ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

দিনবদলের পালা প্রতিনিয়তই চলছে। তবে পরিবর্তনের স্বাভাবিক স্রোতে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনমানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা দশ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। প্রাত্যহিক জীবনে তারা নানাভাবে অবহেলিত। বিশেষ করে মৌলিক অধিকারগুলো থেকে তারা প্রায়ই বঞ্চিত। ফলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী দিন দিন প্রান্তিকতার পর্যায়ে পেঁৗছে যাচ্ছে। বর্ণনাতীত দুর্দশা, শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততা এবং আর্থিক দীনতা তাদের জীবনাচরণের প্রতিদিনের সঙ্গী। এসব থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় তাদের জানা নেই। উপরন্তু মনুষ্য সমাজের যাবতীয় কটূক্তি ও সব বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে প্রতিবন্ধী মানুষকে সামনে অগ্রসর হতে হয়।

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সংরক্ষণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশন তাদের অধিকার সনদে অনুমোদন দেয়। এ অধিকার সনদে প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও পুনর্বাসন, কর্ম ও কর্মসংস্থান, স্বাধীনভাবে বসবাস এবং সমাজে একীভূত হওয়ার অধিকারকে সমুন্নত রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশেষত জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ক সনদে প্রতিবন্ধী মানুষের কর্ম ও কর্মসংস্থান বিষয়ে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের করণীয় সম্পর্কে ২৭ ধারায় (১-এর ছ) বলা হয়েছে_ ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গকে সরকারি চাকরি খাতে নিয়োগ দান করবে।’ এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার প্রণীত প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইনে উল্লেখ রয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য যথোপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করে তাদের জন্য সরকার কোটা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করবে। প্রতিবন্ধীদের অধিকারগুলো কেবল সনদেই আবদ্ধ, এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে বিশেষ বিসিএসের ব্যবস্থা করেছে। ৩২তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা, উপজাতি প্রাধিকার কোটায় কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে ১৯.১০.২০১১ তারিখে। ৩২তম বিসিএসে প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের উপেক্ষা করা হয়েছে।

১৩তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ২০১০-এর প্রতিপাদ্য ছিল_ ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার।’ সারাবিশ্বে এ স্লোগানকে সামনে রেখেই ৩ ডিসেম্বর ২০১০ দিবসটি পালিত হয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ এমডিজির লক্ষ্য পূরণে সমর্থ হবে বলে প্রায়ই আশাবাদী নীতিনিধারক মহল। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশগম্যতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও চাকরি ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে। ফলে পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে সঙ্গতিপ্রাপ্ত নয় বরং দারিদ্র্য তাদের গ্রাস করছে। ফলে এমডিজির প্রথম লক্ষ্যই বাধাগ্রস্ত হবে। তাই মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও উপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করে সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণে সমর্থ হবে এবং ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার’ স্লোগানটির সুষ্ঠু প্রয়োগে সমর্থ হবে। উন্নয়নের স্বাভাবিক স্রোতধারায় সংযুক্তি এবং মানবশক্তিকে সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে বিপুল এ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি প্রভৃতিতে অংশগ্রহণের সুযোগদানের পাশাপাশি তাদের কর্ম ও কর্মসংস্থানের পথকে সুগম করতে হবে। ৩২তম বিসিএস সরকার প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য কোটা ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ করে তাদের মেধার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি।

***
লেখাটি দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছে ১৯ নভেম্বর ২০১১