ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

কুতুব মিনার দিল্লী শহর থেকে ১৪ কিলো মিটার দক্ষিণে অবস্থিত একটি বিজয়স্তম্ভ। এটি মুসলমানদের ভারত বিজয়ের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাত শ বছর ধরে। সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির সেনাপতি ও প্রতিনিধি কুতুব-উদ-দিন আইবেক ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে চৌহান রাজা পৃথ্বিরাজকে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করেন। এ বিজয়ের অব্যাবহিত পরে তিনি দিল্লী অধিকার করে কুওয়াতুল ইসলাম নামে একটি মসজিদ এবং এর সংলগ্ন একটি মিনার নির্মাণ করেন। এ মিনারটি ভারতবর্ষের মুসলিম ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত কুতুব মিনার ভারত বর্ষের সর্বোচ্চ টাওয়ার। এর উচ্চতা ৭২.৫ মিটার। মিনারের অভ্যন্তরে উপরে উঠার সিঁড়ি রয়েছে ৩৭৯ টি। নিচের দিকে মিনারের আয়তন ১৪.৩ মিটার এবং উপর দিকে ব্যাস ২.৭৫ মিটার।

ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুতুব মিনার এবং এর কমপ্লেক্সে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভবন ও সৌধগুলো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ইউনেস্কো-এর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কুতুব মিনার কমপ্লেক্স তালিকাভুক্ত। কুতুব মিনার দিল্লীর পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান। ২০০৬ সালে দেশ-বিদেশের ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ কুতুব মিনার পরিদর্শন করেন অপরদিকে একই সময়ে তাজমহল পরিদর্শন করেন ২ কোটি ৫০ লাখ পর্যটক। মুসলিম ও হিন্দু স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে কুতুব মিনারের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

আফগানিস্তানের জাম মিনার এর অনুকরণে এটি নির্মিত হয়। পাঁচ তলা বিশিষ্ট মিনারের প্রতিটি তলায় রয়েছে ব্যালকনি বা ঝুলন্ত বারান্দা। কুতুব মিনারের নামকরণের পেছনে দুটি অভিমত রয়েছে, প্রথমত এর নির্মাতা কুতুব উদ্দিন আইবেকের নামানুসারে এর নামকরণ। দ্বিতীয়ত ট্রান্সঅক্সিয়ানা হতে আগত বিখ্যাত সুফী সাধক হযরত কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার্থে এটি নির্মিত হয়।

কুতুব মিনারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মনোরম একটি কমপ্লেক্স। ১০০ একর জমির উপর স্থাপিত এ কমপ্লেক্সে রয়েছে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, আলাই মিনার, আলাই গেট, সুলতান ইলতুৎমিশ, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দিন খলজী ও ইমাম জামিনের সমাধি ও লৌহ পিলার। লোহিত বেলে পাথর দিয়ে তৈরি কুতুব মিনারের গাত্রে আকর্ষণীয় ক্যালিওগ্রাফীতে উৎকীর্ণ রয়েছে পবিত্র কুরআনের আয়াত। এছাড়া মিনারের প্রাচীর গাত্র নানা প্রকারের অলঙ্করণ দ্বারা শোভিত। ভারত বর্ষের প্রথম মুসলিম শাসক ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেক কুতুব মিনারের গোড়া পত্তন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১ম ও ২য় তলা নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে (১২১১-৩৬) সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মিনারের ৩য় ও ৪র্থ তলা এবং শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে ৫ম তলা নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ঐতিহাসিকদের অভিমত হচ্ছে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ-এর মুসল্লিদের সুবিধার্থে আযান দেওয়ার জন্য কুতুব মিনার ব্যবহৃত হতো। ১ম তলা হতে আযান দেয়া হতো নিয়মিত। সর্বাধিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এটাকে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহারের উপযোগিতা লক্ষণীয়।

ভূ কম্পনের কারণে কুতুব মিনার বেশ কবার বিধ্বস্ত হলেও মুসলিম শাসকবর্গ পুন নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিতে বিলম্ব করেননি। ১৫০৫ সালে উপরের ২টি তলা ভূ কম্পণের কারণে বিধ্বস্ত হলে সুলতান ইলতুৎমিশ পুননির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৭৯৪ সালে ভূমিকম্পের ফলে এর কিয়দাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হলে সুলতান সিকান্দর লোদী এর সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। প্রতি বছর দিল্লী পর্যটন কর্তৃপক্ষ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কুতুব কমপ্লেক্সে ৩ দিন ব্যাপী উৎসবের আয়োজন করে থাকে। রাত্রিবেলা বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানিতে কুতুব মিনার কমপ্লেক্স ধারণ করে দীপ্তিময় ও বর্ণিল রূপ। সাত শ বছরের ব্যবধানে কুতুব মিনার এর স্থাপত্যশৈলী ও ঔজ্জ্বল্য একটুও ম্লান হয়নি। ভারত সফরকারী পর্যটকগণ কুতুব মিনার পরিদর্শন করবেন না এমনটি হতে পারে না।

সূত্র : ১. Wikipedia/Qutub Minar,
২. Dr. Iswari Prasad, Medieval History of India,
৩. ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস