ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কেওক্রাডং'র চূড়ায় আমরা
অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম পাহাড়ে যাব, পাহাড় বলতে গাড়ি দিয়ে আরাম আয়েশে চলে যাওয়া কোন পাহাড় নয়, সেই পাহাড় যেখান উঠতে হয় সত্যিকারভাবে, যেখানটায় মেঘ খুব কাছে চলে আসে, আকাশ খুব আপন হয়ে উঠে । সবচেয়ে বড়কথা যেখানে পাহাড়ের মানুষদের জীবন যাপন দেখা যাবে , মেশা যাবে , থাকা যাবে ওদের মতো করে।

২০১০ এর অক্টোবরে যেবার বান্দরবান গিয়েছিলাম সেবার নামে মাত্রই পাহাড় দেখা হয়েছিলো। নীলগিরি, নীলাচল এসব জায়গায় গাড়ি নিয়েই যাওয়া যায় , বান্দরবান শহরে থেকে তেমন করে পাহাড়ের সংস্কৃতি বোঝারও সুযোগ নেই। সেবারই মনে মনে ঠিক করি – পাহাড়কে সময় নিয়ে দেখতে আসব একবার। যাবো বগা লেক, কেওক্রাডং । ভাবনার বাস্তবায়ন হলো ঠিক দুই বছর পরে। এই অক্টোবরে । অক্টোবর ২২ থেকে ২৫, ২০১২- পাহাড়ে কাটানো সময়গুলো লিখে রাখছি বৃদ্ধবয়সে স্মৃতিচারণের সুবিধার্থে ।

ছুটে চলে মানব ট্রেন
যাত্রা শুরু
২২-অক্টোবর

শুরুতে অনেকের যাওয়ার কথা থাকলেও , নানান সমস্যায় এবং কেওক্রাডং ট্র্যাকিং করার কথা শুনেও ফিটনেসের ভয়ে হয়ত কেউ কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেন । শেষ পর্যন্ত বিনয় ভদ্র, রাজিব রাসেল, রাজিব চৌধুরি, কাজি ওহিদ, ফাহিম, সৃজিতা মিতু, পিয়াল পিউ, তমা রেখা , জেনিফার আফছানা স্টেফি , মেসবাহ সোহেল, সুজন আর আমি –এই মোট ১২ জন , ২২ তারিখ সকালে চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবানের বাসে উঠি । প্রথম দিনের উদ্দেশ্য – বগা লেকে সিয়াম দির কটেজে পৌছানো । যাত্রা পথে রুমা বাজারে অপেক্ষা করছেন আমাদের গাইড বেলাল ভাই। যিনি ভ্রমনের পুরোটা সময় দুর্গোম পাহাড়ি পথে আমাদের একমাত্র ভরসা।
২২ তারিখ সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে বান্দরবান শহরে পৌছে যাওয়ায় বোনাস হিসেবে স্বর্ণ মন্দির দেখা হয়ে যায় , ২০১০ এ একবার স্বর্ণ মন্দির এসেছিলাম ,সেবারের মতো এবারও আমাদের কয়েকজনের পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট থাকায় চাদর পেছিয়ে উদ্ভট পোশাকে দর্শন করি দেশের অন্যতম আর্কিটেকচারাল বিউটি – স্বর্ন মন্দির । থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে ঢুকলেই যে গৌতম বুদ্ধকে অসম্মান করা হয় না এটা ভিক্ষুদের কে বোঝাবে?
স্বর্ন মন্দির দেখা শেষে টুকটাক নাস্তা সেরে চাঁদের গাড়িতে করে রওয়ানা হই- কৈক্ষাংঝিরি পথে । যেখান থেকে সাঙ্গু নদী দিয়ে ট্রলারে করে আমরা যাব রুমা বাজার । চাঁদের গাড়িতে উঠেই উঁচু নিচু পাহাড়ি পথের সৌন্দর্যে মগ্ন সবাই হৈ হল্লা করতে করতে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌছে যাই কৈক্ষাংঝিরি, তারপর ট্রলারে আরও ১ ঘন্টায় রুমা বাজার পৌছে দুপুরের খাবারের জন্য সবার আকুতি টের পাই, ইতিমধ্যে অবশ্য বেলাল ভাই জয়েন করেছেন । খাওয়াদাওয়ার সময় বগা লেকে আমাদের আশ্রয় সিয়াম দি’র সাথেও দেখা হয়ে যায় , তিনি তাড়া দিতে থাকেন ৪টার মধ্যেই নাকি বগা লেক পৌছাতে হবে , আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্টিং আছে , এর বেশি দেরি করলে ঢুকা যাবেনা । কিন্তু আমাদের খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমা বাজার ক্যাম্পে রিপোর্ট করে চাঁদের গাড়িতে উঠতেই ৪টা বেজে যায় , রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্টে শেষ করে বাজার পেরিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতেও রিপোর্ট করতে হয় , এই সময় এসে ব্যাপারটা খুবই বিরক্তকর লাগে তবে এই বাইরে যাওয়ার তো উপায় নেই। বগা লেক যাওয়ার আগে ২বার এবং বগা লেকে ১বার সর্বমোট ৩বার নাম, ঠিকানা সহ রিপোর্ট করতে হয়েছে ।

যাইহোক বগা লেকের পথে শেষ পর্যন্ত আমাদের চাঁদের গাড়ি ছুটে চলা শুরু করে, পথে মারমা পাড়া থেকে বিনয় ভদ্র পাহাড়ি অমৃত পানীয় কিনে নিতে মোটেও ভুল করেননি । যেতে যেতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়, ১১ মাইল নামক জায়গায় গিয়ে চাঁদের গাড়ির একসেস শেষ হয়ে গেলে পাহাড়ে প্রথমবারের মতো হন্ঠন শুরু হয় আমাদের । বেলাল ভাই ও তাঁর সহযোগি জাহিদসহ আমরা ১৪ জন রাস্তা থেকে ১৪টি লাঠি কুড়িয়ে নিয়ে পাহাড় বাওয়া শুরু করি , উঠতে হবে ঘন্টাখানেক – রাতের বেলা আমাদের মত সমতলের মানুষের জন্য যা অনেকটাই সংকটময় , যদিও চাঁদের আলোয় ভয় আর সৌন্দর্যে মেলামেশা করতে ঠিকঠাক উঠতে পেরেছিলাম । রাত ৮টা নাগাদ বগা লেক পৌছানোয় ওইদিন আর আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করা হয়নি । ঠিক হয় সকালে রিপোর্ট হবে। বেলাল ভাইয়ের তৎপরতায় এ নিয়ে আর কোন ঝামেলাও হয় নি।

বগা লেক

বগা লেক-

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ বা লেক। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই লেক । রাতে ওখানে পৌছেই সবাই – লেকের সচ্ছ জলে গা ভিজিয়ে ক্লান্ত দেহকে সতেজ করতে লেগে যান । সিয়াম দির কটেজে আমাদের থাকার জায়গা এর মধ্যে প্রস্তুত, প্রাস্তুত রাতের খাবারও । মুরগি, ডাল ও মিষ্টি কুমড়োর স্বাদ নিয়ে সবাই ম্যারাথন আড্ডা আর পাহাড়ের অমৃত সুধা পান করতে বসে যাই, উম্মাথাল রাত্রী কেটে যায় বাঁধনহীন আনন্দ উল্লাস , মজার বিড়ম্বরা আর হাস্যরসে ।

২৩ অক্টোবর; কেওক্রাডং এর পথ ধরে

রাতে ঘুমাতে দেরি হলেও প্রায় সবারই খুব সকালেই ঘুম ভেঙ্গে যায়, পাহাড়ের সতেজ বাতাস বোধহয় শরীর মনের ক্লান্তি টের পেতে দেয় না। সকালের নাস্তা সেরে সবাই বেরিয়ে পড়ি , আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্টিং করে সোজা কেওক্রাডং’র পথে আমাদের হাঁটা শুরু হয় । যাওয়ার পথে আমরা দেখব কাঁকড়া ঝর্না আর চিংড়ি ঝর্না । এই দুইটা ঝর্নার নাম দিয়েছেন আমাদের গাইড বেলাল ভাই। এমনিতে প্রায় সকলেরই সমতলে প্রচুর হাঁটার অভ্যাস থাকলেও পাহাড় পেরোবার এই প্রচন্ড স্পর্ধ্বা কেউ দেখায় নি এই অবধি। এই প্রথম , আর প্রথম বলেই সবার মনে কাজ করছিলো উত্তেজনা , পাহাড় দেখার সীমাহীন আগ্রহ এবং অবশ্যই কিছুটা হলেও ভয় । বগা লেক থেকে হাঁটা শুরু করে আমরা সাইকত পাহাড় হয়ে যাত্রা করি কেওক্রাডং’র পথ ধরে , ৩০ মিনিট হাঁটার পরই সবার সবার শরীর থেকে প্রচুর নোনাপানি বের হয়ে গেলে একটু বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, বেলাল ভাই আভাস দেন সামনে কাঁকড়া ঝর্ণা , ওখানেই কিছুটা জলপানের বিরতি নেয়া যায় । কাঁকড়া ঝর্ণা এমনিতে খুব বড় নয়, তার উপর বর্ষাকাল বিগত হয়ে যাওয়ায় পানি কমে গেছে , কিন্তু যতটুকু জলের ধারা অবশিষ্ট ছিল তা আমাদের ক্লান্তি দূর করতে যথেষ্ট ছিলো । কাঁকাড়া ঝর্নায় মিনিট দশেকের বিরতীর পর আমাদের ম্যারাথন হন্ঠন আবারও শুরু হয় , পরবর্তী গন্তব্য চিংড়ি ঝর্ণার আগে আর কোন বিরতি দিতে রাজি নন বেলাল ভাই, যদিও খাড়া পথ পাড়ি দিতে কারও কারও হাঁটার গতি খুব শ্লথ হয়ে আসছিলো , কেউ কেউ আবার বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন । বিশেষ করে সুজন আর তমা’র সাথে তাল মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো অনেকের । তমা রেখা সম্ভবত আমাদের এই দলের সবচেয়ে ফিট অভিযাত্রী । উঁচু-নিচু খাড়া পথ পাড়ি দিতে ওর স্টেপগুলো দেখে খুব অবাক হচ্ছিলাম । তবে সবচেয়ে অবাক হচ্ছিলাম আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ট অভিযাত্রী জেনিফার আফছানা স্টেফির সাহস আর স্টেমিনা দেখেন । সদ্য স্কুল পেরনো স্টেফি জীবনে পাহাড়ই দেখেনি , প্রথমবার পাহাড় দেখতে এসেই একদম কেওক্রাডং’র চূড়ায় উঠতে চলেছে ভাই বিনয় ভদ্রের সাথে ।
চিংড়ি ঝর্ণা
আমি , বিনয় ভদ্র আর বেলাল ভাই পিছিয়ে পড়াদের সাথে সাথে আসছিলাম । সৃজিতা মিতুর শ্বাসকষ্ট ব্যামো আছে , কিছুক্ষন পর পর তাকে ইনহেলার নিতে থামতে হচ্ছিলো। এভাবে কেউ অবিরাব হেঁটে , কেউ থেমে থেমে উঠছি তো উঠছিই , একটা সময় ঝর্নার আওয়াজ পাওয়া গেল …ঝমঝম করে পড়ছে জল নিরবধি । এইরকম দুর্গোম পাহাড়ি পথে পথিকের ক্লান্তি দূর করার জন্যই যেন ঝর্নাগুলো দাঁড়িয়ে আছে , বেলাল ভাই ইঙ্গিত দিলেন সামনেই চিংড়ি ঝর্না । চিড়িং ঝর্নায় স্নান করার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে সবাই । সুতরাং কোন দেরি নয় । অবশ্য ঝর্নার মূল স্রোতে উঠতে বেশ কিছুটা পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে হয়েছিলো, পাহাড়ি বন্ধু বিপ্লব না থাকলে বোধহয় মিতু প্রায় পড়েই যেত। বিনয় ভদ্র সবার আগে উঠে যান- চিৎকার করে সবাইকে ডাক দেন- “এটা দোতলা ঝর্না চলে এসো সবাই” । চিংড়ি ঝর্নায় মগ্ন হয়ে কতক্ষন ছিলাম , মনে নেই। তবে এই শীতল জলে গা ভেজানো অনেকদিন মনে থাকবে । আবারও হাঁটা শুরু , এবার সবার আগে সুনামগঞ্জের হাওড় পাড়ের ছেলে কবি রাজিব চৌধুরী। তিনি সবাইকে তার ফিটনেস দিয়ে মুগ্ধ করছিলেন । হাঁটার একগেয়েমী কাটাতে তার কবিতাও ছিলো বাড়তি পাওয়া । পাহাড়ের কিছু জায়গা বেশ জঙ্গল মতন, পাহাড়ি অরন্যে দিয়ে হাঁটার সময় তিনি চিৎকার করে আবৃত্তি করছিলেন- “আচ্ছা আমি যদি গাছ হয়ে যাই এই গভীর নিবিড় অরন্যে…?” বিনয় ভদ্রের কথার বিনোদন আর রাজিব চৌধুরির কবিতার ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা।
চিংড়ি ঝর্না থেকে যাত্রী ছাওনি’র আগ পর্যন্ত আমাদের কোন অফিসিয়াল বিরতি নেই, তবে কারও কারো বিরতি চলছিলই । ফটোগ্রাফার ফাহিমকে বারবার থামতে হচ্ছিলো , এত এত ছবি তোলার সাবজেক্টের লোভ কোনভাবেই এড়ানো যাচ্ছিলো না যে, আবার ভাবতে হচ্ছিলো ব্যাটারিরি চার্জের কথাও!

যাত্রী ছাউনির বিরতির সময় এগিয়ে যাওয়াদের সাথে পিছিয়ে পড়াদের ফের মেলবন্ধন ঘটে , শুরু হয় জোঁক চেকিং …২/১ জনের রক্ত ইতিমধ্যে শুষে নিয়েছে জোঁক । আঁকিয়ে পিউ মার্কার পেন নিয়ে এসেছিলো , ছাওনির বাঁশের মধ্যে নিজেদের নাম লিখে এর সদব্যবহার শুরু করেন বিনয় ভদ্র । কিন্তু এখানে বেলাল ভাইয়ের তাড়াতে বেশিক্ষন থামা গেল না , পরবর্তী স্টপেজ দার্জিলিং পাড়ার আগে আর কোন থামাথামি নাই , আমাদের প্ল্যান সূর্য থাকতে থাকতে কেওক্রাডং’র চূড়ায় উঠব , চূড়া থেকেই দেখব দিনের শেষ হয়ে যাওয়া। আবারও বেশ কিছুটা এগিয়ে যায়- তমা, সুজন , সোহেল, কাজি ওহিদ, আর রাজিব রাসেল । এই কজনই অগ্রসরমান । বিকেলে ঘনিয়ে এলে আমরা পৌছে যাই দার্জিলিং পাড়ায় , এক দোকানে চা-বিস্কুট আর কলা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নেই । দার্জিলিং পাড়ায় মিনিট বিশেকের যাত্রা বিরতির পর আবারও হাঁটা শুরু , এরমধ্যে জোঁকের আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য এক বম অধিবাসির কাছ থেকে লাল রঙের লম্বা এক জোড়া মোজা কিনে নেন বিনয় ভদ্র , লাল-হলুদের কম্বিনেশনে তাকে সবুজ পাহাড়ে মানাচ্ছিল বেশ । এই পথে যেতে যেতে কথা হয় বমদের বিয়ে রীতি নিয়ে , বেলাল ভাই জানান – বমদের বিয়েতে আলাদা করে বিশেষ আনুষ্টানিকতার কিছু নেই, কেউ কাউকে ভালো লাগলেই একসাথে থাকা শুরু- সেটাই বিয়ে হিসেবে গন্য । তবে এই বিয়েতে ডিবোর্স নেই । একবার ঘর বাঁধলেই সারাজীবনের জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধন । বমরা এমনিতে খিষ্টানধর্ম অনুসরন করে , তাই ভালো লাগা, বিয়ে ব্যাপারটা অন্য জাতীর মত নিজেদের গোত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ।
বিকেলের পাহাড়
এবারের হাঁটাপথে আমরা কেওক্রাডং এর বেশ কাছের পাহাড়ে চলে এসেছি, এদিকটার পাহাড়ের লেয়ারগুলো খুব সুন্দর ,হাঁটার পথটাও বেশ ভালো। একটার পেছনে আরেকটা পাহাড় যেন সিরিয়ালি দাঁড়িয়ে আছে, আর বিকেলের হলুদাভ রোদ পাহাড়ের শরীরকে যেন রঙ্গিন করে তোলছিল । উপরে সচ্ছ নীল আকাশের বিচ্ছিন্ন শুভ্র মেঘ যেন ভীষন রকম ছন্দ আর রঙের কম্বিনেশন মানিয়ে চলছে পাহাড়ের সাথে , এইরকম প্রকৃতিতে নিজেকে খুব উদার ভাবতে ইচ্ছে করে। আমাদের কয়েকজনের প্রকৃতিপ্রেমে মগ্ন হয়ে হেলেদুলে হাঁটার বদৌলতে, তমা-সুজন-সোহেল-রাজিব রাসেল, কাজি ওহিদরা আবারও না দেখা দূরত্বে হারিয়ে যায়। সবার আগে কেওক্রাডং’র চূড়ায় উঠে যায় সুজন আর তমা , আমরা যখন ওদের জয়েন করি তখন চূড়ায় উঠে তারা রীতিমত নাচানাচি করছে ।
পাহাড়ের বুকে দিনের অন্ত
কেওক্রাডোং’র রাত

কেওক্রাডোং, সুমদ্রপিষ্ট থেকে ৩১৭২(মতান্তরে ৩২৭২) ফুট উচ্চতায় অফিসিয়ালি দেশের সর্বোচ্চ শিখর । চূড়ার কয়েকফুট নিচেই আমাদের কাঠের কটেজ। এইরকম পাহাড়ি কাঠের বাড়িতে থাকার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের, লাল মুন থান লালার মালিকানাধীন কটেজগুলো দেখেই তাই সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল । সন্ধ্যার পর পরই পাহাড়ে শীত নামতে শুরু করে, চূড়ায় আগুন জ্বালিয়ে শুরু হয়ে যায় আমাদের আড্ডাও, আমরা ছাড়া তখন কেওক্রাডং অবস্থান করছে আরেকটি অভিযাত্রী দল , এমনিতে এই সময়টায় ট্রাকিং করে খুব বেশি মানুষ ওখানে ওঠে না , যারা উঠে বেশিরভাগই ছেলে, আমাদের দলেই শুধু ৪জন মেয়ে আছে। তারমধ্যে জেনিফার স্টেফি, মাত্র ১৫ বছরেই বয়সেই এতটা পাহাড় পেরিয়ে এসেছে । এই এলাকায় বেলাল ভাই সবচেয়ে অভিজ্ঞ গাইড, তিনিও মনে করতে পারলেন না ১৫ বছরের আর কোন বাঙালি মেয়ে কেওক্রাডং ট্রাকিং করে উঠেছিলো কীনা!
রাতে যথারিতী কেওক্রাডং’র চূড়ায় সূরা’র আসর জমিয়ে তোলেন বিনয় ভদ্র , আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ায় এসেই খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে গেছে , আর যারা জেগেছিলো…দীর্ঘরাত অবধি নির্ভেজাল আনন্দের ভরিয়ে তোলেছে কেওক্রাডোং’র চূড়া। বিশেষ করে অনেকগুলো পাহাড়ি ভাষায় বেলাল ভাই’র গান , সোহেল, কাজি, রাজিব রাসেলদের উম্মাথাল নৃত্য আর বিনয় ভদ্রের স্বভাবসুলভ বাকপটুতায় মত্ত ছিলো সবাই। এর মধ্যে এক রোহিঙ্গা , অপর অভিযাত্রী দলের গাইড হিসেবে এসে বিচিত্র কথাবার্তায় ইসলাম প্রচারের বিরক্তি শুরু করলে বিনয় ভদ্র দ্বারা ব্যাপক সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের শিকার হয় এবং একপর্যায়ে সেও গান গাওয়া শুরু করে ! কেওক্রাডং’র চূড়া হয়তবা অনেকদিন মনে রাখবে এই মাতাল রাত।

২৪-অক্টোবর ভোর</strong
ভোরের আলোয় আমরা
এই মেঘ খেতে ইচ্ছে করে

দীর্ঘরাত জেগে থাকার পরও সূর্যোদয় আর মেঘ দেখতে সবাই উঠে পড়ি ভোর ৫টায় , সূর্যোদয় দেখি , মেঘ দেখি …হাতের নাগালে চলে আসা বড় বড় মেঘের টুকরো দেখে ইচ্ছা করে গ্লাস দিয়ে নিয়ে কয়েক ঢোক মেঘ খেয়ে ফেলি ।

জাদিফাই ঝর্ণা’র পথ ধরে

জাদিফাই ঝর্না, প্রায় নতুন আবিষ্কৃত এই ঝর্নায় এখনও খুব বেশি মানুষ যান না । যেতে কেওক্রাডোং থেকে প্রায় ২০০০ ফুট নামতে হবে । উঠে এসে কেওক্রাডং হয়েই আবার বগা লেক। তাই লালা’র ওখানেই দুপুরের খাবারের অর্ডার করে আমরা বেরিয়ে পড়ি সকাল ৮টায় , ফিরে এসে খেয়ে দেয়েই আবার বগা লেকের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করতে হবে। যথারিতী গতি তারতম্যের কারনে কেউ বেশ এগিয়ে , কেউ পিছিয়ে চলতে থাকি। যেতে যেতে পথে পড়ে কেওক্রাডং বম পাড়া, কেনান পাড়া, আর দেশের সবচেয়ে উচ্চতায় অবস্থিত স্কুল- কেনান রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল । স্কুলের বাচ্চাদের সাথে মেশা, বম পাড়া থেকে তরতাজা কমলা আর ভীষন মিষ্টি পেঁপে খেতে খেতে ধীরে সুস্থে এগিয়ে চলি আমরা কজন । পাহাড়ে কমলা, পেঁপে,কলা – এই ধরনের ফলগুলো খুবই সস্তা এবং সুস্বাদু।
জাদিফাই ঝর্ণা
কেওক্রাডং থেকে জাদিফাই ঝর্ণা’র কাছাকাছি পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা ভালই, কষ্ট হলেও রিস্কি নয় কিন্তু জাদিফাই ঝর্নায় মুখ থেকে খাড়া খাদের কিনারায় গিয়ে তো আমাদের চক্ষু ছানাবড়া! একদম খাড়া আর ঝুরি পাথরের জন্য পা রাখাই অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিলো। এইপথে নামতে হবে ভাবতে বুঁক কেঁপে উঠে। লাঠি আর বেলাল ভাই’র ভরসায় নামতে শুরু করি , মিতু তো প্রায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছিল কিন্তু এতটা পথ এসে জাদিফাই ঝর্না না দেখে ফিরে যাওয়াও তো যায় না। অনেকটা সময় নিয়ে, বুকের কাঁপুনি আর পায়ের কাঁপুনিকে জয় করে শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই বিপুল সৌন্দর্যের হাতছানিতে নেমে পড়ি। বিগত হয়ে যাওয়া বর্ষার পরও এতটা জলের ধারা প্রশস্ততম এই জলপ্রপাতে নেমে আসতে দেখে মনে হল – অত্যাধিক সৌন্দর্য আর ভয়ংকরতা বোধসহ সহোদোর কিংবা সহদোরা । গা ভেজানো শেষ করে কেওক্রাডোং ফিরে আসতে আমাদের সাড়ে ৩টার মতন বেজে যায় । পেটের ক্ষিদে তখন মগজ অবধি ভর করেছে, লালা’র বাড়িতে খাসির মাংস আর পাহাড়ি মিষ্টি কুমড়ো’র অমৃত স্বাদ নেয়ার পর পা টনটন করতে শুরু করে কিন্তু আমাদের বেশি বিশ্রাম নেয়ার উপায় নেই , ফিরতে হবে বগা লেকে সিয়াম দির কটেজে , ২৫ তারিখ ওখান থেকেই বান্দরবান হয়ে চট্টগ্রাম এবং রাতের ট্রেনে সিলেট।

পাহাড়ি ভাষায় কেওক্রাডং অর্থ হচ্ছে- সুউচ্চ পাহাড় , আমরা বিদায় নেই সুউচ্চ পাহাড় থেকে । কেওক্রাডং’এ আমাদের আথিতিয়েতা দিয়ে মুগ্ধ করেছেন লালা মুন থন লালা পরিবার , তাঁর স্ত্রী ও ছেলের বউ’র হাতের রান্না করা খাবার অনেকদিন মনে থাকবে। মনে থাকবে লালা’র নাতি ছোট্ট দেবশিশু সিলেনকে ।

কেওক্রাডং টু বগা লেক- নাইট ওয়াকিং

রাতের ট্রাকিং
পাহাড়ে সাধারণত রাতের বেলা নিরাপত্তার জন্য পর্যটকদের চলাচলে বিধিনিষেধ আছে, কিন্তু আমাদের তো উপায় নেই, শরীর মন না চাইলেও ফিরতেই হচ্ছে । বিকেল ৪টা ৫৫তে বগা লেকের উদ্দেশ্যে শুরু হয় আমাদের ফেরযাত্রা। সিদ্ধান্ত হয় এবার কেউ বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না ,রাতের বেলা তাই সবাইকে হাঁটতে হবে এক লাইনে । সবচেয়ে শ্লথ গতির মিতুকে দেয়া হয় সবার সামনে যাতে করে কেউ পিছিয়ে পড়ে বিছিন্ন না হয়। দুর্গোম পাহাড়ের পথে ছুটে চলে আমাদের রাতের মানব ট্রেন। দার্জিলিং পাড়ায় ৫ মিনিট আর যাত্রী ছাউনিতে জোঁক অপসারনের জন্য ৫ মিনিট বিরতি ছাড়া আমরা অবিরাম ছুটতে থাকি । একটা মাত্র টর্চ লাইট, মোবাইলের আলো ছাড়া কোন কৃত্তিম আলোর ব্যবস্থা না থাকায় মূলত চাঁদের আলোই হয় ভরসা । টর্চ নিয়ে সামনে সোহেলকে দায়িত্ব দেয়া হয় বিপদ্দজনক খাদের আগাম বার্তা দেয়ার জন্য। ডানে খান, বায়ে খাদ, গর্ত… এরকম সিগন্যালে গভীর মনোযোগ রেখে এগিয়ে চলি আমরা । বুকের ধুরুধুরু কাঁপনের মাঝেও বিনয় ভদ্রের গালগল্প যথারিতী চলতে থাকে । দীর্ঘ ৫ ঘন্টা হেঁটে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে বগা লেক পৌছে যেন মনে হয় অধির অপেক্ষার থাকার পর কোন প্রিয়মানুষের মুখ দেখছি।

২৫ অক্টোবর , বিদায় পাহাড়

এদিন আর কোন কর্মসূচি নেই, ফিরতে হবে নিজভূমে । যদিও মানুষের নিজের বলতে কি আসলেই নির্দিষ্ট কিছুকে বোঝায় সারা জীবন? এই পাহাড়ের সময়টা পাহাড়কেই তো কত নিজের মনে হচ্ছিলো । পাহাড় ছেড়ে যাবার জন্য তাই কিছুটা মন খারাপ হয়। অনেকে পাহাড়ের চিহ্ন রাখতে টুকটাক কেনাকাটা সেরে নেন , বেরিয়ে পড়ি আমরা । রুমা বাজার পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকবেন হাস্যজ্জ্বোল সিয়াম দি আর এই ভ্রমনে আমাদের সার্বক্ষনিক ভরসা বেলাল ভাই। গাইড জাহিদ অবশ্য আমাদের কৈক্ষঝিরি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলো ।
ফেলে আসি পাহাড়, ফেলে আসি সাদা মেঘ , নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ের বিশালত্ব । ফেরাপথে সেই চাঁদের গাড়ি, তমার মিষ্টি গলায় সমগীতের – “ঝর্ণার শব্দে ঢাল বেয়ে নেমে আসে দুরন্ত পাহাড়ি মেয়ে” গানটা শুনতে শুনতে পাহাড়ে কাটানো সময়গুলো খুব আপন আর স্বপ্নের মত মনে হয়।
বিদায় পাহাড়


[পুনশ্চ
– ১। চট্টগ্রামের মানুষজন সব কথার শেষে “যে” লাগিয়ে দেন। সিলেট ফিরে আমরাও “যে” রোগে আক্রান্ত হয়েছি, বিনয় ভদ্র যে লাগিয়ে প্রায় ৬০ টার মতন স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফেসবুকে যে smile 🙂 🙂
২। মেসবাহ সোহেল বান্দরবানের পাহাড়ের সারি দেখেই বলে উঠে- এ যে দেখি পাহাড়ের সাগর, কক্স হলো পানির সাগর আর বান্দরবান পাহাড়ের সাগর smile 🙂 🙂
৩। বগা লেক ও কেওক্রাডং এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া খুবই দুস্কর , তাই খবরা খবরের বাইরে ছিলাম আমরা। বগা লেক থেকে কেওক্রাডং যাওয়ার পথে এক জায়গায় নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে প্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রয়ানের খবর জানতে পারি । আমরা মেঘ পাহাড়ে বসে তাঁকে ভালোবাসা জানিয়েছি। এই লেখাটিও উৎসর্গ করছি সুনীলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে}