ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা দশ জন মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়। প্রতিবন্ধিতার কারণে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে হয়ে পড়ে পর্যুদস্ত ও বিপর্যস্ত। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সালে ঘোষিত হলেও বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৬১ তম অধিবেশনে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সনদে অনুমোদন দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশও সুনির্ধারিত কিছু নীতিমালা গ্রহণ করেছে, প্রনয়ণ করেছে ‌প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১। বাংলাদশে সরকার জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ক সনদে অনুস্বাক্ষর করে ৩০ নভেম্বর ২০০৭। ফলে বাংলাদেশে বসবাসরত প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাত্রায় অনিবার্যভাবে আর এক ধাপ পরিবর্তনের আভাস লক্ষযোগ্য হয়।

জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পৃথক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ প্রনয়ণের পরবর্তীকালে বাংলাদেশে কতিপয় মানবাধিকার সংগঠন, এনজিও এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বৈষম্যপীড়িত, উপেক্ষিত ও অধিকার বঞ্চিত এসব মানুষের স্বত্ব রক্ষার কথা বলে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক সংগঠন প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, পুনর্বাসন ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত। বিশাল এ জনগোষ্টিকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অধিকার প্রভৃতি অবহিত করার পাশাপাশি সংগঠনগুলো যথাযথ ও যুগোপযোগি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বলাই বাহুল্য সংগঠনগুলো বাংলাদেশের স্বাভাবিক শিক্ষা কাঠামোর সাথে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের সহায়ক উপকরণ যথাসময়ে পাচ্ছে না। এতে করে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিক্ষা গ্রহণের মত একটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয় একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে।স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সংগঠনগুলো সত্যিই কি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সঠিকভাবে রক্ষা করছে? নাকি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের বাণী মুখে আওরিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করছে?

আবার প্রতিবন্ধিতা সচেতনতামূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, প্রতিবন্ধী অধিকার বিষয়ক সংগঠন তথা প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন সংগঠনরে সাংগঠনিক নেতৃত্বের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় য়ে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন একজন অপ্রতিবন্ধী ব্যাক্তি যিনি এককভাবে সংগঠনটির স্বত্বাধিকারী এবং যার অধীনে রয়েছে স্বল্পসংখ্যক প্রতিবন্ধী কর্মজীবী মানুষ। আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও সত্য যে সংগঠনটির অধীনস্ত প্রতিবন্ধী মানুষটির নেত্বত্বের গুণাবলী বিকাশের কোনো সুযোগ থাকে না।

জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ক সনদে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে ধারা-২৯ (১ এর খ)এ বলা হয়েছে-
আন্তর্জাতিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ সংগঠন তৈরী ও যোগদান করবে। জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের সনদে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের কথা থাকলেও যে কোন কারনেই হোক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলী পরিচালনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিটি নেতৃত্ব দানের অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রতিবন্ধী মানুষটিকে নেতৃত্ব দানের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? গত ৩ ডিসেম্বর ২০তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হয়েছে। এ বছরের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উন্নয়নে সম্পৃক্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি: সবার জন্য সুন্দর এক পৃথিবী’। আসুন অবহেলা, বঞ্চনা, করুণা নয় বরং তাদের যোগ্যতার বিকাশে সহায়তা করে সত্যিকার একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ি এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারকে সমুন্নত করে তাদের নেতৃত্বদানের গুণাবলীকে জাগ্রত করে চলার পথকে সুগম করি।‌‌‌‌‌

***
এ সম্পর্কিত আরো একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে: দৈনিক ইত্তেফাক, নভেম্বর ১৩, ২০১০, শনিবার