ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

ইসরাঈলী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত ফিলিস্তিনের আধ্যাত্মিক গুরু শেখ আহমদ ইয়াছিন (১৯২৯-২০০৪)

শেখ আহমদ ইয়াছিন-এর রক্তে রঞ্জিত পিচঢালা পথ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইহূদী রাষ্ট্র ইসরাঈল ‘মোসাদ’সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানী ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব হত্যার এক জঘন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবীর কোন মুসলিম রাষ্ট্র যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে- ইসরাঈল তার মিত্র দেশসমূহকে নিয়ে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। মুসলিম বিশ্বের কোন দেশে যদি বিস্ময়কর মেধার অধিকারী কোন বিজ্ঞানীর জন্ম হয় এবং তাঁর মেধা যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর কাজে ব্যবহৃত হয় তাহলে নির্ঘাত ইহূদী হিটলিস্টে তাঁর নাম অন্তর্ভূক্ত হবে। ঘাতক স্কোয়াড তাঁর পেছনে লেগে থাকবে এবং সুযোগ পেলে গুলি করে দেবে। ইহূদীরা মুসলমানদের পরমাণু অস্ত্র শুন্য করতে চায় অথচ ইসরাঈলের রয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্রের বহর। বিবিসি পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে ২২০০টি পারমাণবিক বোমা, যুক্তরাজ্যের আছে ১৬০টি, ফ্রান্সের আছে ৩০০টি, রাশিয়ার আছে ২৮০০টি আর চীনের আছে ১৮০টি (কালের কন্ঠ, ৭.০৩.২০১০, পৃ. ০৩)। উপর্যুক্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে আরো বহু দেশ আছে যাদের কাছে মজুদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র কিন্তু ইরানের থাকতে পারবে না। এটা কোন যুক্তি ? ইহূদী-খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকলে নিরাপদ অপর দিকে মুসলিম দেশের থাকলে তা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। এ ধরনের প্রচারণা গোয়েবলসীয় শয়তানী ছাড়া আর কী?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক ছিল এক শক্তিশালী দেশ। ইরাকের সেনা সদস্যরা চৌকস। ইঙ্গ-মার্কিন-ইহুদি শক্তি টার্গেট করলো ইরাককে। দুর্ভাগ্য সাদ্দাম হোসেনের, যাদের প্ররোচণায় তিনি কুয়েতে অভিযান চালালেন, তাদের হাতেই কুরবানীর ঈদের দিন সকালে ফাঁসিতে ঝুলতে হলো তাঁকে। ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের নেপথ্য নায়কও তারা। ১০ বছরের এ যুদ্ধে কত লক্ষ মানুষের প্রাণ গেল, কত কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট হলো তার ইয়াত্তা নেই। কত মেধাবী ও প্রতিভাবান মানুষ অকালে ঝরে গেল তার হিসাব রাখে কে ? সব ষড়যন্ত্র। সব সাম্রাজ্যবাদী খেলা। মুসলমান রাজা-বাদশাহ ও স্বৈরশাসকগণ তাদের হাতের ক্রীড়নক। ক্ষমতার মসনদই তাদের শেষ কথা।

ইরাকের বিশাল সেনাবাহিনী যাতে ইসরাঈলের জন্য হুমকী সৃষ্টি না করে সে জন্য মিথ্যা অজুহাতে ইহূদী মিত্র মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র ২০০৩ সালে ১ লাখ ৭১ হাজার সৈন্য নিয়ে ইরাক দখল করে নেয়। বিদ্যুৎ তৈরীর উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পরমাণু সংক্রান্ত নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত আগ্রাসী সেনাবাহিনী তাদের নিজ দেশে পাচার করে। পারমাণবিক সব গবেষণা ও স্থাপনা বন্ধ ঘোষণা করে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী ইরাক থেকে বিদায় নিয়েছে ঠিক কিন্তু রেখে গেছে পৈশাচিকতার উন্মত্ত তান্ডব, বাতাসে রাসায়নিক মারণাস্ত্রের বিষক্রিয়া ও আগ্রাসনের দুঃসহ স্মৃতি। মার্কিন সশস্ত্র অভিযানে দেড় লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। বিধবা হয়েছেন ৭ লাখ ৪০ হাজার মা। মার্কিন হামলার পর ২০ লাখ ইরাকি যাদের মধ্যে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যসেবী সিরিয়া, জর্দানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে আশ্রয় নিয়েছে উদ্বাস্তু হিসেবে। শত্রুর নখর থাবায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক। লড়াই চলাকালীন দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অস্ত্রের মুখে লুট করে নিয়ে গেছে নগদ অর্থ, সোনা-দানা, বৈদেশিক মুদ্রা, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় রেকর্ড ফাইল, প্রত্মতাত্বিক সম্পদ ও পেট্রোল। ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় ইরাকের অবস্থান পঞ্চম। ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-কে কেন্দ্র করে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করেছে এবং নতুন আবিস্কৃত গোলা ও অস্ত্রের পরীক্ষাও করেছে ইরাকের মাটিতে। মার্কিন বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমা ও ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষক্রিয়ায় বাতাস হয়ে গেছে বিষাক্ত। ইরাকে প্রতি এক হাজার প্রসবের ঘটনায় শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৮০। দেশটিতে ২০০৪ সালের তুলনায় লিউকেমিয়া বেড়েছে ৩৮ আর স্তন ক্যান্সার ১০ গুণ। মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধ শেষ হলেও সহিংসতা বন্ধ হয়নি।

ইরাক পরমাণু প্রকল্পের প্রধান ড. ইয়াহয়া আমীন আল মুশহিদ ১৯৮০ সালে প্যারিসে মোসাদ এজেন্টদের হাতে নিহত হন। ইরাকী পরমাণু রিয়েক্টর উন্নয়নের জন্য তিনি তখন ফ্রান্স কর্তৃপক্ষের সাথে প্যারিসে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যু ইরাকের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

লিবিয়ার পারমাণবিক স্থাপনার সব বৈজ্ঞানিক ম্যাটেরিয়াল মার্কিন সেনা সদস্যরা কার্গো জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যায়। বিনিময়ে স্বৈরশাসক গাদ্দাফী কিছু কাল (২০০৩-২০১১) ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা পায়। দালালি করেও ক্ষমতায় ঠিকে থাকা বেশী দিন সম্ভব হলো না গাদ্দাফীর। ৪২ বছরের দুঃসহ স্মৃতি লিবিয়ানদের বহন করতে হবে বহু কাল। এখন লিবিয়ার অয়েল ফিল্ডের নতুন মুরব্বি ন্যাটো। ২০০৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গাদ্দাফী আমেরিকা ও ব্রিটেনের ইহুদি লবির চাপে পারমাণবিক গবেষণা প্রকল্প পরিত্যাগ করার পরপরই আকাশ ও নৌপথে ক্যামিকাল, নিউক্লিয়ার ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র উপাদান আমেরিকায় পৌঁছতে থাকে। ২০০৩ সালে ২০০ ব্যালাস্টিক স্কাড-বি ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার উপযোগী ২ হাজার টন ইউরেনিয়াম ও রেডিওলজিক্যাল ম্যাটেরিয়াল আমেরিকা নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ঞবহহবংংবব স্টেট বিমান বন্দরে নিয়মিত ত্রিপোলি হতে রাসায়নিক অস্ত্র সামগ্রীবহনকারী কার্গো বিমান অবতরণ করতে থাকে। সর্বশেষ খবর হচ্ছে লিবিয়ার অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের যোগসাজশে মার্কিন যুক্তরাস্ট্র লিবিয়ার খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজনে গ্রেপ্তার এবং বিজ্ঞান গবেষণাগার খুঁজে বের করার জন্য ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করছে (এপি, ১৫.০৯.২০১১)। কেবল ত্রিপোলির বাইরে তাজুরা নামক স্থানে স্থাপিত পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে ৭৫০জন বিজ্ঞানী কাজ করতেন। তাদের বর্তমান অবস্থান অনেকটা অজ্ঞাত।

সোয়াত উপত্যকায় শরী‘য়া চালুকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র পাকিস্তানের কাহুটা পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা করছে। তালিবান গেরিলারা যে কোন সময় পারমাণবিক স্থাপনা দখল করে নিতে পারে, আমেরিকা প্রতিনিয়ত এ আশংকা প্রকাশ করে একটি অজুহাত খাড়া করতে চাচ্ছে। তালেবান যোদ্ধাদের নাগালের বাইরে রয়েছে তাদের পরমাণু অস্ত্র। পাকিস্তান বারবার আশ্বস্ত করলেও ওয়াশিংটন বলছে ‘পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তা এখনো সমূহ বিপদের মুখোমুখি’। যুক্তরাষ্ট্র্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল জেমস জোনস বিবিসি-এর সাথে সাক্ষাতকারে বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী যতই বলুক, তাদের পরমাণু অস্ত্র নিরাপদে আছে। এতদসত্ত্বেও ওয়াশিংটন আরো নিশ্চয়তার প্রয়োজন আছে বলে মনে করে’। এ ভাবে তালেবান হুমকির প্রসঙ্গ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক স্থাপনা পাহারাদারী করার জন্য পাকিস্তানকে বাধ্য করবে। ফলে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে আমেরিকর নির্দেশে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের জনক ড. আব্দুল কদীর খানকে গৃহবন্দী রাখা হয়। তাঁকে সি.আই.এ-এর কাছে হস্তান্তরের জন্য আমেরিকা জোর দাবী জানায়। জনরোষের ভয়ে মোশাররফ সরকার এ দাবী মানতে পারেনি।

রহস্যজনক “US Contingency Plan” অনুসারে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থাত আল কায়দা বা তালেবান জঙ্গিরা যদি পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্প দখলে নেয়ার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হলে পেন্টাগন পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই পাকিস্তানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক পরিকল্পনা করেছে। পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার সাইট বিশেষ করে বৃহত্তর ‘খুনাব রিঅ্যাক্টর এবং নিউ ল্যাব প্রসেসিং প্লান্ট’ বোমা মেরে ধ্বংসকরণের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিনিদের (আমার দেশ ০১.১০.২০১১, পৃ. ০৭)।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হোক- এটা ইসরাঈল কোন দিন চায়নি। ইহুদী লবি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বুশের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে ইরানে হামলা পরিচালনার জন্য কিন্তু আফগানিস্তান ও ইরাক সংকটের পাশপাশি আরেকটি সংকট তৈরী হোক বুশ সে ঝুঁকি নিতে চাননি। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও অর্থহানি হয়েছে। মার্কিন সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় খোদ ইসরাঈল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাহস করে নি। তবে যে কোন মুহূর্তে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাসমূহ ইসরাঈলের টার্গেট হতে পারে।

সরাসরি হামলা করতে না পেরে ইসরাঈল গুপ্ত হত্যার আশ্রয় নিয়ে মুসলিম বিশ্বকে মেধাশূণ্য করার ষড়যন্ত্রে নেমেছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে ইরানের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী আরদাশীর হাসান বাউর মোসাদ এজেন্টদের হাতে প্রাণ হারান। আরদাশীর হাসান ইস্পাহানে অবস্থিত পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পরমাণু গবেষণার অন্যতম পাদপীঠ সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ষ্টাডিজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘দি সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় যে, ইরানের শীর্ষস্থানীয় আরো বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ইসরাঈলীদের হত্যার তালিকায় রয়েছে।

‘হামাস’ এ প্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনের আধ্যাত্মিক গুরু অশীতিপর বৃদ্ধ শেখ আহমদ ইয়াছিন(৭৫)ফজরের নামায আদায় করে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ইসরাঈলী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শাহাদত বরণ করেন ২০০৪ সালের ২২ মার্চ। বহু দিন ইসরাঈলী কারাগারে বন্দি শেখ আহমদ ইয়াছিন হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন। ১২ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেলে তিনি হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন। নানা জটিল রোগের কারণে তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এমন অসুস্থ মানুষটিকে হত্যা করা যে কত বর্বরোচিত ও পৈশাচিক, সচেতন মানুষ মাত্রই তা বুঝেন। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পেছনেও মোসাদ-এর হাত ছিল বলে অনেকের সন্দেহ। সাইপ্রাসে নিযুক্ত জর্দানী বংশোদ্ভুত আল-ফাতাহ প্রতিনিধি হোসাইন আল বশির ১৯৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারী মোসাদ এজেন্টদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। নিকোশিয়ায় তাঁর হোটেল কক্ষে রক্ষিত বোমার বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ১৯৭২ সালের ২ ডিসেম্বর প্যারিসে নিযুক্ত পিএলও প্রতিনিধি ড. মুহাম্মদ হামশারী’কে মোসাদ হত্যা করে তাঁর অফিসের টেলিফোন টেবিলে টাইম বোমা পুঁতে।

আরব বিশ্বের খ্যাতনামা সব বিজ্ঞানীর কর্মপ্রয়াসের উপর রয়েছে ইসরাঈলের কড়া গোয়েন্দা নজরদারী। মিশরীয় পরমাণু বিজ্ঞানী ড. সামীরা মূসা ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অজ্ঞাত পরিচয় এক ড্রাইভার তাঁর গাড়ী চালাচ্ছিল। ইসরাঈল কর্তৃক পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার মজুদ করার কারণে যে কোন সময় মধ্য প্রাচ্যে জুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, ড. সামীরা এমন আশংকা প্রকাশ করতেন বলে ইসরাঈল তাঁকে অপছন্দ করতো। এ ছাড়া তিনি পরমাণু প্রকল্পের জন্য ইউরেনিয়ামের তুলনায় ধাতব পদার্থ হতে আরো সাশ্রয়ী জ্বালানী উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। ১৯৬৭ সালে মিশরের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আমীর নাজীব গুপ্তঘাতকের হাতে ডেট্রয়টে নিহত হন। সামরিক অভিযানে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারে তিনি বেশ কয়েকটি সফল পরীক্ষা পরিচালনা করেন।

১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে অজ্ঞাতামা আততায়ী মিশরীয় বিজ্ঞানী সাঈদ আল বুদায়েরকে তাঁর আলেকজান্দ্রিয়াস্থ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করে। মাইক্রোওয়েভ ফিল্ডে তিনি বেশ কয়েকটি অগ্রবর্তী থিউরী উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। এসব হত্যাকান্ড মুসলমানদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত রাখার যায়নবাদী কৌশলের অংশ বিশেষ মাত্র। ইসরাঈল ছাড়া যেন আর কারও হাতে পরমাণু অস্ত্র না থাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যেন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরী না হয়, এটাই ইহূদীদের টার্গেট। সামরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে ইসরাঈলের হাতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ৩০০টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) ১৮৯টি রাস্ট্র স্বাক্ষর করলেও আজ পর্যন্ত ইসরাঈল এ চুক্তি মেনে নেয়নি। ইসরাঈলকে এনপিটি’তে যোগ দেয়ার জন্য কিংবা তার কাছে থাকা পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনরূপ কার্যকর চাপ প্রয়োগ করেনি। মার্কিন নেতাদের এ ‘ডাবল স্টান্ডার্ড’ পলিসি বিশ্বে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

আরব গোয়েন্দাদের হাতে মধ্যপ্রাচ্যে কোন ইহূদী বিজ্ঞানী মারা গেলে গোটা দুনিয়া জুড়ে কী তুলকালাম কান্ড ঘটতো আমরা কী তা কল্পনা করতে পারি? খোদ আরবদেশের রাজা-বাদশাহগণও এটাকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলে চিৎকার দিয়ে উঠতেন। পশ্চিমা বিশ্ব এ ভাবে ইহূদীদের মাধ্যমে মুসলমানদের সৃজনশীল মেধাকে নিঃশেষিত করার ঘৃণ্য বর্ণবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে। মার্কিন-ইসরাঈলী গুপ্তঘাতক স্কোয়াডের হাত থেকে মুসলিম বিজ্ঞানীদের রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? এ মুহূর্তে এটাই বড় প্রশ্ন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সহিষ্ণুতা, শান্তিপুর্ণ সহাবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রমাণ নেই। আফগানিস্তান ও ইরাক দখল তাদের আগ্রাসী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। গোয়ান্তানামো ঘাঁটিতে বীভৎস কায়দায় বন্দী নির্যাতন ও পবিত্র কুর‘আনের অবমাননা মার্কিনীদের চরম অসহিষ্ণু মনোবৃত্তির পরিচয় বহন করে। পাকিস্তান ও ইরানের সার্বভৌমত্ব যখন মার্কিন হুমকীর মুখে ঠিক এ মুহূর্তে ও.আই.সি এগিয়ে আসতে পারছে না আগ্রাসন প্রতিরোধের সংগ্রামে মুসলিম বিশ্বের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। এ কথা মনে রাখা দরকার সন্ত্রাসের মূল উৎস খুঁজে বের করে তা সমাধানের পথে অগ্রসর হলেই সন্ত্রাস বন্ধ হতে বাধ্য। হামলা ও আগ্রাসন সন্ত্রাসকে বহুমাত্রিকতায় বৃদ্ধি করবে। বুকে বোমা বেঁধে যারা প্রাণ দেয়, তাদের মনের দুঃখের খবর রাখে কে?

ইহূদীদের সর্বশেষ ষড়যন্ত্রের শিকার ড. আফিয়া সিদ্দিকা যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন স্নায়ু বিজ্ঞানী। অসামান্য ধীসম্পন্ন পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী এ মহিলার সম্মানসূচক অন্যান্য ডিগ্রী ও সার্টিফিকেট রয়েছে প্রায় ১৪৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে Neurology বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। আফিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নায়ু বিজ্ঞানে পড়ালেখা ও উচ্চতর গবেষণা করেন। তিনি হাফিযে কু র‘আন ও আলিমা। পবিত্র কুর‘আন ও হাদীসে পারদর্শিনী এ মহিলা ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেযগার। ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তাঁর স্ট্রং কমিটমেন্ট। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফ.বি.আই পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আল কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথিত অভিযোগে ২০০৩ সালে ড. আফিয়াকে তাঁর তিন সন্তান আহমদ, সুলায়মান, ও মরিয়মসহ করাচীর রাস্তা থেকে অপহরণ করে। পাকিস্তানের কোন কারাগারে না রেখে এবং পাকিস্তানী আদালতে উপস্থাপন না করে তাঁকে আফগানিস্তানের বাগরাম সামরিক ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা হয়। এরপর চলে তাঁর উপর অমানুষিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। বাগরামে কুখ্যাত মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, ‘নির্যাতনের সময় একজন নারী বন্দির আর্তচিৎকার অন্য বন্দিদের সহ্য করাও কষ্টকর ছিল। ওই নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে অন্য বন্দিরা অনশন পর্যন্ত করেছিল।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় নিউইয়র্কের এক গোপন কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরুষদের সাথে ওই কারাগারে বন্দী। কারাবন্দী নং ৬৫০। অব্যাহত নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। প্রথম থেকেই তিন সন্তানকে তাঁর থেকে পৃথক রাখা হয়। এখনো তিনি জানেন না তাঁর সন্তানত্রয় কোথায়? তারা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান দাবী করে বলেন তাঁর দু’সন্তান ইতোমধ্যে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আফগান কারাগারে অত্যাচারে মারা গেছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা ড. আফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

ড. আফিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর বক্তব্য হলো, তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা হাতব্যাগ তল্লাশী করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা সম্বলিত কাগজপত্র, গজনীর মানচিত্র, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরীর নিয়মাবলী ও রেডিওলজিক্যাল এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। ব্রিটেনের দি ইন্ডিপেন্টেডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রীধারী একজন পাকিস্তানী-আমেরিকান তাঁর হাত-ব্যাগে করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরছেন, এটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?

নিউইয়র্কে আদালতে ১২ সদস্যের জুরি বোর্ড নানা আইনি বিষয় পর্যালোচনা করে এবং সর্বসম্মতভাবে আফিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। হত্যা চেষ্টা ও লাঞ্ছিত করাসহ সাতটি অভিযোগে তাকে ২০ বছরের করাদণ্ড প্রদান করা হয়। গোপন কারাগারে তিন বছর তিনি বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। রায় ঘোষণার পর আফিয়া আদালতে চিৎকার করে বলেন, ‘আমেরিকা নয়, ইসরাইল থেকে এসেছে এ রায়।’ তিনি আগেই বলেছিলেন, কোনো ইহুদি বিচারক থাকলে তিনি (আফিয়া) ন্যায়বিচার পাবেন না। সরকারি আইনজীবীরা আদালতে বলেন, পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী বোমা তৈরির নির্দেশিকা বহন করেছিলেন। অতি সম্প্রতি নিউইয়র্কের একটি আদালত মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা চেষ্টার দায়ে ড. আফিয়া সিদ্দিকাকে ৮৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

ড. আফিয়া সিদ্দিকা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ২০০২ সাল পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকালে তাঁকে যারা চিনতেন তাদের সবাই বলেছেন, আফিয়া অত্যন্ত ভদ্র এবং ইসলামের প্রতি তার বিশেষ দরদ ছিল। ২০০৩ সালে করাচি থেকে তিন সন্তানসহ গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তাদের অপহরণ করে। এরপর আফগানিস্তানের বাগরাম কারাগারে গোপনে তাকে আটকে রাখা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তখন অনেক মাতামাতি হলেও ২০০৮ সালে গজনীতে ওই গুলির ঘটনার আগে গণমাধ্যমে আর তাঁর নাম শোনা যায়নি। নিউইয়র্কের আদালতে কেবল গজনীর ওই ঘটনারই বিচার হয়েছে। তাঁকে অপহরণ বা বাগরামে আটকে রাখা সংক্রান্ত অভিযোগের কোনো তদন্ত হয়নি। আফিয়া সিদ্দিকির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে বিভিন্ন সময়ে আল-কায়েদাকে অর্থায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হামলা পরিকল্পনার কথা বলে এসেছেন। তাঁর আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, আফিয়ার বিচার প্রক্রিয়ায় দ্বৈতনীতি অনুসরণ করেছে মার্কিন প্রশাসন।

ইহূদীদের ওফাদারীর ইতিহাস নেই। তারা মানবতার শত্রু, কুচক্রি, চুক্তি ভঙ্গকারী ও বিশ্বাসঘাতক। তাদের রক্তের কনায় কনায় ইসলাম বিদ্বেষ। ইহূদীরা অর্থ ও সুন্দরী ললনা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বশে আনতে পারঙ্গম। ইহূদীরা মুসলমানদের অতীতে কোনদিন আপন মনে করেনি, আগামী দিনেও করবে না। একমাত্র তাদের দলভুক্ত হলে ভিন্ন কথা। “হে মুমিনগণ! ইহুদী-খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অর্ন্তভূক্ত।” “আপনি (হে রাসূল!) সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরিকদের পাবেন।” পবিত্র কুর’আনের এ চরম হুশিয়ারী অবজ্ঞা করলে মুসলিম উম্মাহর উপর বিপদ অনিবার্য। মুসলমানদের ইহুদী প্রীতি আল্লাহ তা’য়ালার গযব ডেকে নিয়ে আসবে। #

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইহূদী রাষ্ট্র ইসরাঈল ‘মোসাদ’সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানী ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব হত্যার এক জঘন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবীর কোন মুসলিম রাষ্ট্র যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে- ইসরাঈল তার মিত্র দেশসমূহকে নিয়ে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। মুসলিম বিশ্বের কোন দেশে যদি বিস্ময়কর মেধার অধিকারী কোন বিজ্ঞানীর জন্ম হয় এবং তাঁর মেধা যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর কাজে ব্যবহৃত হয় তাহলে নির্ঘাত ইহূদী হিটলিস্টে তাঁর নাম অন্তর্ভূক্ত হবে। ঘাতক স্কোয়াড তাঁর পেছনে লেগে থাকবে এবং সুযোগ পেলে গুলি করে দেবে। ইহূদীরা মুসলমানদের পরমাণু অস্ত্র শুন্য করতে চায় অথচ ইসরাঈলের রয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্রের বহর। বিবিসি পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে ২২০০টি পারমাণবিক বোমা, যুক্তরাজ্যের আছে ১৬০টি, ফ্রান্সের আছে ৩০০টি, রাশিয়ার আছে ২৮০০টি আর চীনের আছে ১৮০টি (কালের কন্ঠ, ৭.০৩.২০১০, পৃ. ০৩)। উপর্যুক্ত দেশগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে আরো বহু দেশ আছে যাদের কাছে মজুদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র কিন্তু ইরানের থাকতে পারবে না। এটা কোন যুক্তি ? ইহূদী-খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকলে নিরাপদ অপর দিকে মুসলিম দেশের থাকলে তা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। এ ধরনের প্রচারণা গোয়েবলসীয় শয়তানী ছাড়া আর কী ?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক ছিল এক শক্তিশালী দেশ। ইরাকের সেনা সদস্যরা চৌকস। ইঙ্গ-মার্কিন-ইহুদি শক্তি টার্গেট করলো ইরাককে। দুর্ভাগ্য সাদ্দাম হোসেনের, যাদের প্ররোচণায় তিনি কুয়েতে অভিযান চালালেন, তাদের হাতেই কুরবানীর ঈদের দিন সকালে ফাঁসিতে ঝুলতে হলো তাঁকে। ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের নেপথ্য নায়কও তারা। ১০ বছরের এ যুদ্ধে কত লক্ষ মানুষের প্রাণ গেল, কত কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট হলো তার ইয়াত্তা নেই। কত মেধাবী ও প্রতিভাবান মানুষ অকালে ঝরে গেল তার হিসাব রাখে কে ? সব ষড়যন্ত্র। সব সাম্রাজ্যবাদী খেলা। মুসলমান রাজা-বাদশাহ ও স্বৈরশাসকগণ তাদের হাতের ক্রীড়নক। ক্ষমতার মসনদই তাদের শেষ কথা।

ইরাকের বিশাল সেনাবাহিনী যাতে ইসরাঈলের জন্য হুমকী সৃষ্টি না করে সে জন্য মিথ্যা অজুহাতে ইহূদী মিত্র মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র ২০০৩ সালে ১ লাখ ৭১ হাজার সৈন্য নিয়ে ইরাক দখল করে নেয়। বিদ্যুৎ তৈরীর উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পরমাণু সংক্রান্ত নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত আগ্রাসী সেনাবাহিনী তাদের নিজ দেশে পাচার করে। পারমাণবিক সব গবেষণা ও স্থাপনা বন্ধ ঘোষণা করে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী ইরাক থেকে বিদায় নিয়েছে ঠিক কিন্তু রেখে গেছে পৈশাচিকতার উন্মত্ত তান্ডব, বাতাসে রাসায়নিক মারণাস্ত্রের বিষক্রিয়া ও আগ্রাসনের দুঃসহ স্মৃতি। মার্কিন সশস্ত্র অভিযানে দেড় লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। বিধবা হয়েছেন ৭ লাখ ৪০ হাজার মা। মার্কিন হামলার পর ২০ লাখ ইরাকি যাদের মধ্যে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যসেবী সিরিয়া, জর্দানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে আশ্রয় নিয়েছে উদ্বাস্তু হিসেবে। শত্রুর নখর থাবায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক। লড়াই চলাকালীন দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অস্ত্রের মুখে লুট করে নিয়ে গেছে নগদ অর্থ, সোনা-দানা, বৈদেশিক মুদ্রা, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় রেকর্ড ফাইল, প্রত্মতাত্বিক সম্পদ ও পেট্রোল। ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় ইরাকের অবস্থান পঞ্চম। ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-কে কেন্দ্র করে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করেছে এবং নতুন আবিস্কৃত গোলা ও অস্ত্রের পরীক্ষাও করেছে ইরাকের মাটিতে। মার্কিন বাহিনীর নিক্ষিপ্ত বোমা ও ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষক্রিয়ায় বাতাস হয়ে গেছে বিষাক্ত। ইরাকে প্রতি এক হাজার প্রসবের ঘটনায় শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৮০। দেশটিতে ২০০৪ সালের তুলনায় লিউকেমিয়া বেড়েছে ৩৮ আর স্তন ক্যান্সার ১০ গুণ। মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধ শেষ হলেও সহিংসতা বন্ধ হয়নি।

ইরাক পরমাণু প্রকল্পের প্রধান ড. ইয়াহয়া আমীন আল মুশহিদ ১৯৮০ সালে প্যারিসে মোসাদ এজেন্টদের হাতে নিহত হন। ইরাকী পরমাণু রিয়েক্টর উন্নয়নের জন্য তিনি তখন ফ্রান্স কর্তৃপক্ষের সাথে প্যারিসে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যু ইরাকের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

লিবিয়ার পারমাণবিক স্থাপনার সব বৈজ্ঞানিক ম্যাটেরিয়াল মার্কিন সেনা সদস্যরা কার্গো জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যায়। বিনিময়ে স্বৈরশাসক গাদ্দাফী কিছু কাল (২০০৩-২০১১) ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা পায়। দালালি করেও ক্ষমতায় ঠিকে থাকা বেশী দিন সম্ভব হলো না গাদ্দাফীর। ৪২ বছরের দুঃসহ স্মৃতি লিবিয়ানদের বহন করতে হবে বহু কাল। এখন লিবিয়ার অয়েল ফিল্ডের নতুন মুরব্বি ন্যাটো। ২০০৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গাদ্দাফী আমেরিকা ও ব্রিটেনের ইহুদি লবির চাপে পারমাণবিক গবেষণা প্রকল্প পরিত্যাগ করার পরপরই আকাশ ও নৌপথে ক্যামিকাল, নিউক্লিয়ার ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র উপাদান আমেরিকায় পৌঁছতে থাকে। ২০০৩ সালে ২০০ ব্যালাস্টিক স্কাড-বি ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার উপযোগী ২ হাজার টন ইউরেনিয়াম ও রেডিওলজিক্যাল ম্যাটেরিয়াল আমেরিকা নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ঞবহহবংংবব স্টেট বিমান বন্দরে নিয়মিত ত্রিপোলি হতে রাসায়নিক অস্ত্র সামগ্রীবহনকারী কার্গো বিমান অবতরণ করতে থাকে। সর্বশেষ খবর হচ্ছে লিবিয়ার অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের যোগসাজশে মার্কিন যুক্তরাস্ট্র লিবিয়ার খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজনে গ্রেপ্তার এবং বিজ্ঞান গবেষণাগার খুঁজে বের করার জন্য ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করছে (এপি, ১৫.০৯.২০১১)। কেবল ত্রিপোলির বাইরে তাজুরা নামক স্থানে স্থাপিত পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে ৭৫০জন বিজ্ঞানী কাজ করতেন। তাদের বর্তমান অবস্থান অনেকটা অজ্ঞাত।

সোয়াত উপত্যকায় শরী‘য়া চালুকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র পাকিস্তানের কাহুটা পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা করছে। তালিবান গেরিলারা যে কোন সময় পারমাণবিক স্থাপনা দখল করে নিতে পারে, আমেরিকা প্রতিনিয়ত এ আশংকা প্রকাশ করে একটি অজুহাত খাড়া করতে চাচ্ছে। তালেবান যোদ্ধাদের নাগালের বাইরে রয়েছে তাদের পরমাণু অস্ত্র। পাকিস্তান বারবার আশ্বস্ত করলেও ওয়াশিংটন বলছে ‘পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তা এখনো সমূহ বিপদের মুখোমুখি’। যুক্তরাষ্ট্র্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল জেমস জোনস বিবিসি-এর সাথে সাক্ষাতকারে বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী যতই বলুক, তাদের পরমাণু অস্ত্র নিরাপদে আছে। এতদসত্ত্বেও ওয়াশিংটন আরো নিশ্চয়তার প্রয়োজন আছে বলে মনে করে’। এ ভাবে তালেবান হুমকির প্রসঙ্গ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক স্থাপনা পাহারাদারী করার জন্য পাকিস্তানকে বাধ্য করবে। ফলে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে আমেরিকর নির্দেশে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের জনক ড. আব্দুল কদীর খানকে গৃহবন্দী রাখা হয়। তাঁকে সি.আই.এ-এর কাছে হস্তান্তরের জন্য আমেরিকা জোর দাবী জানায়। জনরোষের ভয়ে মোশাররফ সরকার এ দাবী মানতে পারেনি।

রহস্যজনক “US Contingency Plan” অনুসারে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থাত আল কায়দা বা তালেবান জঙ্গিরা যদি পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রকল্প দখলে নেয়ার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হলে পেন্টাগন পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই পাকিস্তানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক পরিকল্পনা করেছে। পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার সাইট বিশেষ করে বৃহত্তর ‘খুনাব রিঅ্যাক্টর এবং নিউ ল্যাব প্রসেসিং প্লান্ট’ বোমা মেরে ধ্বংসকরণের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিনিদের (আমার দেশ ০১.১০.২০১১, পৃ. ০৭)।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হোক- এটা ইসরাঈল কোন দিন চায়নি। ইহুদী লবি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বুশের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে ইরানে হামলা পরিচালনার জন্য কিন্তু আফগানিস্তান ও ইরাক সংকটের পাশপাশি আরেকটি সংকট তৈরী হোক বুশ সে ঝুঁকি নিতে চাননি। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও অর্থহানি হয়েছে। মার্কিন সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় খোদ ইসরাঈল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাহস করে নি। তবে যে কোন মুহূর্তে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাসমূহ ইসরাঈলের টার্গেট হতে পারে।

সরাসরি হামলা করতে না পেরে ইসরাঈল গুপ্ত হত্যার আশ্রয় নিয়ে মুসলিম বিশ্বকে মেধাশূণ্য করার ষড়যন্ত্রে নেমেছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে ইরানের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী আরদাশীর হাসান বাউর মোসাদ এজেন্টদের হাতে প্রাণ হারান। আরদাশীর হাসান ইস্পাহানে অবস্থিত পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পরমাণু গবেষণার অন্যতম পাদপীঠ সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ষ্টাডিজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘দি সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় যে, ইরানের শীর্ষস্থানীয় আরো বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ইসরাঈলীদের হত্যার তালিকায় রয়েছে।

‘হামাস’ এ প্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনের আধ্যাত্মিক গুরু অশীতিপর বৃদ্ধ শেখ আহমদ ইয়াছিন(৭৫)ফজরের নামায আদায় করে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ইসরাঈলী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শাহাদত বরণ করেন ২০০৪ সালের ২২ মার্চ। বহু দিন ইসরাঈলী কারাগারে বন্দি শেখ আহমদ ইয়াছিন হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন। ১২ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেলে তিনি হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন। নানা জটিল রোগের কারণে তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এমন অসুস্থ মানুষটিকে হত্যা করা যে কত বর্বরোচিত ও পৈশাচিক, সচেতন মানুষ মাত্রই তা বুঝেন। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পেছনেও মোসাদ-এর হাত ছিল বলে অনেকের সন্দেহ। সাইপ্রাসে নিযুক্ত জর্দানী বংশোদ্ভুত আল-ফাতাহ প্রতিনিধি হোসাইন আল বশির ১৯৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারী মোসাদ এজেন্টদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। নিকোশিয়ায় তাঁর হোটেল কক্ষে রক্ষিত বোমার বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ১৯৭২ সালের ২ ডিসেম্বর প্যারিসে নিযুক্ত পিএলও প্রতিনিধি ড. মুহাম্মদ হামশারী’কে মোসাদ হত্যা করে তাঁর অফিসের টেলিফোন টেবিলে টাইম বোমা পুঁতে।

আরব বিশ্বের খ্যাতনামা সব বিজ্ঞানীর কর্মপ্রয়াসের উপর রয়েছে ইসরাঈলের কড়া গোয়েন্দা নজরদারী। মিশরীয় পরমাণু বিজ্ঞানী ড. সামীরা মূসা ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অজ্ঞাত পরিচয় এক ড্রাইভার তাঁর গাড়ী চালাচ্ছিল। ইসরাঈল কর্তৃক পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার মজুদ করার কারণে যে কোন সময় মধ্য প্রাচ্যে জুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, ড. সামীরা এমন আশংকা প্রকাশ করতেন বলে ইসরাঈল তাঁকে অপছন্দ করতো। এ ছাড়া তিনি পরমাণু প্রকল্পের জন্য ইউরেনিয়ামের তুলনায় ধাতব পদার্থ হতে আরো সাশ্রয়ী জ্বালানী উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। ১৯৬৭ সালে মিশরের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আমীর নাজীব গুপ্তঘাতকের হাতে ডেট্রয়টে নিহত হন। সামরিক অভিযানে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারে তিনি বেশ কয়েকটি সফল পরীক্ষা পরিচালনা করেন।

১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে অজ্ঞাতামা আততায়ী মিশরীয় বিজ্ঞানী সাঈদ আল বুদায়েরকে তাঁর আলেকজান্দ্রিয়াস্থ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করে। মাইক্রোওয়েভ ফিল্ডে তিনি বেশ কয়েকটি অগ্রবর্তী থিউরী উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। এসব হত্যাকান্ড মুসলমানদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত রাখার যায়নবাদী কৌশলের অংশ বিশেষ মাত্র। ইসরাঈল ছাড়া যেন আর কারও হাতে পরমাণু অস্ত্র না থাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যেন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরী না হয়, এটাই ইহূদীদের টার্গেট। সামরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে ইসরাঈলের হাতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ৩০০টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) ১৮৯টি রাস্ট্র স্বাক্ষর করলেও আজ পর্যন্ত ইসরাঈল এ চুক্তি মেনে নেয়নি। ইসরাঈলকে এনপিটি’তে যোগ দেয়ার জন্য কিংবা তার কাছে থাকা পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনরূপ কার্যকর চাপ প্রয়োগ করেনি। মার্কিন নেতাদের এ ‘ডাবল স্টান্ডার্ড’ পলিসি বিশ্বে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

আরব গোয়েন্দাদের হাতে মধ্যপ্রাচ্যে কোন ইহূদী বিজ্ঞানী মারা গেলে গোটা দুনিয়া জুড়ে কী তুলকালাম কান্ড ঘটতো আমরা কী তা কল্পনা করতে পারি? খোদ আরবদেশের রাজা-বাদশাহগণও এটাকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলে চিৎকার দিয়ে উঠতেন। পশ্চিমা বিশ্ব এ ভাবে ইহূদীদের মাধ্যমে মুসলমানদের সৃজনশীল মেধাকে নিঃশেষিত করার ঘৃণ্য বর্ণবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে। মার্কিন-ইসরাঈলী গুপ্তঘাতক স্কোয়াডের হাত থেকে মুসলিম বিজ্ঞানীদের রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? এ মুহূর্তে এটাই বড় প্রশ্ন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সহিষ্ণুতা, শান্তিপুর্ণ সহাবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রমাণ নেই। আফগানিস্তান ও ইরাক দখল তাদের আগ্রাসী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। গোয়ান্তানামো ঘাঁটিতে বীভৎস কায়দায় বন্দী নির্যাতন ও পবিত্র কুর‘আনের অবমাননা মার্কিনীদের চরম অসহিষ্ণু মনোবৃত্তির পরিচয় বহন করে। পাকিস্তান ও ইরানের সার্বভৌমত্ব যখন মার্কিন হুমকীর মুখে ঠিক এ মুহূর্তে ও.আই.সি এগিয়ে আসতে পারছে না আগ্রাসন প্রতিরোধের সংগ্রামে মুসলিম বিশ্বের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। এ কথা মনে রাখা দরকার সন্ত্রাসের মূল উৎস খুঁজে বের করে তা সমাধানের পথে অগ্রসর হলেই সন্ত্রাস বন্ধ হতে বাধ্য। হামলা ও আগ্রাসন সন্ত্রাসকে বহুমাত্রিকতায় বৃদ্ধি করবে। বুকে বোমা বেঁধে যারা প্রাণ দেয়, তাদের মনের দুঃখের খবর রাখে কে?

ইহূদীদের সর্বশেষ ষড়যন্ত্রের শিকার ড. আফিয়া সিদ্দিকা যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন স্নায়ু বিজ্ঞানী। অসামান্য ধীসম্পন্ন পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী এ মহিলার সম্মানসূচক অন্যান্য ডিগ্রী ও সার্টিফিকেট রয়েছে প্রায় ১৪৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে Neurology বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। আফিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নায়ু বিজ্ঞানে পড়ালেখা ও উচ্চতর গবেষণা করেন। তিনি হাফিযে কু র‘আন ও আলিমা। পবিত্র কুর‘আন ও হাদীসে পারদর্শিনী এ মহিলা ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেযগার। ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তাঁর স্ট্রং কমিটমেন্ট। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফ.বি.আই পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আল কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথিত অভিযোগে ২০০৩ সালে ড. আফিয়াকে তাঁর তিন সন্তান আহমদ, সুলায়মান, ও মরিয়মসহ করাচীর রাস্তা থেকে অপহরণ করে। পাকিস্তানের কোন কারাগারে না রেখে এবং পাকিস্তানী আদালতে উপস্থাপন না করে তাঁকে আফগানিস্তানের বাগরাম সামরিক ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা হয়। এরপর চলে তাঁর উপর অমানুষিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। বাগরামে কুখ্যাত মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, ‘নির্যাতনের সময় একজন নারী বন্দির আর্তচিৎকার অন্য বন্দিদের সহ্য করাও কষ্টকর ছিল। ওই নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে অন্য বন্দিরা অনশন পর্যন্ত করেছিল।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় নিউইয়র্কের এক গোপন কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরুষদের সাথে ওই কারাগারে বন্দী। কারাবন্দী নং ৬৫০। অব্যাহত নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। প্রথম থেকেই তিন সন্তানকে তাঁর থেকে পৃথক রাখা হয়। এখনো তিনি জানেন না তাঁর সন্তানত্রয় কোথায়? তারা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান দাবী করে বলেন তাঁর দু’সন্তান ইতোমধ্যে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আফগান কারাগারে অত্যাচারে মারা গেছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা ড. আফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

ড. আফিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর বক্তব্য হলো, তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা হাতব্যাগ তল্লাশী করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা সম্বলিত কাগজপত্র, গজনীর মানচিত্র, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরীর নিয়মাবলী ও রেডিওলজিক্যাল এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। ব্রিটেনের দি ইন্ডিপেন্টেডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রীধারী একজন পাকিস্তানী-আমেরিকান তাঁর হাত-ব্যাগে করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরছেন, এটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?

নিউইয়র্কে আদালতে ১২ সদস্যের জুরি বোর্ড নানা আইনি বিষয় পর্যালোচনা করে এবং সর্বসম্মতভাবে আফিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। হত্যা চেষ্টা ও লাঞ্ছিত করাসহ সাতটি অভিযোগে তাকে ২০ বছরের করাদণ্ড প্রদান করা হয়। গোপন কারাগারে তিন বছর তিনি বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। রায় ঘোষণার পর আফিয়া আদালতে চিৎকার করে বলেন, ‘আমেরিকা নয়, ইসরাইল থেকে এসেছে এ রায়।’ তিনি আগেই বলেছিলেন, কোনো ইহুদি বিচারক থাকলে তিনি (আফিয়া) ন্যায়বিচার পাবেন না। সরকারি আইনজীবীরা আদালতে বলেন, পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী বোমা তৈরির নির্দেশিকা বহন করেছিলেন। অতি সম্প্রতি নিউইয়র্কের একটি আদালত মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা চেষ্টার দায়ে ড. আফিয়া সিদ্দিকাকে ৮৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

ড. আফিয়া সিদ্দিকা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ২০০২ সাল পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকালে তাঁকে যারা চিনতেন তাদের সবাই বলেছেন, আফিয়া অত্যন্ত ভদ্র এবং ইসলামের প্রতি তার বিশেষ দরদ ছিল। ২০০৩ সালে করাচি থেকে তিন সন্তানসহ গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তাদের অপহরণ করে। এরপর আফগানিস্তানের বাগরাম কারাগারে গোপনে তাকে আটকে রাখা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তখন অনেক মাতামাতি হলেও ২০০৮ সালে গজনীতে ওই গুলির ঘটনার আগে গণমাধ্যমে আর তাঁর নাম শোনা যায়নি। নিউইয়র্কের আদালতে কেবল গজনীর ওই ঘটনারই বিচার হয়েছে। তাঁকে অপহরণ বা বাগরামে আটকে রাখা সংক্রান্ত অভিযোগের কোনো তদন্ত হয়নি। আফিয়া সিদ্দিকির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে বিভিন্ন সময়ে আল-কায়েদাকে অর্থায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হামলা পরিকল্পনার কথা বলে এসেছেন। তাঁর আইনজীবী অভিযোগ করেছেন, আফিয়ার বিচার প্রক্রিয়ায় দ্বৈতনীতি অনুসরণ করেছে মার্কিন প্রশাসন।
ইহূদীদের ওফাদারীর ইতিহাস নেই। তারা মানবতার শত্রু, কুচক্রি, চুক্তি ভঙ্গকারী ও বিশ্বাসঘাতক। তাদের রক্তের কনায় কনায় ইসলাম বিদ্বেষ। ইহূদীরা অর্থ ও সুন্দরী ললনা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বশে আনতে পারঙ্গম। ইহূদীরা মুসলমানদের অতীতে কোনদিন আপন মনে করেনি, আগামী দিনেও করবে না। একমাত্র তাদের দলভুক্ত হলে ভিন্ন কথা। “হে মুমিনগণ! ইহুদী-খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অর্ন্তভূক্ত।” “আপনি (হে রাসূল!) সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরিকদের পাবেন।” পবিত্র কুর’আনের এ চরম হুশিয়ারী অবজ্ঞা করলে মুসলিম উম্মাহর উপর বিপদ অনিবার্য। মুসলমানদের ইহুদী প্রীতি আল্লাহ তা’য়ালার গযব ডেকে নিয়ে আসবে।