ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

পোল্যান্ডের একটি মসজিদ
পোল্যান্ডে ইসলামের বিধি-বিধান প্রতিপালনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির লক্ষে মুসলমান নেতৃবৃন্দ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে মিলিত হয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরীতে সক্ষম হয়েছেন। এ আইন কার্যকর হলে ১৯৩৬ সালের আইন বাতিল হয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত হবে। খসড়া আইনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে

(ক) মসজিদে ইমাম ও খতীবদের তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যে সব বিয়ে সম্পন্ন হবে তা সিভিল ম্যারেজ হিসেবে আইনী মর্যাদা পাবে;
(খ) উলামা-মাশায়েখ কর্তৃক যে কোন খাদ্যদ্রব্যের জন্য প্রদত্ত হালাল সার্টিফিকেট রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হবে;
(গ) ধারালো ছুরি দিয়ে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, দুম্বা, হাঁস, মুরগী, কবুতরের গলা দিয়ে জবাই করলে এবং জবাই করার সময় আল্লাহু আকবর বললে কেবল মাত্র মুসলমানগণ সে গোশত খেতে পারবেন;
(ঘ) ঈদসহ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব সমূহ ছুটির দিন হিসেবে গণ্য হবে;
(ঙ) ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি-বিধান পালনে প্রয়োজনে মুসলমানগণ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে ছুটি নিতে পারবেন।
এ আইন পোল্যান্ডে ইসলামের বিকাশ এবং অবস্থানরত মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

৩.১২.৬৭৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট পোল্যান্ড ইউরোপের নবম বৃহত্তম দেশ। ৪ কোটি জন অধ্যুষিত এ দেশে মুসলমানদের সংখ্যা ৩০ হাজার। তন্মধ্যে ৫ হাজার তাতার বাকী ২৫ হাজার বিদেশী অভিবাসী। তাতার জনগোষ্ঠী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী। মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, ইরাক, তিউনিসিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, সোমালিয়া, চেচনিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে মুসলমানগণ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে দেশ ত্যাগ, উচ্চতর শিক্ষা, উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, ব্যবসা-বানিজ্য প্রভৃতি কারণে পোল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে আসতে থাকেন। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী রোমান ক্যাথলিক এবং ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা অস্পষ্ট।

বিগত সাত শ’ বছর ধরে মুসলমানগণ পোল্যান্ডের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সু সম্পর্ক বজায় রেখে আসছেন। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সাথে ইসলামের অনুসারীদের বাহ্যত কোন বিবাদ নেই। চতুর্দশ শতাব্দীতে গ্র্যান্ড ডিউক উইহোল্ডের শাসনামলে তাতারগণ পোল্যান্ডে থাকার অনুমতি পান এবং সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত হন। ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ডের অখন্ডতা রক্ষায় মুসলমানগণ জার্মানী ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। জোসেফ বেন (ইউসূফ পাশা) নামক এক জেনারেল পোলিশ সেনাবাহিনীর অধীনে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন।

বুহুনিকী এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজা তৃতীয় সোবেস্কি মুসলমানদের এক খন্ড জমি দান করেন। শিক্ষা গ্রহণ, ভূমি ক্রয়, মসজিদ নির্মাণ, বাসস্থান তৈরী, ব্যবসা পরিচালনা, ও স্থানীয় মেয়েদের বিবাহ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য সুযোগ অবারিত হয়। বুহুনিকী ও কুরুসজিনিয়ানিতে অবস্থিত মসজিদ দু’টি তুলনামূলকভাবে অতি প্রাচীন। বিয়ালিস্টকে রয়েছে একটি ইসলামী কেন্দ্র যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৮০০। পোল্যান্ডে জন্ম নেয়া বহু মুসলমান ধীরে ধীরে শিক্ষা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিভাগে ঢুকে যাচ্ছেন। ড. আলী মিসকভজিস বিয়ালিস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ড. সলিম চাসভিজেউক্স ওয়ারামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

মুসলিম তাতারগণ তাঁদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে পোল্যান্ডের জীবনধারার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হন। তাঁরা তাঁদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে স্লোভাকিয়ান বাকরীতি গ্রহণ করেন। এ দেশে দাওয়াতী তৎপরতা চালাতে সরকারের পক্ষ হতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। আধ্যাত্মিক শান্তির অন্বেষায় পোল যুবক, শিল্পী ও ছাত্রগণ ইসলামের দিকে ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে। দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন সমস্যার ইসলামী সমাধান প্রাপ্তির লক্ষে তাতারগণের রয়েছে থোমাস মিসকিউজ নামক একজন মুফতী ।

রাজধানী ওয়ারশ’তে মুসলমানদের রয়েছে নিজস্ব মসজিদ, কুর’আন শিক্ষা কেন্দ্র, হালাল খাদ্যের ষ্টল ও কবরস্থান। ওয়ারশ’ কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমা’র দিন প্রায় তিন শতাধিক মুসলমান নামায আদায়ের জন্য জড়ো হন। রাজধানীতে অবস্থানকারী পাঁচ হাজার মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষিত। পোলিশ ভাষায় ইতোমধ্যে পবিত্র কুর’আনের একটি অনুবাদ, ‘ইমাম নববীর ৪০টি হাদীস’ নামক একটি হাদীস গ্রন্থের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা বেরিয়েছে। পোজনান এলাকায় কোন মসজিদ না থাকলেও মুসলমানগণ স্থানীয় ছাত্রাবাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেন।

পোল্যান্ডে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের মধ্যে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পোলিশ মুসলিম ইউনিয়ন ও ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেন্টস সোসাইটির কর্মতৎপরতা বেশ চোখে পড়ার মতো। পোলিশ মুসলিম ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে কুর’আন, হাদীস, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের লক্ষে পোলিশ ও ইংরেজী ভাষায় বিভিন্ন ম্যাগাজিন বের হয় নিয়মিত। তন্মধ্যে ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড রিভিউ’, মাসিক ‘ইসলামিক ম্যাগাজিন’, ‘আলিফ ম্যাগাজিন’ অন্যতম। পোলিশ ও ইংরেজী ভাষায় রয়েছে তাঁদের নিজস্ব ওয়েব সাইট http://www.planetaislam.com I http://www.islam.pl.com

মুসলিম স্টুডেন্টস সোসাইটি মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র চালু করে। সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে মাহফিল, সেমিনার, সংলাপ, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ২২টি গ্রন্থ, ‘আল-হাদারা’ নামক একটি আরবী ত্রৈমাসিক এবং ‘হিকমা’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। ‘হিকমা’-এর এ পর্যন্ত ৪২টি সংখ্যা বেরিয়েছে। মুসলিম ছাত্রদের মাদ্রাসা ও স্কুলে পড়া-লেখায় উদ্বুদ্ধকরণ ও ভর্তির ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান সোসাইটির অন্যতম কর্মসূচী। স্কলারদের মাধ্যমে পোলিশ ভাষায় পবিত্র কুর’আনের তরজমাসহ একটি নির্ভরযোগ্য তাফসীর প্রকাশ, রাজধানী ওয়ারশ’তে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, ইসলামী গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। পোল্যান্ডের এ ইতিবাচক পরিস্থিতি পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে।