ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

মাত্র দিন কয়েক আগেই ভারতের ধর্ষনকারীদের বিরূদ্ধে কলম ধরেছিলাম। এখন দেখুন, আমাদের নিজেদের দেশও কত ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরের এই জঘন্য ধর্ষনকারীদের অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছে নির্যাতিত অসহায় ঐ মেয়েটিরই একজন বান্ধবী। বিশ্বাস করা যায়? একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের জীবনের এত বড় সর্বনাশ ও নির্মম নির্যাতন করতে সহ-অপরাধী হলো সেও। তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? একই সাথে ঐ পাঁচ নরপশুর কী শাস্তি হওয়া উচিত? ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শ্রমতি জয়ললিতা জয়ারামের প্রস্তাব মতো বাংলাদেশেও ধর্ষনকারীদের ইনজেকশন দিয়ে খোজা করে তারপর ইরানের মতো প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে যৌনাঙ্গে আঘাতের পর আঘাত করে রক্তাক্ত শরীরে মুখের মধ্যে লোহার বিশাল বড়শি গেঁথে আগে ল্যাম্পপোস্টে ঝুলানো, তারপর নির্মমভাবে পিটাতে পিটাতে মুমূর্ষু হলে এরপর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য নতুন আইনের প্রস্তাব করছি। কিংবা, বিকল্প হিসেবে, সমপরিমান ব্যথা দিয়ে সৌদী আরবের মতো প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করার মাধ্যমে এই বর্বর অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। কতজন এ প্রস্তাবের সমর্থনে দাঁড়াবেন জানি না, কিন্তু এহেন কঠোর ও নির্মম শাস্তি না দিলে ধর্ষনের মতো ভয়াবহ, জঘন্য অপরাধ আর কমবে না। অন্ততঃ একজন ধর্ষনকারীকে বা গণধর্ষণের মতো বীভৎস অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে এ শাস্তি দেওয়া আবশ্যক। একটি সুস্থ সমাজ হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশের সামনে এর কোন বিকল্প নেই।

আর এ শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়াটি শুরু হোক টাঙ্গাইলের এই অসহায় বোনটির মামলা থেকেই। ইতোমধ্যেই নরপশু গুলো ধরা পড়েছে। রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে তাদের। কিন্তু এখানেই্ শেষ নয়, শুরু মাত্র। আমাদের দেশে আইনী প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ, জটিল এবং নারীর প্রতি হয়রানিমূলক। এটি আমূল পাল্টাতে হবে। আমি মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দের কাছে আকূল আবেদন জানাই আপনারা উপরে বর্ণিত পন্থায় ধর্ষণকারীর/কারীদের বিচার করা যায় এমন একটা আই্ন প্রণয়ন করুন। বিশেষ করে নাট্যব্যক্তিত্ব ও আইনজীবী তারানা হালিম, এডভোকেট ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পি প্রমুখ তরুণ ও সোচ্চারকণ্ঠ এমপি মহোদয়াবৃন্দের প্রতি এই অনুরোধটুকু রাখছি। আইন ও বিচার মন্ত্রণায়ে কর্মরত আমাদের সম্মানিত কর্মকর্তাগণও এক্ষেত্রে পালন করতে পারেন অগ্রণী ভূমিকা। সুপ্রীম কোর্টে কর্মরত সম্মানিত আই্নজীবী বন্ধুগণের প্রতি অনুরোধ – এই ধর্ষনকারীসহ অন্য কোন ধর্ষনকারীর পক্ষেই দয়া করে আপনারা আর কোর্টে দাঁড়াবেন না। নিজেদের পেশাকে কলঙ্কিত হতে দেবেন না। আর গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ, ঐ পাষন্ড শয়তান পিশাচদের ছবি, তাদের পরিবারের পরিচিতিসহ বিস্তারিত আপনারা প্রকাশ করুন – প্রথম পাতায়, রেড ব্যানার-হেডে, কয়েক কলাম জুড়ে। ধর্ষনকারীদের একটি ডেটাবেইজ তৈরি করুন। তা প্রকাশ করে, প্রয়োজনবোধে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সামজিক ওয়েবসাইটে এমনিক ইউটিউবে প্রকাশ করে বাঙালী জাতিসহ সারা বিশ্বকে জানান কত জঘন্য শ্রেণীর পুরুষ লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজেরই কোন কোন অংশে। নতুন নতুন ঘটনার আড়ালে সেই সব নরপশু অপরাধীদের খবর প্রচার যেন চাপা পড়ে না যায়। এ লক্ষ্যে প্রতিটি পত্র-পত্রিকায় ধর্ষনকারীদের ছবিসহ বিশেষ একটি কর্ণার চালু করে ক্যাপশনে ঘৃণাজনক বিশেষণসহ খবর ছাপিয়ে তার পুরো পরিবারকে একঘরে করার জন্য প্রত্যহ বিশেষ সংবাদ ছাপার ব্যবস্থা আপনারা করুন আপনারা। কেননা, প্রতিদিনই দেশের কোন না কোন প্রান্তে কারও না কারও মা, বোন, কন্যা, জীবনসাথী, তরুণী যুবা, কর্মজীবী নারী, এমনকি অসহায় প্রতিবন্ধী নারী পর্যন্ত এ ভয়ংকর অপরাধের শিকার হচ্ছেন। এইতো ক’দিন আগেই ব্র্যাক ক্লিনিকের এক মেধাবী চিকিৎসক একই ক্লিনিকের এক ওয়া্রড বয়ের হাতে খুন হলেন। সাহসী ও সংগ্রামী ঐ তরুণী চিকিৎসককে শহীদের সম্মান জ্ঞাপন করা হোক। পুলিশ বাহিনীর প্রতি অনুরোধ, ধর্ষনবিরোধী একটি বিশেষ এলিট ফোর্স গঠন করুন আপনারা। র‍্যাবের প্রতি অনুরোধ – মাসে অন্ততঃ একজন ধর্ষনকারীকে প্রথমে লিঙ্গ কর্তন করে এরপর ক্রসফায়ারে দিন। দুর্ভাগা এ বাঙালী জাতি আপনাদের বীরের বেশে বরণ করবে। অন্ততঃ এক্ষেত্রে ক্রসফায়ারের সমালোচনা আমরা, সচেতন নাগরিক সমাজ করবো না। যেভাবেই হোক, ঐ নরপশুদের ক্ষমা নেই। বিচার হতেই হবে।

গতকালের (২ জানুয়ারী, ২০১৩) প্রথম আলোতে টাঙ্গাইলের মধুপুরের অসহায় ঐ বালিকার ওপর ভয়ন্কর ও বীভিষীকাময় নির্যাতনের খবরটি দ্বিতীয় পাতায় এক কলামে ছেপেছিল, দারুন মর্মাহত হয়েছিলাম। আজ অবশ্য আশান্বিত হয়েছি এই দেখে যে ফলো-আপ খবরটি প্রথম পাতায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি। গতকাল কোন একটি পত্রিকা (নাম মনে করতে পারছিনা বলে দুঃখিত, টেলিভিশনের সংবাদপত্র পর্যালোচনায় একনজর দেখলাম) প্রথম পাতায় ধর্ষনকারীদের ছবিসহ ছেপেছে। বিডিনিউজ২৪.কম গুরুত্বসহ খবরটি জাতীয় শিরোনাম করেছে। ধন্যবাদ তাঁদেরও। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বি.এন.ডাব্লিউ.এল.এ.) অসহায় মোয়েটি ও তাঁর পরিবারকে আইনী সহায়তা দিচ্ছে। কৃতজ্ঞতা BNWLA’র সংগ্রামী আইনজীবীবৃন্দের প্রতি।

একবিংশ শতাব্দীর এক দশক পেরিয়ে গেলেও ক্যান্সারের মতো আমাদের সমাজের পরতে পরতে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী এবং মানবতার বিশেষতঃ নারীত্বের প্রতি চরম অবমানাকর এ অপরাধ এবং অপরাধীদের শাস্তি দিতে এবং তা প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি। বিবিসি ২ জানুয়ারী, ২০১৩ তারিখে ভয়ঙ্কর এ নির্যাতনের খবরকে তাদের বিশ্বসংবাদের শিরোনাম করেছে। ধন্যবাদ বিবিসি। আশা করি আপনারা নিয়মিত ফলো-আপ রাখবেন ও জানাবেন, ঠিক যেভাবে ভারতের নয়াদিল্লীর খবরটির ক্ষেত্রে জনমত গঠনে আপনারা অবদান রেখেছেন। এখন, আমাদের নাগরিক সমাজ, এনজিও, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনদের প্রতি অনুরোধ – আপনারা জেগে উঠুন। ধর্ষনবিরোধী ও ধর্ষকবিরোধী প্রবল এক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে কী ভাবে সারা দেশ এক হয়ে দিল্লীর সেই পিশাচগুলোর বিচারসহ নারীর সার্বিক নিরাপত্তার দাবীতে এক হয়ে ফুঁসে উঠেছিল, এমনকি নতুন ২০১৩ বর্ষবরণের সবগুলো অনুষ্ঠান তারা বর্জন করেছে। পুরো ভারত এক হয়ে ঐ অসহায় মেডিকেল ছাত্রীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। যদিও তাকে বাঁচানো যায়নি। অসহায় ও নির্মমভাবে জীবনের আকুতি জানিয়ে ঐ শহীদ ভারতকণ্যা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জানান দিয়ে গেছেন ভারত-বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া নারীর জন্য কত ভয়াবহ একটি অঞ্চল। প্রমাণ মিলল, বছরের প্রথম দিনেই আমাদের বাংলাদেশেও ঠিক তেমনি আরেকটি দুঃস্বপ্নের নতুন বছর শুরু হলো, টাঙ্গাইলের মধুপুরের এক নিভৃত পল্লীতে অসহায় একটি মেয়ে, কারও বোন, কারও আদরের কন্যা, ধর্ষিত হলো কয়েক দিন ধরে। ক’জন নরপশু হায়েনা মিলে ধ্বংস করল তার শৈশব, কৈশর, নারীত্ব আর মানবিক মর্যাদা। আজ সে পুরুষরূপী কোন মানুষ দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠছে। অন্য সব শিশুদের মতো স্কুলে নতুন বছরে বই হাতে আনন্দ করে যেতে পারলো না অভাগা মা আমাদের। মানবতার চরম শত্রু, নরপিশাচদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে আজ আমাদের সেই ছোট্ট কিশোরী বোন, আমাদেরই কন্যা আজ মৃত্যুশয্যায়। সৃষ্টার দয়ায় সুস্থ হয়ে উঠলেও সারা জীবন এই বীভিষীকা সে ভুলতে পারবে কি? কখনো আর সুস্থ্ মনে কোন মানুষকে সরলভাবে বিশ্বাস করতে পারবে কি সে? ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে সে আজ জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছে। তার মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংসের মুখে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তার শরীর আর স্বাভাবিক হবে কি না, আর কোন দিনও সুস্থ্-স্বাভাবিক হয়ে সে চলেত পারবে কি না তার সবটুকু নির্ভর করছে সঠিকভাবে চিকিৎসার ওপর, কাউন্সেলিং, মানবিক দরদ, যত্ন আর নিবিড় পরিচর্যার উপর এবং সর্বোপরি ঐ নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক, কঠোর ও নির্মম শাস্তি প্রদানের উপর। এ আজ বাংলাদেশের সকলের প্রাণের দাবী। সমগ্র বাঙালী জাতির দাবী। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি জয়ললিতা সেই প্রস্তাবগুলোই এনেছেন, যা দেশটির ধর্ষনবিরোধী আন্দোলনকারীদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিলো। ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের সর্বোচ্চ নেত্রী শ্রীমতি সোনিয়া গান্ধীও এসব দাবী মেনে নিয়ে সংশোধিত নতুন আইন প্রণয়েনর কাজ হাতে নিয়েছেন। অচিরেই তাঁদের রাষ্ট্রে ধর্ষন এবং নারীর প্রতি সর্বপ্রকার নির্যাতন বন্ধ করতে নতুন আইন প্রণীত হতে চলেছে। দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ বিচারালয় গঠনও করা হচ্ছে।

আমাদের দেশেও অনুরূপ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল করে ধর্ষনের মামলাগুলোর স্বল্পতম সময়ে নিস্পত্তি ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক, কঠোর ও নির্মম শাস্তি প্রদানের দাবী জানাচ্ছি। আমরা বাঙালীরা এত আবেগী ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জাতি – ভাষার জন্য আমরা প্রাণ দিতে পারি, মহান মুক্তিযুদ্ধ, পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এসব প্রশ্নে শত শত লাইন লিখে বা বলে নিজেদের জাহির করতে পারি আমরা। কিন্তু আমরা কি খোঁজ রাখি প্রতিদিন আমাদের গ্রামে-গঞ্জে আনাচে-কানাচে, স্কুল-কলেজে যেতে-আসতে, শহরের গার্মেন্টস থেকে বাসায় ফেরার পথে, রাত্রে-দিনে কত মা-বোন-কন্যাশিশু এ ভয়ন্কর ও জঘন্য অপরাধের শিকার হচ্ছেন? মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে যে জাতির জন্ম, যে রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, সেই বাংলাদেশ, সেই আমরা বাঙালীরা কি পারবো না, এ সমাজকে প্রতিনিয়ত মধ্যযুগের কাছে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটি বর্বর অপরাধ, ধর্ষনের মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী ক্রাইম আর ধর্ষণকারীদের মতো জঘন্য সমাজের কীট, নরপশু পিশাচদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে, তাদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত এবং বয়কট করতে?

আমরা কি পারবো না আমাদের মা-বোন-কন্যা-জায়াদের জন্য একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়তে? হায় অভাগা দেশ, হায় রবীন্দ্রনাথ, হায় নজরুল, হায় জীবনানন্দ, কোথায় তোমাদের সেই বাংলা? এ ধরণীতে আজ দলিত, নিগৃহীত নারীর সর্বোচ্চ সম্পদ – তার নারীত্ব, নিদারুনভাবে আজ লাঞ্ছিত মানবতা। কালো শ্বাপদরে ভয়াল ছোবলে প্রতিনিয়ত ডুকরে কাঁদছে ঐ আমাদের সাথী, অর্ধাঙ্গিনী। আর কতো সইবে আমাদের বাংলাদেশ? আর কত ঘুমাবে বাঙালী? জাগো, দোহাই তোমার, একটু জাগো। জোর কণ্ঠে বলো – এ দেশ কোন ধর্ষনকারীর নয়। ঐ নরপশুদের বিচার ইনশাল্লাহ বাংলার মাটিতে হবেই হবে। জাগো বাহে . . . . . কোন্টে সবাই . . . . ।

-দেওয়ান মাহমুদ
অটোয়া
০২.০১.২০১৩

***
ফিচার ছবি: http://www.globalnews.ca থেকে সংগৃহিত