ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

প্রতিটি মৃত্যুই কষ্টের-বেদনার। তারপরও সবার জীবনেই মৃত্যু অলঙ্ঘনীয়। এই স্বাভাবিক ব্যাপারটিই যখন অনাকাঙ্ক্ষিত, তখনই সেটি হয় অপমৃত্যু। মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের অনেক বেশি ব্যথিত করে। বিশেষ করে, যখন মনুষ্যসৃষ্ট কারণে মানুষেরই মৃত্যু ঘটে তখন তা আমাদের বিবেকবোধকে শক্ত হাতে কশাঘাত করে; বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে আরও বেশি অপরাধী বানায়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটলো। সামান্য মানবিকবোধসম্পন্ন যে কেউ এতগুলো মানুষের একসাথে মৃত্যু দেখে আঁতকে উঠবেন, অজান্তেই বইয়ে দেবেন অশ্রূধারা। কিন্তু এসবের জন্য দায়ী যে গুটিকয়েক মানুষ, তাদের কানে কিছুতেই পৌঁছে না ব্যথিতের আর্তনাদ। তেমনই কিছু পাহাড়খেকো-ভূমিদস্যুর লালসার শিকার এই অসহায় মানুষগুলো। পরিসংখ্যান বলে, গত পাঁচ বছরে পাহাড় ধসে পাঁচ শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও স্হানীয় কিছু নেতাকর্মীর যোগসাজশে পাহাড়ে চলছে রমরমা ব্যবসা। দীর্ঘ দিন থেকেই সেখানে অবাধে পাহাড় কেটে দোকানপাট,আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কাটা পাহাড়ে খুপরি ঘর তৈরি করে স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে তা ভাড়া দেওয়া হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও দিনের পর দিন তাঁরা সেখানে বসবাস করে। আসন্ন বিপদের কথা জানলেও নিয়তির কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়া ছাড়া তাঁদের কোন গত্যন্তর নেই। বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে কখনওবা কর্তৃপক্ষ দায়সারা গোছের সতর্কবানী প্রচার করে থাকে; তবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। উপরন্তু, দিনের পর দিন কিছু মানুষ ফুলে ফেঁপে বড় হতে থাকে। এই মানুষগুলো আমাদের সমাজে অপরিচিত নয়, প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে ‘সিঁড়ি’ বানিয়ে তরতর করে উপরে উঠা কিছু তথাকথিত সমাজসেবী। সম্পদ আর ক্ষমতার মোহে অন্ধ এই মানুষগুলোর কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে, “ কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে” ? তাদের চেতনার ‘রাডারে’ বোধ হয় কখনোই এই সমাজের হাহাকার ধরা পড়বে না। অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। মানুষ নামের এই সব নরপিশাচদের ভোগবাদি মানসিকতা পুরো সমাজটাকেই বিষিয়ে তুলছে।

এক অদ্ভুত দেশে জন্মেছি আমরা। এদেশে বছরের পর বছর ফিটনেসবিহীন লঞ্চ-স্টিমার-গাড়ি চলে, প্রতি বছর সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনায় হাজারো মূল্যবান প্রাণ ঝরে যায়; চলে মৃত্যুর মিছিল। এদেশে অবাধে পাহাড় কাটা হয়, বনভূমি ধংস করা হয়, নদী দখল করে বিভিন্ন শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়। যেখানে সেখানে অননুমোদিত ইট ভাটা তৈরি করে পকেট ভারি হয়। কখনো চিন্তা করা হয় না পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা, এর ফলে সৃষ্ট মানুষগুলোর দু:খ-দুর্দশার কথা।

মানুষ যখন পৃথিবীতে বসবাস শুরু করেছে তখন থেকে প্রকৃতির সাথে সখ্যতা করেই মানব সমাজ আজকের এই সভ্যতার দোরগোড়ায় পৌঁছেছে, কখনও বৈরিতা করে নয়। প্রকৃতি নির্মমভাবে বারবার জানিয়ে দেয় তার সাথে বিরুদ্ধাচরণ চলে না। বৃষ্টিপাতের মৌসুমে বৃষ্টি হবে, খাল-বিলে পানি হবে; এসব প্রকৃতিরই নিয়ম। কিন্তু আমরা যখন একের পর এক পরিবেশের উপাদানগুলোকে ধংস করতে থাকি, বিশাল বনভূমিকে শ্মশানে পরিণত করি, নদীদূষণ-নদীভরাটের ফলে নদীর স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতা ও স্রোতপ্রবাহকে আটকে দেই, তখনই প্রকৃতি অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির মাধ্যমে এসবের সমুচিত জবাব দেয়। এই সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমরাই ডেকে আনছি। প্রকৃতিকে শাসন করলেও এর কাছে যে আমরা বড় বেশি অসহায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এটাও সত্য যে পরিবেশকে ধংস না এর সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিলে সে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আমাদের দেশের কিছু আদিবাসীদের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রকৃতিকে উপজীব্য করে বেঁচে থাকা পাহাড়ী আদিবাসীরা পূর্বপুরুষ থেকেই পাহাড়ে জীবন যাপন করে আসছে। কিন্তু সেখানে কখনও পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটে না। এর কারণ তাঁরা পাহাড় কেটে বাণিজ্য করে না। বিধাতা পাহাড় গুলোকে পৃথিবীর খুঁটি বানিয়েছেন। পাহাড় ভূমিকম্প প্রতিরোধের অন্যতম উপাদান। কিন্তু মানুষ পরিবেশকে টিকিয়ে রাখার বদলে নিজেদের স্বার্থটাকেই বড় করে দেখে। বিপর্যয়ের এটাই অন্যতম কারণ। নগরায়ণের ডামাঢোলে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিকতা। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে মানব সমাজ আসলেই কতটা এগোচ্ছে, তা বোধ হয় প্রশ্নবিদ্ধ। বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে শত বছর আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় এ আহ্বানই ধ্বনিত হয়েছে এভাবে,
“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সে তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি”।

আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। যে সমাজে আইনের শাসন নেই সেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্প প্রবেশ করবে এটাইতো স্বাভাবিক। এখানে কিছু অপরাধকে অপরাধ হিসেবে মনে করা হয় না। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই, এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা প্রয়োগ থাকলেও তা বেশি দূর এগোয় না কর্তাব্যক্তিদের নানা কারসাজিতে। এভাবেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বিভিন্ন বিবেচনায় পার পেয়ে গোঁফে তা দিয়ে সমাজে দাপটের সাথেই ঘুরে বেড়ায় এসব অসাধুরা ।

এসব দেখে দেখে আমরা অভ্যস্থ হয়ে গেছি। কখনও মনে হয় জোর করে মানিয়ে নিচ্ছি এসবের সঙ্গে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে অসংখ্য অপমৃত্যুর ঘটনা। এদেশে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল। নানা ঘটনার আবর্তে এসব চাপা পড়ে যায়। আমরা কালের পরিক্রমায় সবই ভুলে যাই। নাজিম হিকমত বলেছিলেন “বিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর”; এখন আমাদের বোধ হয় আরও কম। কিন্তু চোখ বন্ধ করে রাখলেই তো আর প্রলয় বন্ধ থাকে না। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। মিডিয়ার কল্যাণে হয়তো কিছুদিন তোড়জোড় চলে, তারপর আবার সেই একই দৃশ্য।

পরিশেষে বলবো, এ দেশ আমাদের, এ ধরিত্রি আমাদের। নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের আরও বেশি মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে হবে। অন্যের দু:খ-কষ্টগুলোকে তাঁর মতো করে অনুভব করতে হবে। আজকাল পড়াশোনা করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আমাদের ভেতরে মানবিকবোধ তৈরি হচ্ছে না। মানুষের ব্যথায় আমরা ব্যথিত হই না। মানব কল্যাণে যদি লোভ-লালসা ও ব্যক্তি স্বার্থকে বিসর্জন দিতে পারি, তাহলে হয়তো এসব অপমৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা কোন ভাবেই চাই না, এই স্বদেশ কোন মৃত্যু-উপত্যকা হোক।