ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

অবশেষে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র রাজনীতির বলি হয়ে অকালে নিভে গেল আরেকটি তাজা প্রাণ। ডেন্টাল তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবিদুর রহমান প্রতিপক্ষের কর্মীদের বেদম পিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম স্থগিত করার পাশাপাশি কলেজ ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জিঘাংসার রাজনীতি আরো কতজনের প্রাণ কেড়ে নেয় কে জানে ?

ছাত্ররাজনীতি আমাদের জন্য আদৌ প্রাসঙ্গিক কিনা এটা তর্ক সাপেক্ষ। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতের জাতীয় নেতা তৈরির জন্য ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সহজেই ওই চিন্তার অপ্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করা সম্ভব। পৃথিবীর বহু প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ ছাত্রজীবনে রাজনীতির সাথে বিযুক্ত ছিলেন না। আমাদের দেশের বহু রাজনীতিবিদের ছাত্ররাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ৭১ এর মুক্তি সংগ্রাম ৯০ এর এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে এ দেশের ছাত্র সমাজের উজ্জ্বল অবদান রয়েছে। তবে তাঁদের অতীতের সে আদর্শবাদী ছাত্ররাজনীতির আদর্শবোধ ও ঐতিহ্য এখন আর অবশিষ্ট নেই। ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্য থাকবে কিন্তু ছাত্ররাজনীতির কলুষ আবর্ত থেকে নিজকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছাত্র রাজনীতি এক সময় ছিল শ্রদ্ধা ও সম্মানের প্রতীক, এখন তা হয়েছে বানিজ্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এটা এখন অপ্রয়োজনীয়, নিন্দনীয় ও গর্হিত ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ২০০৮ সালের ৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ পূণর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে যে কথা বলেছিলেন তা যদি গভীর বিবেচনায় নিয়ে এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম, তা হলে ক্যাম্পাসে আর রক্ত ঝরতো না। তিনি বলেন, “লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে কিনা তা পূনর্বিবেচনা করতে হবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অছাত্ররাই ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। দেশের এই দুর্গতির জন্য লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি অনেকটা দায়ী। একজন ছাত্র যখন প্রতিমন্ত্রী হয়ে যায় তখন বুঝতে হবে দেশের কোথাও না কোথাও বিপর্যয় হয়েছে। স্বাধীনতার আগে মেধাবীরা ছাত্র রাজনীতি করেছে। তাদের আন্দোলনের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির সে পূরনো ঐতিহ্য এখন নেই।”

আমাদের বড় বড় রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় স্বার্থে ও ক্ষমতার মোহে ছাত্রদের রাজনীতিতে ব্যবহার করে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। ফলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মিনি ক্যান্টনমেন্টে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত; লজ্জাজনক সেশনজট লেগেই আছে; যে কোন মুহূর্তে আপন সন্তান লাশ হয়ে ঘরে ফেরার অজানা আশংকায় অভিভাবকরা প্রহর গুণেন। কত মেধাবী ছাত্র অকালে ঝরে পড়েছে তার হিসাব রাখে কে? ছাত্র রাজনীতি আমাদের যা দিয়েছে, নিয়েছে তার শতগুণ। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার মেধাবী ছাত্র আবু বকরের লাশ পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। মৃত্যুর পর তার পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায় তিনি প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। বেঁচে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা সরকারী উচ্চপদস্থ অফিসার হতে পারতেন তিনি। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বাদ দিলেও কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতিতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৭৪জন ছাত্র। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কোন না কোন ছাত্র সংগঠনের দখলে। ভর্তি বানিজ্য, সীট দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এখন লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতির স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল আরেক দলের সঙ্গে অথবা একই দলের দু’গ্রুপের মধ্যে যেভাবে সশস্ত্র সংঘর্ষ হয় এবং যে ভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র, দা, চাইনিজ কুড়াল, কাটা রাইফেল, চাপাতি নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর হামলে পড়ে, সে দৃশ্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করে। চিহ্নিত ক্রিমিনালদের লালন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বেশি সংখ্যায় ক্রিমিনালদের সংগঠনে রাখতেই হবে। নিরীহ ছাত্রদের ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোন উন্নত দেশেতো নেই, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও নেই। কংগ্রেস, বিজেপি, ও সি. পি. এম এর মত দলের নেতারা ছাত্রদের রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহারকে রীতিমত পাপ ও গর্হিত কাজ মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, অষ্ট্রেলিয়া, জাপানসহ পৃথিবীর বহু দেশে কোন সেশনজট নেই। নির্দিষ্ট সময়ে সেমিষ্টার শেষ করা বাধ্যতামুলক। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁদের ছেলে মেয়েদের বিদেশী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান যাতে দুলাল-দুলালীরা নিরাপদে থাকতে পারে। হত দরিদ্র, প্রান্তিক কৃষক, ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা দলীয় রাজনীতির বলি, কারণ তাদের পক্ষে বিদেশে গিয়ে পড়া লেখা করা সম্ভব নয়। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার নিরবচ্ছিন্ন কেন্দ্র। তাঁরা মেধাবীরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতেন ও যোগ দেওয়ার সুযোগ পেতেন। এ ঐতিহ্য এখন আর নেই। এখন সব ধরণের নিয়োগ হয় দলীয় বিবেচনায়। ডীন, ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রভোস্ট নিয়োগে শিক্ষকদের ভোটের প্রভাব আছে। তাই শিক্ষক নিয়োগের চাইতে ভোটার নিয়োগের প্রয়াস প্রাধান্য পায়। দল নিরপেক্ষ অথবা প্রতিপক্ষ দলের সাথে সম্পৃক্ত ছাত্র-ছাত্রীকে ফার্ষ্ট ক্লাস না দিয়ে নিজের দলের ক্যান্ডিডেইডকে ফার্ষ্ট ক্লাস দেওয়ার নজীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুরি ভুরি। এভাবে ফার্ষ্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্ররাই দলীয় ছত্র ছায়ার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে। এ অবস্থা বেশী দিন চলতে দেয়া যায় না। এ কলংকজনক প্র্যাকটিস বন্ধ করতে হবে। সরকার বা বিরোধীদল ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে কারণ তাদেরকে দলীয় স্বার্থে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যবহার করতে হবে। ক্ষমতায় আরোহনের সিঁড়ি হচ্ছে তাঁদের কাছে ছাত্র রাজনীতি।

আমাদের সবার মনে রাখা দরকার যে, দেশের ছাত্র জনগোষ্ঠী আমাদের সন্তান, ভাই ও আপনজন। তাদের জীবন নিয়ে আমরা ছিনিমিনি খেলতে পারি না। মানব জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সময় ছাত্রজীবন। জ্ঞানার্জনের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ছাড়া ছাত্রজীবন অর্থহীন। অর্জিত জ্ঞানের আলো নিয়েই তাকে সুখী সমৃদ্ধশালী সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে হবে। একজন ছাত্র ভবিষ্যত জীবনে কি ধরনের ব্যক্তি রূপে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার প্রস্তুতির উপর। আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তোলার সাধনা চলে ছাত্রজীবনে। অধ্যয়ন ও নিয়মানুবর্তিতা ছাত্র জীবনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। রীতিমত অধ্যয়ন, সৎগুণাবলী অর্জন ও কর্তব্যনিষ্ঠা ছাড়া মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না। তাই আমাদের উচিৎ ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নেয়া এবং অধ্যয়নে মনোযোগী করা।