ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

নারীর প্রতি সহিংসতা বিশেষতঃ ধর্ষনের বিরূদ্ধে আমার লেখা একটি পোস্টের কমেন্টে একজন পাঠক (জনাব আশরাফুজ্জামান মিনহাজ) পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফের কিছু বাণী উদ্ধৃত করে কিছু নিজস্ব স্টাইলে মন্তব্য করেছেন, যার সাথে এমত হতে পারছি না। সে কারেণেই এ লেখা।

ইসলামে নারীর মর্যাদার বিষয়টি সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিধান, এতে কোন সন্দেহ নেই। মায়ের জাতি, কন্যার জাতি, সহধর্মিনীর জাতি হিসেবে ইসলামে নারীকে অত্যন্ত উচ্চ অবস্থানে রাখা হয়েছে। এমনকি সন্তানের বেহেশত মায়ের পদতলে বলে আল্লাহ্‌র প্রিয় রসূল (সাঃ) সুস্পষ্ঠ ঘোষনা দিয়েছেন। অবজ্ঞাত পাঠককূল মাত্রেই এসব জানেন। অষ্টম বা নবম শ্রেণীর ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বই থেকে এগুলো সবাই পড়েছে। কুরআন-হাদীস চর্চা যাঁরা করেন তাঁরা সকলেই এ বিষয়ে সম্যক বা কমবেশি জানেন। তবে দুঃখের বিষয়টি হচ্ছে বেশির ভাগ বাঙালী পুঙ্গব সন্তান ঐ সব পবিত্র বাণীসমূহ (আল কুরআন এবং সহীহ হাদিস) মনে রাখে নি, বরং তার নানান অপব্যাখ্যা করেছে। আল্লামা (ঘৃণিত ঐ ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করলাম না) জাতীয় কতিপয় বক-ধার্মিক ধর্মব্যবসায়ীর অপব্যাখ্যার কারণে বঙ্গ-মাজে ইসলাম ধর্মের ভুল দোহাই দিয়ে নারীদের আরও পিছিয়ে রাখার পাঁয়তারা করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে, বেশ কিছু শিক্ষিত, আধুনিক, এমনকি যুবশক্তির একটি বড় অংশ ঐ সব ধর্মব্যবসায়ীদের অপব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত হয়েছেন। তাই তাদের অনেকেই মনে করেন যে শুধুমাত্র পর্দা প্রথা ঠিক রাখতে পারলেই ধর্ষনের মতো ভয়াল সামাজিক ব্যধি কমে যাবে।

দুঃখ আর রাখি কোথায়? আমার পোস্টের কমেন্টে জনাব উজ্জ্বল লিখেছেন, “আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘জাহিলিয়া যুগের মতো সাজসজ্জা করে রাস্তায় বের হয়ো না।’ (সূরা : আহজাব-৩৩). তবে এর পরেও যদি কেউ নির্যাতিত হয় তাহলে তার কোনো দায়ভার নাই”.

আল কুরআনের পবিত্র আয়াতের পর তাঁর লেখা লাইনটির মর্মার্থ করলে দাঁড়ায়, জাহিলী যুগের ন্যায় সাজসজ্জা করে পথে বের হলে যে কোন নারী নির্যাতিত হবে এটাই স্বাভাবিক। অন্ততঃ তাঁর ব্যাখ্যা থেকে তা-ই প্রতীয়মান হয়। এটা কি কোন সভ্যতার যুক্তি হতে পারে? একটি মেয়ে যদি বোরকা না পড়ে, যদি সে স্কার্ট টপ্‌স পড়ে ঘর থেকে বের হয় তাহলেই তাকে ধর্ষন করা যাবে, আর সেক্ষেত্রে ধর্ষিত হবার জন্য সেই মেয়েটিই দায়ী হবে। তবে যদি সে সঠিকভাবে পর্দা করে পথে বের হয়, তহলে ধর্ষিত হলে সেক্ষেত্রে সে নিজে এর জন্য দায়ী নয় – এমন কথাই তো দাঁড়ায় উক্ত বক্তব্যের সারর্ম করলে। কুরআন বা হাদিসের এরূপ অপব্যাখ্যা করা থেকে দয়া করে বিরত থাকার জন্য আমি সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাই। এমনিতেই আমাদের দেশের সাধারণ ধর্মভীরু মানুষগুলো এই সব ‘আল্লামা’ জাতীয় প্রতারকদের প্রলাপ শুনতে শুনতে দেশটার এবং ইসলাম ধর্মের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। এদের পথে ফিরানোর জন্য ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যার চেষ্টা সবাই করবে এমনটাই প্রত্যাশিত।

সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ইসলামেই বলা হয়েছে, “বিদ্য অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর জন্য ফরজ” (আল-হাদীস). আবার অন্যত্র মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, “যে সকল পুরুষ নারীদের দিকে কুদৃষ্টি দিয়ে তাকায় হাশরের ময়দানে তাদের চোখে গলিত শীষা ঢেলে দেওয়া হবে।” সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, নারী ধর্ষনকারী তো ভয়ঙ্কর শাস্তি পাবেই, উপরন্তু যে সকল পুরুষ একটু কুদৃষ্টি দিয়ে কোন মেয়ের দিকে তাকাবে, শাস্তিস্বরূপ ঐ চরিত্রহীন পুরুষের চোখও গলিত শীষা দিয়ে গেলে দেওয়া হবে। মজার ব্যাপার হলো, আপনার মতো যারা পর্দা প্রথার কথা বলে ধার্মিক মানুষদের সহানুভূতি পাবার চেষ্ঠা করেন, তারা কখনোই আমার উদ্ধৃত এ হাদিসটির কথা বলেন না। কারণ, এখানে তো পুরুষের দায়িত্বশীলতার কতা বলা আছে। চরিত্রহীন হলে তার শাস্তি কি হবে সেই কথ বলা আছে। এইরূপ কঠের শাস্তির বিধান যদি প্রকৃতই দুনিয়াতে থাকতো, বা দুনিয়ার রাস্ট্রগুলো কায়েম করতো, তাহলে পৃথিবী থেকে হয়তো এ নরপশুবৃত্তির ভয়ঙ্কর অপরাধ ব্যাপক হারে হ্রাস পেত। কিন্তু কষ্টের হলেও সত্যি, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের কোন শাসক শ্রেণী কখনোই নারীর অধিকার নিয়ে সত্যিকার ভাবে কোন কার্যকর কিছু করেন নি। নির্যাতনকারীদের প্রাপ্য শাস্তি হয়নি।

যদি তা করা সম্ভব হতো, তাহলে স্বাধীনতার পর থেকে এতোদিনে বাংলাদেশে কয়েক লাখ পুরুষের (যারা আসলে মানুষ রূপী হায়েনা) ফাঁসি হতো। কারণ, স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানী হানাদার হায়েনা আর তাদের দোসর নরপশুগুলে কর্তৃক লাখ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। অনেকেই নির্মমভাবে খুন হয়েছেন, অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন। আর স্বাধীনতার পর থেকে এ চল্লিশের বেশী বছর ধরে আমাদের বাঙলাদেশেীরা নিজেরাই নিজেদের স্বজাতির অন্য কারো মা-বোন-কন্যা-জায়াকে এমকি শিশুদের ধর্ষন করেছে, প্রত্যহ করে চলেছে। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই এ সব খবর পড়তে পড়তে সুস্থ মানুষদের বিকারগ্রস্ত হবার উপক্রম হয়েছে। আশ্চর্ষের বিষয, কেউ বিকারগ্রস্ত হয়নি। অর্থাৎ নারীর বিরূদ্ধে ঘটে যাওয়া এসব বীভৎস্য অপরাধের খবর আজ বাঙালীর গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই নেই কোন কার্যকর প্রতিবাদ, প্রতিরোধ বা আন্দোলন। এই ধর্ষনকারীদের সাথে, সমাজের যারা প্রতিনিয়ত নারীদের দিকে কুদৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছে ঐ সব পুরুষদের সাথে, যে সব ছেলেরা স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি মেয়েদের টিটকারী দিয়ে বা স্কুলে-কলেজে যাওয়া আসার পথে অশ্লীল-অশ্রাব্য বাক্য বর্ষন করে প্রতিনিয়ত মনোজাগতিকভাবে নির্যাতন বা নিগৃহীত করছে এদের সাথে ঐ পাকিস্তানী বর্বর হানাদার বা তাদের দোসর যুদ্ধাপরাধীদের কোন তফাৎ আছে কি?

খুব গভীরে চিন্তা করলে এবং একটু তথ্য দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান তথা দক্ষিণ এশিয়ার মতো দেশগুলে বা অঞ্চল সারা পৃথিবীতে খুব কমই আছে যেখানে নারী নির্যাতনের হার এতোটা ভয়াবহ। পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের অবস্থা তো ভয়ঙ্কর। সেখানে একজন নারী ধর্ষিত হলে তাকেই আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে সে ধর্ষিত হয়েছে এবং তাকে অন্তত দুই জন পুরুষ ধর্ষিত হতে দেখেছে। অর্থাৎ দুই জন পুরুষ সাক্ষীর সাক্ষ্য ছাড়া পাকিস্তানের আদালতে ধর্ষনের কোন অভিযোগই প্রমাণিত হয় না। এ কোন বিভীষিকাময় রাষ্ট্র? আবার তারাই নিজেদের নাম রেখেছে, “ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান।” কতোটা ভন্ডামি আর প্রহসন চিন্তা করুন একবার। আফগানিস্তানের গোত্রভিত্তিক সমাজের একজন নারী কোন পুরুষের সাথে প্রেম করলে তাকে শাস্তিস্বরূপ ধর্ষন করার জন্য গোত্রপতিরা রায় দেয়। যে পুরুষটি তার সাথে প্রেম করেছে তার সামনেই শাস্তিস্বরূপ এ জাতীয় বিকারগ্রস্ত পাশবিক ও বীভৎস্ ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়। আবার দেখুন, ঐ ভয়ঙ্ককর রাষ্ট্র আফগানিস্তানে নারীদের শুধু বোরকা নয়, শরীরের চুল বা একটা চামড়াও দেখা যাবে না এভাবে পর্দা করে চলতে হয়। তাহলৈ প্রশ্ন জাগে – জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এ পর্দা প্রথার কারণ কি?

আসলে যেখানে যতো আইনের জোর-জবরদস্তি, সেখানেই ততো মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আর ধর্মের নাম দিয়ে এসব করা খুব সহজ। কেননা, তাতে চটজলদি পাবলিক সাপোর্ট আর সেন্টিমন্টে পাওয়া যায়। তাই তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র্য দেশগুলোর পুরুষতান্ত্রিক আইন, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি সেদেশগুলোর শিক্ষিত সমাজের ফেইসবুক প্রজন্মেরও কোন কোন অংশ মনে করেন, কেবল নারীক পর্দায় আবৃত রাখলেই ধর্ষন বা নারী নির্যাতন কমে যাবে। হায়রে বিধাতা, হে মহান আল্লাহ রাব্বুর আল-আমীন, হে বিশ্ব জগতের শ্রেষ্ঠ বিচারক, হে বিচার দিনের মালকি, তোমার সৃষ্টি মায়ের গর্ভে যাদের জন্ম, সেই সব পুরুষরাই তাদের মায়ের জতিকে কীভেবে রক্ষা করবে, কী ভাবে নির্যাতন প্রতিরোধ করবে, কীভাবে ধর্ষনকারীদের মতো জঘন্য নরপশুদের কঠিন শাস্তি দিবে সেই চিন্তা না; তারা কেবল চিন্তা করে কী ভাবে মায়ের জাতিকে পর্দার আড়ালে রেখে আরও নিস্পষেণ করবে সেই কথা। সত্যিই দুর্ভাগ্য তোমার, অভাগিনী বাংলা মা জননী আমার। তাই আবারো প্রশ্ন রাখছি, বলুন দেখি, মহান মুক্তিযুদ্ধের দীর্ষ নয় মাস বাংলাদেশের কতজন নরী, তরুণী, মহিলা, বালিকা এমনকি প্রৌঢ়া রাস্তায় জাহলিী যুগের ন্যূয় সাজগোজ করে ঘরে বেড়াতেন? উত্তর সবারাই জানা – একজনও না। সবাই প্রাণভয়ে হয় পালিয়ে গিয়েছিলেন, না হয় দেশের ভেতরেই কোথাও না কোথাও লুকিয়ে বা আশ্রয়ের খোঁজে ছিলেন। কিন্তু তবুও কেন দুই লক্ষ বা তারও বেশী নারীকে ১৯৭১ সালে ধর্ষনের শিকার হতে হয়েছিলো? নিজেকে একবার ভালো করে প্রশ্নটি করলে কি উত্তর পাবেন?