাকেন । প্রশাসনের সকল স্তর যে সরকারেরই অংশ অনেকেই তা আজো বুঝে উঠতে সক্ষম হননি । এটি অবশ্য জনগণের দোষ না । যারা অতি চেনামুখ প্রায়ই টিভি টক শো’তে এসে বক্তব্য রাখেন , তারাই জনগণকে বিভ্রান্ত করেন । মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বের কথা তাই আলাদাভাবে বলার চেষ্টা করেছি ) । অবশ্যই জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে পূর্ণ সচেতন হওয়ার ।

যেসব হেলপার ড্রাইভার সেজে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায় তাদের কারো শাস্তি হয় এমন খবর তো কখনো শুনতে পাইনা। সিভিল প্রশাসন যতদিন দুর্নীতিমুক্ত না হচ্ছে ততদিন এসব দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে । কেউ স্বীকার করি বা না করি । একশ্রেণীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দুর্নীতি , গাড়ির মালিকের এবং প্রশাসনের দুর্নীতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ । এসব দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে
সড়ক মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে । মাঝে মধ্যে দু*একজন ড্রাইভারকে শাস্তি দিয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে , তা আশা করা ভুল ।

প্রশাসনিক কর্মকান্ডে ক’জন নীতি নৈতিকতার ধার ধারে । জনগণের বিশাল একটা অংশের মধ্যে নৈতিকতার বালাই নেই । ভাবখানা এমন যে সকল নৈতিকতা মেনে চলার দায়িত্ব এককভাবে সরকারের । যখন নাগরিকদের বৃহৎ অংশ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে তখন অন্য অংশ কি বিশ্রী উপায়ে ধৈর্যহীন হয়ে রাস্তা পারাপারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তা সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টি এড়ায় না বোধ হয় । এক রিকশায় আমরা কতজন উঠি ? ট্রাকে কি মানুষ উঠার কথা ? তবুও উঠেছে । এখনো উঠছে । দুর্ঘটনায় আমরা যদি কারো বীভৎস মৃত্যু দেখতে না চাই , সকল উপায় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকরাও সচেতন না হলে দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে , যা আমরা একেবারেই চাই না ।