ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

সম্প্রতি সমগ্র উন্নত বিশ্বে ডায়াবিটিস, ক্যান্সার, সন্ধিবাত ইত্যাদি অসংক্রামক বা নন-কমিউনিকেবল্ ডিজিজ নিয়ে বেশ তোলপাড় শুরু হয়েছে। এসকল রোগের অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত সফল প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানো সম্ভব। এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব আমরা যা মানব জাতিকে কিঞ্চিত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সাহায্য করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ইমিউনোলজি বা রোগপ্রতিরোধ বিদ্যা নামক চিকিত্সা বিজ্ঞানের যে শাখা মানব জাতিকে কলেরা, বসন্ত, হাম, পোলিও ইত্যাদি ভয়াবহ কতিপয় সংক্রামক রোগের হাত থেকে মুক্ত থাকার জন্য টিকার মতো প্রায় ১০০% সফল একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পেরেছে। অথচ সেই বিজ্ঞান উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবিটিস, গ্যাষ্ট্রিক আলসার, ক্যান্সার ইত্যাদি অসংখ্য নন-ইনফেকশাস বা অসংক্রামক রোগের বেলায় নিশ্চিত রোগমুক্তির কোনো সফল উপায় নির্ধারণ করতে সক্ষম হচ্ছে না, এটা মানবজাতির জন্য একটি বড়ই দুঃখজনক ব্যাপার।

টিকার দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় এমন ধরণের সংক্রামক রোগের বেলায় এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের দ্বারা রোগকে দমন করা সম্ভব হচ্ছে। তা না হলে ওরাল স্যালাইনের সাহায্যে দেহের ক্ষয়পূরণ করে বিনা ওষুধে সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণকে সামলানো হচ্ছে।

অথচ উপরোক্ত অসংখ্য নন-ইনফেকশাস বা অসংক্রামক রোগের বেলায় আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞান স্থায়ী রোগমুক্তির কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। তাই অসংক্রামক রোগের বেলায় দেহের রোগকে নির্মূল করা নয়, কেবলমাত্র রোগযন্ত্রণাকে কমিয়ে বাঁচিয়ে রাখাই হচ্ছে আধুনিক চিকিত্সা প্রচলিত পথ। এভাবে ক্রমাগত রোগকষ্ট কমিয়ে রাখার ফলে দেহমধ্যস্থ রোগের প্রক্রিয়াসমুহ বন্ধ হয় না, বরং রোগের তীব্রতা এবং প্রবণতা বাড়তেই থাকে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, প্রতিটি মানুষের বেলায় শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত রোগের একটা ধারাবাহিক বৃদ্ধির প্রবণতা চলতে থাকে, যদিও আপাতদৃষ্টিতে রোগের বহিঃপ্রকাশ প্রতিটি মানুষের বেলায় ভিন্নতর। উদাহরণস্বরূপ, শৈশবে প্রকাশমান জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি, কাশি, মাথাব্যাথা, পেটের গোলমাল, চর্মরোগ ইত্যাদি রোগের তীব্রতা যৌবনে নানাবিধ যৌন রোগ, হজমের গোলমাল এবং প্রৌঢ়ত্বে উচ্চরক্তচাপ,ডায়াবিটিস ইত্যাদি এবং বার্ধক্যে টিউমার, ক্যান্সার ইত্যাদি জটিল রোগের রূপধারণ করে আত্মপ্রকাশ করে থাকে। ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, দেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঠিক কর্মক্ষমতার অভাবেই শৈশব থেকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সকল জীবানু দেহে প্রবেশ করে থাকে সেগুলোকে সংগে সংগে ধ্বংস করতে না পারার কারণে রোগজীবাণু দেহের গভীরে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘ সময় যাবত তাদের বিষাক্ত এবং ক্ষতিকারক প্রক্রিয়াকে চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করে সাইটোকাইন নামক উপাদান আবিষ্কার করেছেন। তারা আশা করেছিলেন যে, এর দ্বারা রোগপ্রতিরোধ শক্তিকে ইচ্ছা মত পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কিন্তু কার্যতঃ সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। ঐ প্রচেষ্টা সফল হলে দেহকে বিষমুক্ত রাখা যেত এবং শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একটি নীরোগ শরীর উপহার দেওয়া সম্ভব হত।

এই ব্যর্থতার কারণে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা কেবলমাত্র রোগকষ্ট থেকে মুক্ত রাখার জন্য ওষুধ আবিষ্কার করে চলেছেন। জ্বর, ব্যথা, সর্দি, কাশি, পাতলা পায়খানা, চর্মরোগ ইত্যাদি রোগকষ্ট যে আসলে দেহের বিষমুক্ত হওয়ার কতিপয় প্রক্রিয়ামাত্র এই কথাটি চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেও দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে বিনাকষ্টে নির্মূল করার পথ বের করতে সক্ষম হননি।

ইদানীং আবিষকৃত ডায়ারিয়া রোগের চিকিত্সা পদ্ধতিতে ওরস্যালাইনের দ্বারা দেহের ক্ষয়পূরণ করে পাতলা পায়খানার মাধ্যমে ডায়ারিয়ার ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়ার পদ্ধতি প্রমাণ করেছে যে, অতীতে ব্যবহৃত এ্যান্টিবায়োটিক, ইমোটিল, ফ্ল্যাজিল ইত্যাদির মতো ওষুধ দ্বারা পাতলা পায়খানা বন্ধ করার চেষ্টা দেহকে বিষমুক্ত হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করত, যেগুলোর ব্যবহার বর্তমানে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। চিকিত্সা বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার ডায়ারিয়া রোগীর মৃতু্র হার কমিয়ে দিয়েছে। দেহকে ডি-টক্সিফিকেশন বা বিষমুক্তকরণের এই প্রক্রিয়াটি যে অন্যান্য প্রতিটি রোগের বেলায় প্রযোজ্য একথাটি আয়ূর্বেদ, ইউনানী এবং হোমিওপ্যাথির মত প্রাচীনপন্থী চিকিত্সা বিজ্ঞানীগণ বিশ্বাস করতেন, কিন্তু তারা হাতে কলমে বিষয়টি কখনো প্রমাণ করতে পারেননি বলে তাদের এই ধারণা কখনো স্বীকৃতি পায়নি।

রোগবিষকে দেহের মাঝে আবদ্ধ রেখে কেবলমাত্র রোগকষ্টকে কমানোর দ্বারা দেহকে বিষের আধারে পরিণত করার ফলে যে সুস্থ দেহযন্ত্রসমূহ ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রোগের তীব্রতা বেড়েই চলেছে, ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের বিকাশের ফলে একথাটির প্রতি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মনযোগ ইদানীং আকর্ষিত হয়েছে। শরীরকে রোগবিষ ধবংস করার ব্যাপারে সাহায্য না করে বরং শক্তিশালী ওষুধের সাহায্যে ক্রমাগত রোগবিষের সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য করার ফলে দেহের ভিতর যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তারই নাম ইমিউনোকমপ্রোমাইজড বা ‘রোগবিষের সাথে রোগ প্রতিরোধ বাহিনীর আপোষমূলক’ অবস্থা । এর ফলে দেহের রোগপ্রতিরোধ বাহিনী বহিরাগত রোগবিষকে ধবংস না করে বরং আপোষ করে চলেছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার এহেন অকার্যকর অবস্থার সুযোগে অধিকতর শক্তিশালী ভাইরাস নামক পরজীবীরা দেহে প্রবেশ করে সুস্থ দেহকোষের জিনগত পরিবর্তন সাধন করে জন্ম দিচ্ছে ক্যান্সারের মত কঠিন রোগ।

নন-ইনফেকশাস বা অসংক্রামক রোগের বেলায় ক্রমাগত ওষুধ সেবন করে কেবলমাত্র রোগকষ্ট কমিয়ে না রেখে দেহকে বিষমুক্ত করে রোগমুক্ত করার বিষয়ে আধুনিক চিকিত্সার এরূপ বাধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে আমরা প্রাচীন চিকিত্সা বিজ্ঞানের প্রচলিত পদ্ধতিসমূহকে ইমিউনোলজির জ্ঞানের দ্বারা ব্যাখ্যা করে একটি গ্রহণযোগ্য ফরমূলা বিজ্ঞানীদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই যা ওরস্যালাইনের মতো একটি সহজ সমাধান দিতে পারবে।

এহেন জটিল বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ বিদ্যা বা ইমিউনোলজি সম্বন্ধে কিছু কথা জানতে হবে।