ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

রামুতে কী ঘটেছে তা দেশের মানুষ জানেন। জানেন বিদেশের মানুষরাও। বৌদ্ধধর্মে যারা বিশ্বাস করেন, তারা সে খবর রেখেছেন। এই যে আক্রমণ, তা কারা করেছে সে খবরও আসছে মিডিয়ায়। দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন আমেরিকায় ছিলেন। বলেছেন, দোষীদের পাকড়াও করা হবে। কিছুদিন আগে সিলেটে এমসি কলেজ হোস্টেল পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ সময় আমি সিলেটেই ছিলাম। তিনজন মন্ত্রী সিলেট গেলেন। বললেন, বিচার হবে। এখনো দেশবাসী সুষ্ঠু বিচার দেখছে না। দেশ এখন আরেকটি হায়েনা চক্রের খপ্পরে। সামনে ইলেকশন। এরা তাই খুব মরিয়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো সংঘর্ষ হয়েছে। রামু, উখিয়াসহ গোটা পার্বত্য এলাকার মানুষ এখন আতঙ্কিত। আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কী কোনোকালে কঠোর ছিল? না ছিল না। যদি থাকতো তবে ২০০১ এর ইলেকশনের পর ঐ সময়ের হামলাকারী হোতাদের ২০১২ সালে কেন বিচারের আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে? এতোদিন কেন আনা হয়নি?

স্বাধীনতার পর বিগত চল্লিশ বছরে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচনায় দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো নির্ণায়ক ভূমিকা পালনই করেনি। বরং দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদকে নানা কায়দায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ম“ দিয়ে এসেছে। ফলে গোটা জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। এমনকি, কিছু ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন ঘটেছে রাষ্ট্রীয় নীতিতে। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে এই সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বীভৎস রূপ সহজেই চোখে পড়ে। এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল চার মূল নীতিতে। সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু জাতির জনককে হত্যার পর পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, সংবিধান সংশোধন করে বাতিল করা হয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। আর এভাবেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় সাংবিধানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার অবলুপ্তি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিকাশের ধারা। অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মকা- চালানোর সুযোগ দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারী ইসলামিক রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীকে। ফলে রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবেই প্রবলতর হয়ে ওঠে। জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ভাবধারা বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এখানেই থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এসব ঘটনা এদেশের মানুষের ভালোই মনে আছে।

আর আওয়ামী লীগ কী কম করেছে? না দায় তারাও এড়াতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, কিছু ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কী চুক্তিনামা করেছিলেন, তাও মনে আছে এদেশের মানুষের। দেশবাসী তারপরও এই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় পাঠালো। তার কারণ ছিল একটিই, মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চায়। এই সরকারের চার বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে কারা এমন উসকানি দিচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে হবে সরকারকেই।

আমরা লক্ষ করেছি, কিছু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদিতে উন্মাদনা ছড়িয়ে নানারকম ফায়দা লুটতে ব্যস্ত হয়েছে। এদের চিহ্নিত করা দরকার। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও পটিয়াতে বেপরোয়াভাবে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামাকে উসকে দিয়ে ১৯টি বৌদ্ধবিহার ও একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস, ৪৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতায় একজনের মৃত্যুর সংবাদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বছরের শুরু থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, সাতক্ষীরা, দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা উসকে দেয়ার জন্য মহলবিশেষ থেকে সচেতনভাবে যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে- এ প্রসঙ্গে আমরা দেশবাসী তথা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।’

‘তাছাড়া কয়েকদিন আগেও দুই পাহাড়ি-বাঙালি ছাত্রের কলহকে কেন্দ্র করে যেভাবে রাঙ্গামাটি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়েছে, উদ্বেগের সঙ্গে তাও আমরা দেখেছি। আমাদের আশঙ্কা, এসব ঘটনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চলমান প্রক্রিয়া বানচাল করে দেশকে পুরোপুরিভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের ধারায় ঠেলে দেবার উদ্দেশ্যে মহলবিশেষের সচেতন চক্রান্তেরই বহিঃপ্রকাশ।’ দুই. যে কোনো রাষ্ট্রে একটি মহল দখলে ব্যস্ত থাকে। এই দখলদার কারা? সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ হচ্ছে সামন্তবাদের আদি স্বরূপ। তা আগে ছিল এখনো আছে। এবং বহাল তবিয়তেই রয়েছে নতুন রূপে। নতুন আঙ্গিকে। এর প্রবক্তা কারা? প্রবক্তা তারাই, যারা এখনো সেই মৌলবাদের দোর্দ- প্রতাপ খাটাতে চায় সমাজের চারপাশে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ছাতকছড়া গ্রামের নুরজাহানকে দোররা মেরে হত্যার ঘটনা খুব বেশি দিন আগের নয়। এমন ঘটনা এখনো ঘটছে। ভাবতে খুবই অবাক লাগে বাংলাদেশের বর্তমান ডিজিটাল প্রজন্মের দাবিদার সমাজ এখনো এ ফতোয়াবাজদের সমূলে প্রতিহত করতে পারছে না। কেন পারছে না, তা ভেবে বারবার কেবল হতাশই হতে হয়।

বাংলাদেশের মানুষের হাতে হাতে এখন মুঠোফোন। অথচ কোনো গ্রামে যখন কোনো ভ- ফতোয়াবাজ এ সমাজের নারী-পুরুষকে দংশন করতে তৎপর হচ্ছে, তখন এসব মুঠোফোন এক সঙ্গে বেজে উঠছে না। তারা মোবাইল ফোনে এক সঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না। তারা পারস্পরিক বোঝাপড়া করে মোকাবেলা করছে না এসব সামাজিক অজগরদের। কেন তা হচ্ছে না? রামুতে যা ঘটেছে, এর প্রতিরোধও এলাকার সচেতন তরুণরা করতে এগিয়ে আসতে পারতো ঐক্যবদ্ধভাবে।

হ্যাঁ, বাংলাদেশের বস্তিতে বস্তিতে মৌলবাদের বীজ ছড়ানোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। ‘হিজাব’, ‘বোরখা’র আড়ালে থেকে তরুণ প্রজন্মের ব্রেনওয়াশ করার জন্য মাঠে নামানো হয়েছে কিছু নারী কর্মীকে। তারা বিভিন্ন গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে কোমলমতি স্কুল ছাত্রছাত্রীদের মননকে মৌলবাদী উন্মাদনায় সংক্রমিত করার চেষ্টা করছে। ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে তারা মানবতার পরিশুদ্ধ বিকাশকে পঙ্গু করে দেয়ার পাঁয়তারা করছে। বাংলাদেশে এই যে কলোনিয়াল মৌলবাদের ভয়ঙ্কর চেহারা ক্রমেই বেরিয়ে পড়ছে, তা রুখতে মানুষ কতোটা সাহস নিয়ে দাঁড়াচ্ছে, রাষ্ট্রই বা কতোটুকু সচেতন? এসব প্রশ্নও বিভিন্ন কারণে মুক্তচিন্তক মানুষের মনকে বিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কিংবা এর সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও যে হুমকি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, তাও আমরা দেখছি। ফজলুল হক আমিনী নামের একজন অর্ধ শিক্ষিত মৌলবাদী নেতা খুব ন্যক্কারজনক ভাষায় রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীর আসনকেই হুমকি দিয়েছেন কিছুদিন আগে। কী শক্তি এ আমিনীর? কারা আছে তার পেছনে? হ্যাঁ, এরাই কলোনিয়াল মৌলবাদের ফলিত ফসল। যারা এক সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে গোটা দেশটাকেই মৌলবাদের অ্যাকশন গ্রুপ, জঙ্গিবাদীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। জন্ম দিয়েছিল ‘বাংলা ভাই’, ‘শায়খ রহমান’ নামের ফ্রাংকেনস্টাইনদের। এটা খুবই নিশ্চিত করে বলা যায়, সাময়িক জান্তাতন্ত্র কিংবা মৌলবাদী দানবতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশে এসব ডানপন্থী হন্তারকরা কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার স্পর্শ পেতো না। তারা কোনোভাবেই গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে পারতো না। অথচ এসব ধর্মীয় ধ্বজাধারীরা আগেও ভোগবাদী ছিল। এখন তাদের সেই ‘সর্বখেকো’ মনোভাব আরো বহুগুণ বেড়েছে।

নারীনীতি নিয়ে ধর্মীয় লেবাসে যারা জাতিকে লম্বা নসিহত শুনিয়েছিল, তারা নিজেরা কতোটা পরিশুদ্ধ? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন স্বয়ং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি একটি জনসভায় বলেছিলেন, ফজলুল হক আমিনী এতিমের হক আত্মসাৎ করেছেন। কী ভয়াবহ কথা! রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে এমন ধ্বনি উচ্চারিত হওয়ার পর এই আমিনীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া অবশ্যই রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই না জেনে, না বুঝে এমন কথা বলেননি। সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে আমিনীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা এই সমাজের নৈতিক দায়িত্বও ছিল। যে আমিনী হাফেজ্জী হুজুরের সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি? এটা সবার জানা এবং বোঝা উচিত বাংলাদেশে কলোনিয়াল মৌলবাদ যারা সমাজের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে, তাদের জীবনাচার কিন্তু এর বিপরীত। তাদের ছেলেমেয়েরা পড়ছে বিদেশের দামি বিদ্যালয়ে। আর তারা বাংলাদেশে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নামে চাঁদা তুলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের সেসব দেশগুলোতেও। যারা উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশে কলোনিয়াল মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার বর্তমান কারিগর। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আধুনিক মেয়েরাই এখন ‘হিজাব’ ছুড়ে ফেলে দিয়ে সমকালের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পোশাক পরছে। অফিস, আদালত, ব্যাংক-বীমা, দপ্তর চালাচ্ছে। আর সেই হিজাবকে আরোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বাংলাদেশে।

সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের ভয়ঙ্কর চেহারা হচ্ছে, সরাসরি পবিত্র কুরআন শরিফ নিয়ে রাস্তায় নেমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা। যদি এসব অর্ধশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিকারীরা প্রকৃত শিক্ষিত হিসেবে গড়ে উঠতো, তবে তারা এমন মানসিকতা ধারণ করতে পারতো না। আফগানিস্তানের বর্তমান ভয়াবহ পরিণতির কথা আমরা জানি। ধর্মীয় গোঁড়ামির সুযোগ নিয়েই সেখানে আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র তাদের অন্যতম সদর দপ্তর সেখানে স্থাপন করতে পেরেছিল, এর পাশাপাশি পাকিস্তানের অসমতল পর্বত উপত্যকাকে বেছে নিয়েছে তাদের অভয়ারণ্য হিসেবে। সাকর্ভুক্ত দেশ আফগানিস্তানের বলয়ের বাংলাদেশের জন্য তা অবশ্যই সুখকর সংবাদ নয়। কারণ নব্বইয়ের দশকে ‘আমরা সবাই তালেবান- বাংলা হবে আফগান’ এই সেøাগানগুলো যারা দিয়েছিল তাদের চেহারা তো ভিডিও ফুটেজে বাংলাদেশের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে থাকার কথা।

যারা রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে দেশকে অস্থীতিশীল করার পাঁয়তারা করছে, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হোক। এদের বিচার করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হোক। তা না হলে এদের এমন আশকারা দেশের ভবিষ্যৎকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকেই ঠেলে দেবে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তস্নাত এ ভূখ- কোনো মৌলবাদী-দানবতন্ত্রের লীলাক্ষেত্র হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সব সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশাবাদী এদেশের মানুষ। তা না হলে রামু, উখিয়ার পর এরা হানা দিতে উদ্যত হবে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায়ও।