ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

স্বর্গে যেতে চাই না মাগো আমি,
তোমার কোলে রাখতে দিও মাথা।
মিথ্যে আমি স্বর্গ খুঁজে বেড়াই-
স্বর্গ সে তো লাল সবুজে গাঁথা,
স্বর্গ সে তো তার আঁচলে বাঁধা।

শিল্পী আনা’র গাওয়া এই দেশাত্মবোধক গান এবং তার ভিডিও চিত্রায়ন দুটোই আমার খুব প্রিয়। আসলে এটা ২০০৬ সালের আমার সবচে প্রিয় গান । প্রতিটি বছরকে চিহ্নিত করার জন্য আমার এরকম দু একটি গান থাকে। এ গানটির আরো একটি বিশেষত্ব যে, সে বছর দেশে যে রাজনৈতিক অরাজকতা চলছিল ঠিক সে সময়ে একটি টিভি চ্যানেলে প্রতিদিন সকালে দেখাত এই গানটি। ডিসেম্বরের শীতের সকালে এই গানটি দেখে দেশের প্রতি এক ধরণের তীব্র ভালবাসা বোধ হোত এবং সেই ভালবাসা নিয়েই কাজে যেতাম। এভাবেই প্রবাসীরা বুকের ভেতর এক টুকরো বাংলাদেশ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আসলে আমার বার বার একথাই মনে হয় যে দেশপ্রেম বুঝতে হলে দেশের বাইরে যেতে হবে। দেশের টান যে কী তীব্র হতে পারে তা বিদেশে এসে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।

কিন্তু দেশপ্রেম বলতে কী শুধু নিজের বাবা-মা-ভাই- বোন, আত্মীয় -স্বজন এবং দেশের মাটির প্রতি ভালবাসা বোঝায় ? না, মোটেই তা বোঝায় না। এই টান দেশের ধুলো -বালি থেকে শুরু করে তার ঘাস-লতা-পাতা- ফড়িং, কাঁচপোকা- প্রজাপতি- পশু-পাখি- কীট-পতংগ …এসব কিছুর প্রতি যে তীব্র চুম্বক আকর্ষণ – এটাই হয়তো দেশপ্রেম। মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসে আমি চরম হতাশা নিয়ে দেশ ছাড়ার ৪ বছর পর প্রথম বারের মতো আবার বিমান বন্দরে নামি প্লেন হতে। তখন আমার সত্যি ইচ্ছে হচ্ছিল মাটিতে বসে পড়ে দেশের মাটিকে চুমু খাই। মনে হয়েছিল দেশটিকে যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম , দীর্ঘ দিন পরে তাকে আবার ফিরে পেয়েছি। মনে পড়েছিল টিভিতে দেখা সেই দৃশ্যের কথা,-দেশ স্বাধীন করে মুক্তি যোদ্ধারা দেশে ফিরছে এবং দেশের মাটির ধুলো গায়ে মুখে মেখে নিচ্ছে -কেউ বা উবু হয়ে মাটিকে চুমো খাচ্ছে। নাহ, একজন মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেমের সাথে অন্য কারো দেশ প্রেমের তুলনা হয় না। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে মাতৃভূমি ছিনিয়ে আনার আনন্দের সাথেও অন্য কোন আনন্দের তুলনা হয় না। এই অনুভুতি হয়তো আনা র সেই গানের ভাষায় প্রকাশ করা যায়, স্বর্গ দেখি তার আঁচলে বাঁধা…।।