ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

খোদা বখশ গণ গ্রন্থাগার

ভারতের বিহার রাজ্যের কেন্দ্রস্থল পাটনার গঙ্গা নদীর সন্নিহিত অঞ্চলে অবস্থিত ‘খোদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরী’ গোটা মুসলিম বিশ্বের এক অপুর্ব বিস্ময়। বাগদাদ ও স্পেনের পর এটাই নানামুখী গ্রন্থ ও পান্ডুলিপি মজুদের দিক দিয়ে বৃহত্তর সংগ্রহশালা। এ গণগ্রন্থাগারে বর্তমানে রয়েছে প্রাচ্য বিষয়ক ২১ হাজার দুর্লভ পান্ডুলিপি এবং দু’লাখ ৫০ হাজার মুদ্রিত গ্রন্থ। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে গবেষক ও ইতিহাসবিদ বিহারের খান বাহাদুর খোদা বখ্শ খান বার এট ’ল চার হাজার পান্ডুলিপি নিয়ে এ গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে ১৪ শ’ পান্ডুলিপি তিনি তাঁর পিতা মৌলভী মুহাম্মদ বখ্শ এর নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন। ক্রমশ অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান হতে তিনি ইসলাম, মুসলমান, কুর’আন, হাদীস, ফিক্হ, সাহিত্য, ঐতিহ্য ও সভ্যতা বিষয়ক বিপুল সংখ্যক পান্ডুলিপি ও মুদ্রিত গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। খোদা বখ্শ খান রেজিষ্টার্ড দলিলের মাধ্যমে তাঁর এ বিশাল ব্যক্তিগত সংগ্রহ সাধারণ জনগণের জন্য সরকারের অনুকুলে দান করে দেন। দানের একটি শর্ত ছিল লাইব্রেরী ও পান্ডুলিপিগুলো পাটনার বাইরে স্থানান্তর করা চলবে না। সমৃদ্ধ বিশাল সংগ্রহের ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যের স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৬৯ সালে পার্লামেন্টে পাশকৃত আইনানুসারে ভারত সরকার এ গণগ্রন্থাগারকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানরূপে ঘোষণা প্রদান করেন। এ গণগ্রন্থাগার একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রাষ্টি বোর্ডের মাধ্যমে পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিহারের গভর্ণর পদাধিকার বলে এ গণগ্রন্থাগারের চেয়ারম্যান। দৈনন্দিন কর্মকান্ড পরিচালনায় রয়েছেন একজন সার্বক্ষণিক পরিচালক। ড. ইমতিয়ায আহমদ বর্তমানে এর পরিচালক। ২০০৪ সাল হতে তিনি এ দায়িত্বে রয়েছেন। খোদা বখ্শ খানের বিস্তৃত জ্ঞান, দূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গী, অফুরন্ত প্রাণশক্তি এবং সমাজের বিভিন্ন ধর্ম ও স্তরের মানুষের সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে এ গ্রন্থাগার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

ব্যক্তিক্রমধর্মী তাৎপর্য
দুষ্প্রাপ্য পান্ডুলিপির বিশাল সংগ্রহ, দুর্লভ মুদ্রিত পুস্তক, ক্ষুদ্রাকার চিত্র ((Miniatures), হিন্দু দেবতার অঙ্কিতচিত্র, মুঘল, রাজপুত, তুর্কী এবং ইরানী ঐতিহ্যপুষ্ট চিত্রশিল্পের সম্ভারের কারণে এ গণগ্রন্থাগার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। এটা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ট গ্রন্থাগার। এক ইঞ্চি প্রস্থ পবিত্র কুর’আনের বিশেষ পান্ডুলিপি এ গণগ্রন্থাগারের বাড়তি আকর্ষণ। স্পেনের কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় লুন্ঠনের সময় যেসব গ্রন্থ উদ্ধার করা হয়, তার মজুদও রয়েছে এ গ্রন্থাগারে। জাহাঙ্গীর নামা, শাহনামা, তারীখে খানদানে তৈমুরিয়া এর পান্ডুলিপি, প্রাচীন মুদ্রা এবং ইরানী ক্যালিগ্রাফী গ্রন্থাগারকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে। আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রো, দামেস্ক, বৈরূত, আরবদেশ হতে দুর্লভ পান্ডুলিপি সংগ্রহে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। ওরিয়েন্টাল ষ্টাডিজের মুসলিম যুগের গবেষণার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে এ সংগ্রহশালায়। ৩০০ পান্ডুলিপি সচিত্র কপি সহ ৩৯ খন্ডের বর্ণনাসূচক ক্যাটালগ গ্রন্থাগার কর্তৃক ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামিক ষ্টাডিজ বিষয়ক গ্রন্থের বিশাল ভান্ডারের জন্য এ গ্রন্থাগারের বিশেষ খ্যাতি বিশ্ব জোড়া। এ ছাড়াও ইউনানী চিকিৎসা, জীবন চরিত, সূফীবাদ, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব,মধ্যযুগীয় ইতিহাস, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ইতিহাস, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান, জাতীয় সংহতি ও স্বাধীনতার উপর উর্দূ, ফার্সী ও আরবী ভাষায় লিখিত বিশাল এক সাহিত্য ভান্ডার এ গণগ্রন্থাগারকে তাৎপর্যমন্ডিত করে।

ক্রমবিকাশ
খোদা বখ্শ গণগ্রন্থাগারের উৎপত্তি ও ক্রম বিকাশের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। এ গণগ্রন্থাগারের সূচনার মূলে আছেন খোদা বখশ খানের পিতা মওলভী মুহাম্মদ বখ্শের বদান্যতা ও আন্তরিকতা। বিহার জেলার চাপরার অধিবাসী মওলভী মুহাম্মদ বখ্শ ছিলেন গ্রন্থপ্রেমিক, বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানানুসন্ধিৎসু। দুর্লভ পান্ডুলিপি ও গ্রন্থ সংগ্রহ করা ছিল তাঁর নেশা। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল ১৪০০ পান্ডুলিপিসহ বেশ কিছু মুদ্রিত পুস্তক। ১৮৭৬ সালে তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁর সারা জীবনের সংগ্রহ তাঁর ছেলে খোদা বখ্শ খানকে প্রদান করে এ মর্মে ওসিয়্যত করেন, যদি জীবনে সুযোগ ঘটে তাহলে এ সব গ্রন্থকে পুঁজি করে জনসাধারনের জন্য একটি বৃহত্তর গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালাতে হবে। খোদা বখ্শ খান পিতার এ ওসিয়্যতকে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালনে ছিলেন সারা জীবন যতœবান। একটি সমৃদ্ধ গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠাকে তিনি জীবনের মিশন হিসেবে গ্রহণ করেন, যাতে তাঁর পিতৃস্বপ্ন পূর্ণতা পায়। ভারতীয় উপমহাদেশ ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় তিনি পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য বহু লোক নিয়োগ করেন। ১৮৮৮ সালে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করে গ্রন্থাগার সেখানে স্থানান্তর করেন। যে চমৎকার অট্টালিকায় এ সকল অমূল্য রত্ন রক্ষিত হয়, তা ছিল দু’তলা। উপরের তলায় রয়েছে একটি হলঘর ও দু’টি পার্শ্বস্থ কক্ষ। এর চারদিকে প্রশ্বস্ত ছায়াদার বারান্দ দ্বারা বেষ্টিত। পশ্চিমের বারান্দা, সিঁড়ি ও নিচের তলার অধিকাংশ কক্ষই মর্মর পাথরে আবৃত ও কারুকার্যে খচিত। পিতার লালিত স্বপ্নস্বাদ পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে খোদা বখ্শ খান ১৮৯১ সালের ২৯ অক্টোবর আরবী, ফার্সী ও তুর্কী ভাষায় রচিত ৪ হাজার দুষ্প্রাপ্য পান্ডুলিপি আরবী, ফার্সী ও ইংরেজী ভাষায় মুদ্রিত বিপুল গ্রন্থ নিয়ে পাটনার জনগণের জন্য এ গ্রন্থাগার উম্মুক্ত করে দেন। এ গণগ্রন্থাগারের সরকারী নাম ‘খোদা বখশ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরী’ হলেও সাধারন্যে এটা ‘খোদা বখ্শ লাইব্রেরী’ নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। খোদা বখ্শ খান তাঁর জীবনের মূল্যবান সময় ও সমুদয় উপার্জন গ্রন্থাগার উন্নয়নের পেছনে উজাড় করে দেন। আহারে-বিহারে, চলনে-বলনে একমাত্র গ্রন্থাগার ছিল তাঁর স্বপ্ন। দেশী-বিদেশী শত শত ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, আলিম ও পর্যটকের নিয়মিত পদভারে ধন্য এ ঐতিহাসিক লাইব্রেরী।

কে এ খোদা বখশ?
বিহারের চাপরা এলাকায় ১৮৪২ সালে খোদা বখ্শ খানের জন্ম। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মুগল বাদশাহ আলমগীর আওরঙ্গজেবের দরবারে চাকুরী করতেন। নথি, বই ও দলীল সংরক্ষণ ও রেকর্ড লিখনে তারা রিয়েজিত ছিলেন। গর্বিত পিতার যোগ্য তত্ত্বাবধানে তার শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। তিনি ১৮৬৮ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রী লাভ করেন। কোলকাতা ও পাটনায় লেখা পড়া শেষ করে তিনি ১৮৮০ সালে কোর্টের পেশকার হিসেবে যোগ দেন। ১৮৮১ সালে পাটনা আদালতে সরকারী কৌশলী (Government Pleader) হিসেবে মনোনীত হন। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি হায়দ্রাবাদের নিজাম আদালতে প্রধান বিচারপতি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি উকালতি পেশায় ফিরে আসেন। ১৯০৩ সালে CIA উপাধি প্রদানে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। সরকারী উচ্চপদ ও সামাজিক মর্যাদা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সরল, নিরহংকার ও অনাড়ম্বর। দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি ছিল তাঁর চারিত্রিক ভূষণ। গ্রন্থাগারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই ছিল তাঁর জীবন সাধনা। চাকুরী করে জীবনে যত অর্থ অর্জন করেন, তার সবটুকু তিনি গ্রন্থাগার সমৃদ্ধির পেছনে ব্যয় করেন। ফলে জীবনের প্রান্তিককালে তিনি কপর্দকশুন্য হয়ে পড়েন। ঋণ পরিশোধের জন্য রাজ্য সরকারকে তাঁর অনুকুলে অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। ১৯০৮ সালের ৩ আগষ্ট ৬৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী গ্রন্থাগারের প্রাঙ্গনে তাঁকে দাফন হয়।

ব্রিটিশ যাদুঘর একদা বেশ উচ্চ মূল্যে তার সংগৃহীত পান্ডুলিপি কেনার প্রস্তাব দিলে, তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমি দরিদ্র হতে পারি কিন্তু জ্ঞানের যে উত্তরাধিকার আমি প্রাপ্ত হয়েছি তা অর্থের মানদন্ডে পরিমাপ করা যায়না। এ সংগ্রহের জন্য আমি এবং আমার পিতা জীবন উৎসর্গ করেছি। আমাদের শ্রমের ফসল এ বিশাল সংগ্রহ পাটনার জনগণের জন্য উৎসর্গীত।”

মধ্যবিত্ত পরিবার হতে উদ্ভুত একজন সাধারণ মানুষ তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত জ্ঞানের সম্পদ জন্মভূমিকে দান করে গেছেন। এরূপ বদান্যতা বহু ধনাঢ্য ও রাজা-বাদশাহর পক্ষেও সম্ভব হয়নি। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও দানের ইতিহাসে খোদা বখশ খানের নাম চিরকাল অম্লান থাকবে। খোদা বখশ খানের অনুদিত ও সম্পাদিত Islamic Civilization গ্রন্থটি গোটা উপমহাদেশের গবেষক ও বিদগ্ধজণের নিকট বহুল পরিচিত ও সমাদৃত।

পাঠক সেবা
যে কোন উন্নত গ্রন্থাগারের ব্যাপক স্বীকৃতির জন্য দু’টি জিনিস অপরিহার্য: এক. সমৃদ্ধ সংগ্রহ, ২. মানসম্মত সেবা। খোদা বখশ লাইব্রেরীর মহামূল্যবান সংগ্রহ এবং দ্রুত সেবা বুদ্ধিজীবি ও স্কলারদের আস্থা কুড়িয়েছে। ১৯৮৫ সালে Hirakawa Camera, Automatic Processor, Minolta Microfilm Reader Printer স্থাপনের মাধ্যমে আলোকচিত্রের সাহায্যে নথিপত্রের প্রতিলিপি প্রস্তুতকরণকে (Reprography) সহজতর করা হয়। গবেষকদের অনুরোধক্রমে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ মাইক্রোফিলম ছাড়াও ফটোস্টেট কপি, স্লাইডস, ছবির প্রতিলিপি, মাইক্রোফিলম প্রিন্টস আউট সরবরাহ করে থাকে। পত্র, ফ্যাক্স, ফোন ও ই মেইলের মাধ্যমে যে কোন ব্যক্তি খোদা বখশ গণগ্রন্থাগার হতে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারেন। যে সব ব্যক্তি গ্রন্থাগারে এসে অধ্যয়ন করেন তাদের চাহিদা মাফিক সেবা প্রদানে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সচেতন। সদস্যপদের বিপরীতে ইস্যুকৃত কার্ডের মাধ্যমে লাইব্রেরী হতে বই ধার নেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। লর্ড কার্জনের নামে রয়েছে এখানে কার্জন রিডিং রুম (CRR)। হিন্দী, উর্দু ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন অধ্যয়নের জন্য রিডিং রুম উম্মুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেন্স ও তালিকাভূক্ত বই দিয়ে রিডিং রুমকে সাজানো হয়েছে। আগে সাড়ে ছ’ঘন্টা রিডিং রুম খোলা থাকতো কিন্তু ক্রমবর্দ্ধমান পাঠক চাহিদার প্রেক্ষিতে সকাল ৮টা হতে রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ১২ ঘন্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিমাসে গড়ে ৯.৫০০ পাঠক রিডিং রুমে অধ্যয়নের জন্য আসে। আধুনিকীকরণ কর্মসূচীর আওতায় সারা বিশ্বের গবেষক-পাঠকদের সুবিধার্থে গ্রন্থাগারে একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। বিহার রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় গ্রন্থাগারের সমগ্র সংগ্রহের ক্যাটালগকে স্ক্যান করে প্রকাশ করা হয়, যাতে দ্রুততম সময়ে পৃথিবীর যে কোন পাঠক তার কাঙ্খিত তথ্য-উপাত্ত খুঁজে বের করতে পারেন।

জ্ঞান বিতরণের ধারা পরম্পরা
খোদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীর অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার নিয়মিত প্রকাশনা। ১৯৭৭ সাল হতে ‘খোদা বখ্শ লাইব্রেরী জার্ণাল’ নামে একটি ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে, যা বিদগ্ধমহলে ইতোমধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। বহুমাত্রিক ভাষায় প্রকাশিত জার্ণালটি প্রকাশের উদ্দেশ্য হচ্ছে সাহিত্য, প্রাচ্য ও ইসলামিক ষ্টাডিজ বিষয়ের উন্নয়ন ও উচ্চতর গবেষণার দ্বার উম্মোচন। এতদসংক্রান্ত নতুন ও পুরাতন নিবন্ধ জার্ণালে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ গবেষণা অভিসন্দর্ভ, উর্দূ সাময়িকীর নিবন্ধসূচি, পান্ডুলিপির ক্যাটালগ, ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সৃষ্টিতে সহায়ক বিভিন্ন গ্রন্থাবলি প্রকাশ করে থাকে। এ পর্যন্ত আরবী, হিন্দী, ইংরাজী, ফার্সী ও উর্দূ ভাষায় ৪০০ শিরোনামের নিবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। পুরনো ও নতুন জার্ণাল মিলিয়ে ৩৫ হাজার ভলিউম সাময়িকীর রয়েছে এ গ্রন্থাগারে। এসব জার্ণাল হতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য গবেষকগণ নিয়মিত পাঠাগারে ভীড় জমায়।

অবকাঠামো
খোদা বখশ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীর কার্যক্রম সূচিত হয় প্রাথমিকভাবে একটি দ্বিতল ভবনে, যা ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠাতা কর্তৃক নির্মীত হয়। ১৯৩৪ সালে সংঘটিত এক ভূমিকম্পে উপরতলা ক্ষতিগ্রস্থ হলে পাঠকগণ সমস্যার সম্মুখীন হন। ১৯৩৮ সালে লাইব্রেরী ক্যম্পাসে বিহার সরকার একতলা ভবন নির্মাণ করে সব গ্রন্থকে নতুন ভবনে স্থানান্তর করার ব্যবস্থ করে দেন। ১৯৬৯ সালে এর উপর দ্বিতল ভবন নির্মীত হয়। গ্রন্থাগার পরিসরের ক্রমবিস্তৃতি ও পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ১৩ বছর পর তিন তলা একটি এনেক্স ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ভারতের তৎকালীণ রাষ্ট্রপতি জৈল সিংহ ১৯৮৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে এ ভবনের উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে লাইব্রেরী ক্যম্পাসের বাইরে মাখানিয়া কুঁয়া নামক স্থানে একটি ভবন ক্রয় করা হয়, যাতে দূর দূরান্ত হতে আগত গবেষকগণের আবাসন সুবিধে প্রদান করা যায়। পান্ডুলিপির ভান্ডারকে বিনষ্টের হাত হতে রক্ষাকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেশিন স্থাপন করা হয়। পাঠাগারে পানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করার জন্য বিকল্প অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। দূর দূরান্তের গবেষকদের চাহিদামত তথ্য-উপাত্ত সরবরাহের উদ্দেশ্যে একটি উন্নত ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা ছিল খোদাবখ্শ খানের কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারনে তার জীবদ্দশায় সেটা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠাতার ইচ্ছেকে পূর্ণতা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ বড় ছোট দু’টি অফসেট মেশিন ক্রয় করেন।

অভিজ্ঞ জনবল
১৯৬৫ সালে খোদা বখ্শ লাইব্রেরীতে দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী ও ষ্টাফ ছিল মাত্র ৪২ জন। বিগত ৩৪ বছরে আরো ১৭ জন যোগ দিয়ে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ এ। ১৯৭০ হতে ১৯৯৯ পর্যন্ত বাঁধাই, সংরক্ষণ, গ্রন্থাগার বিজ্ঞান ও আলোকচিত্রের সাহায্যে নথিপত্রের প্রতিলিপি প্রস্তুতকরণ (Reprography) শিল্পে ১৩ জন লাইব্রেরী কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নয়া দিল্লীর ন্যাশনাল আর্কাইভস অব ইন্ডিয়া, কোলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরী, লক্ষেèৗর ন্যাশনাল রিসার্চ ল্যাবোরেটরী ফর কনস্ট্রাকশন আব কালচারাল প্রপার্টি এবং পাটনার মিথিলা সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ক্যাটাগরীর প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।

কম্প্যুটারাইজড সার্ভিস
দিল্লীর ন্যাশনাল ইনফরমেটিভ সেন্টারের (NIR) সহায়তায় ১৯৯৯ সালে লাইব্রেরীতে একটি কম্পিউটার কেন্দ্র স্থাপিত হয় এবং লাইব্রেরীর পুরো ষ্টককে কম্প্যুটারাইজড সার্ভিসের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে কম্পিউটার কেন্দ্রে ঢঊঙঘ সার্ভার, আধুনিক পেন্টিয়াম ভিত্তিক ২২টি পিসি, কালার লেজার জেট প্রিন্টার, লেজার জেট প্রিন্টার, ফটো প্রিন্টার, অফিস জেট অল ইন ওয়ান, স্ক্যানার, ডিজিটাল ক্যামেরা। গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত সব পান্ডুলিপির শিরোনাম, লেখকের নাম ও বিষয়বস্তু কম্প্যুটারাইজড করে বিশ্বব্যাপী প্রচারের জন্য ইন্টারনেটে ছাড়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পান্ডুলিপির ১০লাখ পৃষ্ঠা কম্প্যুটারাইজড সম্ভব হয়েছে। ইন্টারনেট ও ই মেইল সংযোগ থাকায় পাঠক ও গবেষকবৃন্দ অন্যান্য লাইব্রেরীর ওয়েবসাইটেও প্রবেশের সূযোগ পান।

কৃতিত্বের স্বীকৃতি
সমাজের প্রতি মৌলভী খোদা বখ্শ খানের অবদান ব্যাপক। মানবতার প্রতি এ মনীষীর ত্যাগের স্বীকৃতি এবং তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সাল হতে তাঁর নামে চালু করা হয় বার্ষিক পুরষ্কার। এ পুরষ্কারে রয়েছে এক লাখ ভারতীয রুপী ও সম্মাননাপত্র। সারা জীবনের গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ এ পুরষ্কার প্রদান করা হয়। এ পর্যন্ত আট জন গবেষককে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছেন- কম্প্যুজিট কালচার অব ইন্ডিয়া বিষয়ে ড. বি এন পান্ডে ও মিসেস সুভদ্র যোশী, জাতীয় সংহতি বিষয়ে ড. আনোয়ার কামাল কিদওয়ায়ী, ফার্সী ভাষা ও সাহিত্যে প্রফেসর নাযির আহমদ ও প্রফেসর এস. এ. এইচ আবিদী, ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রফেসর ইরফান হাবীব, সূফীতত্ত্ব বিষয়ে প্রফেসর জগতর সিংহ এবং আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে প্রফেসর আবদুল হালীম নদভী। নয়াদিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবন ও পাটনার রাজভবনে ভারতের রাষ্ট্রপতি এসব পুরষ্কার স্কলারদের হাতে তুলে দেন।

গবেষণা সুবিধে
‘খোদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরী’ ইতোমধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারতবর্ষে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সহায়তায় লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ গবেষকদের পি.এইচ.ডি ও ডি.লিট ডিগ্রী দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। ভারতের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘খোদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীকে পি.এইচ.ডি ও ডি.লিট ডিগ্রী প্রদানের জন্য গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত করেছে।

বিস্ময়কর স্বপ্ন
এক রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, লাইব্রেরীর পার্শ্ববর্তী গলিতে বহু লোকে ভিড় জমিয়েছেন। তিনি তাদের নিকট যাওয়া মাত্রই তারা চিৎকার করে বলে উঠে, “বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. তোমার কুতুবখানা দেখতে এসেছেন অথচ তোমার কোন পাত্তা নেই।” খোদাবখ্শ সাহেব দ্রুতপদে পুস্তকালয়ে ঢুকে দেখলেন, কক্ষ শূন্য কিন্তু দ্’ুখানা হাদীসের পান্ডুলিপি টেবিলের উপর খোলা পড়ে রয়েছে। লোকেরা বলল, হযরতই সেগুলি পড়ে দেখেছেন। পুস্তক দু’খানা বাইরে নেওয়া নিষিদ্ধ করে খুদাবখ্শ সাহেব স্বহস্তে তাতে মন্তব্য লিখে দেন। (ড. এম আবদুল কাদের, মুসলিম কীর্তি, ইফাবা, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ২৮৪)

এই লাইব্রেরীর ইতিহাস ও ক্রমবৃদ্ধির সাথে এরূপ অনেক কাহিনী বিজড়িত আছে। ভারতের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান পান্ডুলিপি সংগ্রহ ছিল নিঃসন্দেহে দিল্লীর শাহী কুতুবখানায়। ষোড়শ শতাব্দীতে প্রাচ্যের হস্তলিপি ও পুস্তক বাঁধাই শিল্পের সব দুর্লভ ও উৎকৃষ্ট নমুনা সেখানে সংগৃহীত হয়। এসব সম্পদ কিছু ক্রীত, কিছু বাদশাহদের বেতনভোগী শিল্পীদের সম্পাদিত, কিছু আওরঙ্গযেব কর্তৃক হায়দারাবাদ বিজাপুর প্রভৃতি রাজ্য জয়ের ফলে প্রাপ্ত এবং অবশিষ্টগুলো বড় বড় আমীরের মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সংগৃহীত। এভাবে সে যুগে প্রাচ্যের বৃহত্তম লাইব্রেরী সূচিত হয়। পারস্য ও মধ্য এশিয়া যখন অবিশ্রান্ত সংগ্রামে ছিন্ন ভিন্ন তখন বাদশাহদের সুশাসনে ভারতবর্ষে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি বিরাজ করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসব পুস্তকের অনেকগুলি অযোধ্যায় নওয়াবদের লাইব্রেরীতে স্থানান্তরিত হয় কিন্তু সিপাহী যুদ্ধের ফলে দিল্লী ও লক্ষেèৗর পতন ঘটলে বাদশাহ ও নওয়াবদের এ অমূল্য সম্পদ লুন্ঠিত হয়ে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধে রামপুরের নওয়াব ছিলেন ইংরেজের পক্ষে। তিনি বিজয়ীদের মধ্যে ঘোষণা করেন, যে কেও তার নিকট একখানা পান্ডুলিপি নিয়ে আসবে, সে একটি রৌপ্য-মুদ্রা পাবে। ফলে লুন্ঠিত দ্রব্যের সর্বোৎকৃষ্ট অংশ তাঁরই হাতে পড়ে। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৫)

খোদা বখ্শ সাহেব অনেক পরে পুস্তক সংগ্রহে হাত দিলেও নওয়াবের সাথে তাঁর তীব্রতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। অবশেষে তিনি মুহাম্মদ মক্কী নামক এক পুস্তক শিকারীকে নওয়াবের পক্ষ থেকে ভাগিয়ে আনতে সমর্থ হন। তাতে তাঁর সাফল্য নিশ্চিত হয়ে পড়ে। তিনি তাকে দালালী ভিন্ন ১৮ বছর পর্যন্ত মাসিক ৫০ টাকা হিসেবে বেতন দেন। সিরিয়া, আরব, মিশর, বিশেষতঃ বৈরুত ও আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রধানত দুষ্প্রাপ্য আরবী পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা ছিল তার কাজ। কেউ খোদা বখ্শ সাহেবের কাছে পান্ডুলিপি বিক্রি করতে আসলে, দামে বনিবনা না হলেও তিনি তাকে দ্বিগুন রেলভাড়া প্রদান করতেন। এভাবে তাঁর সুনাম ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ; ফলে কেউ কোন পুস্তক বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে তাঁরই কাছে নিয়ে আসত। একবার তাঁর ভূতপূর্ব দফতরী পুস্তকালয়ের তালা ভেঙ্গে কয়েক খানা সর্বোৎকৃষ্ট পান্ডুলিপি চুরি করে বিক্রয়ার্থ লাহোরের এক দালালের কাছে প্রেরণ করে। দালাল খোদা বখ্শকেই সম্ভাব্য ক্রেতা মনে করে তাঁর নিকট পান্ডুলিপিগুলি বিক্রয়ের প্রস্তাব দেয়। এভাবে হৃত ধন পুনরায় তাঁর হস্তগত ও অপরাধী যোগ্য দন্ডে দন্ডিত হয়। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৫)

একবার খোদা বখ্শ হায়দরাবাদ হাইকোর্ট থেকে বাসায় ফিরছিলেন, তাঁর চোখ সর্বদাই পান্ডুলিপির খোঁজে থাকত। সহসা এক মুদী দোকানে ময়দার বস্তার উপরে রক্ষিত এক পুটলি পুস্তকের উপর তাঁর নজর পড়ে। তিনি তৎক্ষণাত গাড়ী থামিয়ে বইগুলো নেড়ে চেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এইগুলির মূল্য কত? দোকানদার উত্তর দিল,‘আর কেউ হলে আমি এ পুরাতন পঁচা কাগজের স্তুপ তিন টাকাই বিক্রি করতাম। কিন্তু হুজুর যখন চাইছেন, তখন অবশ্যই এটাতে মূল্যবান কিছু আছে। আমি এগুলির ২০ টাকা চাই। খোদা বখ্শ খান দ্বিরুক্তি না করে সে টাকা দিয়েই পুটলিটা নিয়ে আসেন। দোকানদারের অনুমান বাস্তবিকই যথার্থ। পুটলিটার বাজে কাগজের মধ্যে আরবী গ্রন্থবিবরণী সম্পর্কে একটি প্রাচীন পুস্তক ছিল, যা আর কোথাও পাওয়া যায় না। খোদা বখ্শ খানের ক্রয় করার পরেই নিজাম বাহাদুর তাঁকে ২০০ টাকা দিতে চাইলেন, কিন্তু খুদাবখশ লোভে পড়ার পাত্র ছিলেন না।

দুর্লভ গ্রন্থ সংগ্রহেই তিনি সর্বাপেক্ষা অধিক আনন্দ পেতেন। তাঁর নিকট প্রায়ই দু’একজন অভ্যাগত দর্শক উপস্থিত থাকতেন; কেউ না থাকলে তিনি প্রশান্তভাবে কোন না কোন পান্ডুলিপির পাতা উল্টিয়ে যেতেন। ইসলামী গ্রন্থবিবরণীতে তাঁর এতই জ্ঞান ছিল যে, একদা তিনি স্যার যদুনাথ সরকারের নিকট হিজরী প্রথম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত আরবী জীবন চরিত লেখক ও সমালোচকদের নাম মুখস্ত বলে যান: সাথে সাথে তাঁদের প্রত্যেকের গুরুত্ব সম্পর্কে তুলনামূলক সমালোচনা করেন। স্যার যদুনাথ সরকার এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৫-৭)

পরিদর্শন প্রতিবেদন
১৯২৫ সালে মহাত্মা গান্ধী খোদা বখ্শ লাইব্রেরী পরিদর্শন করে বলেন:

“I heard about this beautiful library nine years ago, and ever since I have had the desire to visit it. It has given me great joy to be able to examine the rich collection of rare books which the keepers so patiently and so kindly showed me. The books are works of art. The magnificent finish and the colouring about the decorations of al-Koran and Shahnamah are an eternal feast for the eye. I revere the memory of the great founder who spared no pains or money to present India with such a rare collection”.

“আমি প্রায় ৯ বছর আগে এ চমৎকার গ্রন্থাগারের ব্যাপারে অবগত হই। তখন থেকে এটা পরিদর্শনের জন্য আগ্রহী ছিলাম। দুর্লভ গ্রন্থের সুসমৃদ্ধ সংগ্রহ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়ে আমি পুলকিত। গ্রন্থগারিক অনুগ্রহ ও ধৈর্য ধরে আমাকে এগুলো দেখার ব্যবস্থা করেন। এ সব গ্রন্থ শিল্পের অন্তর্ভূক্ত। পবিত্র কুরআন ও শাহনামার বর্ণিল অলংকরণ ও নিখুঁত চমৎকারিত্ব দেখলে স্বর্গীয় অনুভূতিতে চোখ জুড়িয়ে যায়। দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের এমন ভান্ডার ভারতকে উপহার দেয়ার জন্য গ্রন্থাগারের মহান প্রতিষ্ঠাতা যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেন তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।”

১৯৫৩ সালে ভারতের প্রধান মন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহেরু এ গ্রন্থাগার পরিদর্শনে এসে বলেন:

“I had long heard of the Khuda Baksh Library and knew that it was a very fine collection. It was only this morning that I first visited it and saw some of its treasures. I found them even more remarkable than I had expected – and I had expected much. It was a rare delight to see these beautiful works of art, which enshrine a period of India’s history. It was a joy and an education to see these priceless treasures, some quite unique”.

“আমি দীর্ঘদিন যাবত এ গ্রন্থাগার এবং এর সমৃদ্ধ সংগ্রহ সর্ম্পকে শুনেছি। আজ সকালে আমি সর্বপ্রথম এ গ্রন্থাগার পরিদর্শনের সুযোগ লাভ করি এবং এর বেশ কিছু সম্পদ প্রত্যক্ষ করি। আমি এমন তাৎপর্যপূর্ন সম্ভার প্রত্যক্ষ করি, যা আমার প্রত্যাশার চাইতেও বেশী। শিল্পের এ চমৎকার কর্ম দেখার এটা একটি দূর্লভ আনন্দঘন মূহুর্ত, যা ভারতের ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে মহিমান্বিত করেছে। এমন অকৃত্রিম ও অমূল্য সম্পদ পরিদর্শনের সুযোগ আনন্দ ও শিক্ষার ব্যাপার।”

ইন্ডিয়ান ডোমিনয়নের প্রথম গভর্ণর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন (১৯৪৭-১৯৪৮) ১৯৪৮ সালে গ্রন্থাগার পরিদর্শন করে বলেন-

“A unique collection of which this great country may justly be proud”

“এটা এমন অনুপম সংগ্রহশালা, যার জন্য এ মহান দেশ যথার্থভাবে গর্ব করতে পারে।”

পাটনা যাদুঘরের প্রথম কিউরেটর ও ১৯৫৭ সাল হতে ১৯৬২ খোদা বখ্শ লাইব্রেরীর সেক্রেটারী সাইয়্যেদ আহসান শের বলেন:

“In India there existed several well known libraries, but no traces of these libraries were found after the Mutiny. In those times of which history has doleful tale to tell, these libraries were either destroyed or their books were taken out of the country. Thus as far as I am aware there are no libraries in India today, as there are none at Medina, Cairo or Constantinople. Let us hope that before long we shall possess a press to multiply the copies of valuable works and so bring them within the reach of the reading public. The year the library was opened it contained 4,000 manuscripts; it is now in the excess of several thousand. The best collections of any libraries in the world.

“ভারতের বহু নাম করা গ্রন্থাগার ছিল কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের পর এগুলোর অস্থিত্ব বিলীন হয়ে যায়। বেদনাময় ঘটনার দিনলিপির রেখাচিত্র অংকন করতে গিয়ে ইতিহাস আমাদের বলে যে, এ সব গ্রন্থাগার হয়তো বিধ্বস্ত হয়েছে নয়তো গ্রন্থাগারের বইগুলো দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার জানা মতে ইস্তাম্বুল, কায়রো, মদীনা ও ভারতে এটার সমকক্ষ আর কোন গ্রন্থাগার নেই। আশা করতে পারি অতি অল্প সময়ে আমরা একটি ছাপাখানা সংগ্রহ করতে পারবো; যার মাধ্যমে মূল্যবান নিদর্শন-কর্ম কপি করে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌছাঁতে সক্ষম হবো। এ গ্রন্থাগার উদ্বোধনের দিন পান্ডুলিপির সংখ্যা ছিল ৪হাজার, বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে কয়েক হাজারে পৌঁছে গেছে। বিশ্বের যে কোন গ্রন্থাগারের চাইতে এর সংগ্রহ বেশী।”

এক কথায় ‘খোদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরী’ কেবল ভারতের নয় বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য গৌরবের বস্তু। খোদা বখ্শ খানের মত মনীষী যে দেশে জন্ম নেয় সে দেশ ধন্য, এতে সন্দেহ নেই। তিনি আমাদের জন্য আদর্শ। আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করি।

***
(http//klibrary.bih.nic.in;siwan.bih.nic.in;www.namami.nic.in/mrc;www.indiaculture.nic.in)