ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

অনেক দিন পর ডাউন টাউন ম্যানহাটানের গ্রিনিচ ভিলেজ দিয়ে হেঁটে গেলাম। নিউইয়র্কে এখন বসন্তকাল। গাছে গাছে সবুজ পাতা। ফুলের কুঁড়ি আর বাহারি সুগন্ধ। সেই পুরনো গ্রিনিচ কাফেতে উঁকি দিতেই দেখি কবি রাফায়েল নেরেন্তো বসে আছেন। কুশল বিনিময়। তারপর কবিতা নিয়ে কথা। রাফায়েল পেরুর মানুষ। নিউইয়র্ক তার সেকেন্ড হোম। রাফায়েলকে খুব বিমর্ষ দেখলাম। বললেন, দিনকাল খুব খারাপ বন্ধু। জানতে চাইলাম, কী হয়েছে!

বললেন, ‘নতুন একটা মেয়েবান্ধবী জুটিয়েছিলাম। সে আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমার পুরনো সব ডায়েরি পড়ে ফেলেছে। জেনে গেছে অনেক কিছু। কথায় কথায় ঝগড়া করত। শেষমেশ দুদিন আগে একেবারে চলে গেছে।
আমি হেসে উঠি। ‘আরে তুমি হাসছ!’, তার চড়া গলা।

আমি বলি, এতে আর নতুন কী। আরেকটা জুটবে। তুমি লিখবে নতুন কবিতা। ওগুলোর নাম হতে পারে ‘ওল্ড ডায়েরিস’( পুরনো রোজনামচা)।
তিনি বলেন, মশকারা করছ!
তারপর আমরা কফি খাই। অনেক কথা হয়।
হ্যাঁ, ডায়েরি এ সময়ে একটা বিষয় তো বটেই। কারণ তা থেকে অনেকে জেনে যায় অনেক কথা। কোথায় যাওয়া হচ্ছে, কী খাওয়া হচ্ছে। কোথায় ছবি তোলা হচ্ছে ইত্যাদি। আমরা অনেকেই জানি না ডায়েরি লিখি। কীভাবে লিখি? লিখি টুইটারে, ফেসবুকে, ব্লগে, ই-মাধ্যমে। যাকে আমরা বলি সামাজিক গণমাধ্যম।

সামাজিক গণমাধ্যম এ সময়ে একটি বড় ইস্যু। যা থেকে কয়েক মিনিটের মাঝেই খবরটি পৌঁছে যায় বিশ্বের আনাচে-কানাচে। আমাকে মার্কিন কবি ডব্লিউ এস মারউইন জানিয়েছিলেন, তিনি তার কিছু ডায়েরি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন রাগ করে। কেন রাগ করে, কার ওপর রাগ করে- তা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হয়নি। কিন্তু এটা সেলিব্রিটিদের হয়। কারণ তারা অনেক কিছুই গোপন রাখতে চান।

আমি প্রায়ই দেখি, ফেসবুকে আমার কোনো কোনো বন্ধু তার ডাক্তারি রিপোর্ট পুরোটাই স্ক্যান করে দিয়ে দিয়েছেন। এসব বিষয় খুবই স্পর্শকাতর, খুবই ব্যক্তিগত। তা পাবলিকলি জানাতে হবে কেন? দেখি খুশিতে ডগবগ হয়ে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করেছেন কেউ কেউ। কিন্তু এটা কি তারা ভাবেন- ফটোশপের এ যুগে যে কেউ ওই ছবিগুলো ব্ল্যাকমেইল করতে পারে। ছবির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে আপত্তিকর অনেক কিছু। যা কারও জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

সামাজিক গণমাধ্যমে কিছু উপদ্রব গোটা বিশ্বে এখন একটি বড় সমস্যা। অফিসের কাজে বসে দীর্ঘ সময় মোবাইলে কথা বলা, টেক্সট মেসেজ করা, আইপডে গান শোনা, হেডফোন লাগিয়ে বসে থাকা- বিষয়গুলো একটি জটিল সমস্যা হিসেবেই দেখা দিয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলার ঝুঁকি কমাতে জেল-জরিমানা করার আইন পাশ্চাত্যে পাস হলেও অফিস টাইমে এ উপদ্রব কমাতে হিমশিম খাচ্ছে পাশ্চাত্যের কর্পোরেট অফিসগুলো। অনেকে এখন চাকরি দেয়ার সময়ই নিয়মকানুনের বিধিবিধানে ‘কর্মস্থলে এসব কাজগুলো করা যাবে না’ মর্মে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। কারণ এ উপদ্রবগুলো নানাভাবেই কোম্পানির ক্ষতি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেসবুক প্রাত্যহিক জীবনকে ধকলপূর্ণ করে তুলছে নানাভাবে। সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে কভার স্টোরি ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ফেসবুকের কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক কোম্পানির বড় কর্মকর্তারা তাদের অনেক চাকরিজীবীকে চাকরিচ্যুত পর্যন্ত করছেন। দৈনিকটির সমীক্ষায় দেখা গেছে, ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস প্রভৃতি সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোম্পানির বড় কর্তারা সহজেই তাদের এমপ্লয়িদের ট্র্যাক করতে পারেন। তারা জেনে নেন তাদের প্রাত্যহিক জীবন প্রণালী সম্পর্কে।

ফেসবুক, টুইটার নিয়ে কালো মেঘের ঘনঘটা আরও আছে। কাউকে চাকরি দেয়ার আগে কোম্পানিগুলো জেনে নিচ্ছে, তার বন্ধু-বান্ধব কে বা কারা, তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, মনমানসিকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি সম্পর্কে। ফেসবুক বা অন্য কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ওয়েবসাইটে কটূক্তি, গালাগাল, নগ্ন কথাবার্তা, হীনমানসিকতার বহিঃপ্রকাশের মূল্যায়ন হচ্ছে চাকরি পাওয়ার কিংবা চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়ার্ক রাইটস ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট লুইস মাল্টবি বলেন, অনেকেই মনে করেন আমরা আমেরিকায় আছি। আমাদের যা ইচ্ছা তাই কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারের সঙ্গে কথা বলতে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’-এর দোহাই দেয়া গেলেও প্রাইভেট সেক্টরে তা প্রায় অসম্ভব। কারণ প্রাইভেট মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থের ব্যাপারে খুবই কঠিন হস্ত।

আবার আসি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। ফেসবুকে অনেক বন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো যায়। আমিও জানাই মাঝে মাঝে। একটি ঘটনা বলি। ক’দিন আগে একই দিনে জন্মদিন থাকায় আমার দুই তরুণ কবি বন্ধুকে আমি শুভেচ্ছা জানাই নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে। এদের একজন ভারতে, অন্যজন বাংলাদেশে থাকেন। আমি ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম বাংলাদেশের বন্ধু আমার ফেসবুকের ইনবক্সে এলেন। কথা শুরু হল। তিনি বেশ ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, তার জন্মদিন রোববারে ছিল। এখন বাংলাদেশে সোমবার সকাল। বলতে চাইলেন, তার বার্থডে চলে গেছে! আমি প্রথমে কিছুটা মশকারা করতে চাইলাম। পরে দেখি তিনি খুব সিরিয়াস! আমাকে চার্জ করতে চাইলেন- ‘গতকাল ফেসবুকে আসেননি?’ এবার আমি মুখ খুললাম। বললাম, আমি তো রোববারেই আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তিনি বললেন, কীভাবে? আমি বললাম, আমার এখানে তো ভাই রোববারের সন্ধ্যা নেমেছে মাত্র। তারিখও ওই। এবার তার মাথায় ঢুকল।

বললেন, আমি তো সেভাবে ভাবিনি! এর একঘণ্টা পর দেখি ভারতের আমার সেই কবি বান্ধবীও একই মেসেজ পাঠিয়েছেন। তার ‘বার্থডে ইজ ওভার’। আমি বললাম- না, ওভার নয়। কারণ নিউইয়র্কে এখনও রোববার।
তাদের আচরণে বেশ মর্মাহত হলাম। তারা আমার ওপর এভাবে চটবেন কেন? সূর্য যে ডোবে না, তা কি অজানা তাদের? আমি

নিয়মিত ব্লগ লিখি। ফেসবুকে লিখি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আমি অন্যের লেখায় গিয়ে মন্তব্য করি না। অনেক সময় আমার লেখা ‘ভালো হয়েছে’ যারা বলেন, তাদেরও উত্তর দিই না।

এ বিষয়ে কিছু কথা বলি। কবি শহীদ কাদরী বলেন, ‘একজন লেখক-কবি মানেই একজন স্বৈরশাসক’।
লেখালেখি আর সমালোচনা ভিন্ন জিনিস। ব্লগ লেখার একটি নতুন মাধ্যম। ব্লগে লেখক লিখবেন। পাঠকরা পড়বেন। ‘ইন্টারঅ্যাকশনে’র নামে যে আলোচনা হয়, তা থেকে বিশেষ কিছু শেখার নেই। যা শেখার তা পঠন-পাঠন, মননশীল চিন্তা, ধারণক্ষমতা থেকেই হয়। বিনয় মজুমদার বলেছেন, ‘ভালোবাসা দিতে পারি, তুমি কি তা নিতে প্রস্তুত?’ আমার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, নতুন লেখকদের নিগেটিভ কোনো সমালোচনা করলেই তারা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। সমালোচনা সহ্য করা অনেকেরই ধাতে নেই। তাই সমালোচনা থেকে বিরত থাকি। আর ‘খুব ভালো’/‘চমৎকার’/‘চালিয়ে যান’ মার্কা কমেন্ট আমি করতে অভ্যস্ত নই। তাছাড়া আমি তো ব্লগে টিউটোরিয়াল দিতে আসিনি। এসেছি লিখতে।

বিশ্বসাহিত্যের সব লেখকই আত্মকেন্দ্রিক। তা অনেক আগেই শিখেছি। আমি মনে করি, ব্লগে আজেবাজে কবিতা নিয়ে কথা বলা মানে সময় নষ্ট করা। এ সময়ে প্রতিটি কমিউনিটি ব্লগেই হাতেগোনা ২০-২৫ জন ভালো লেখক-কবি আছেন। ভালো কবিতা কখনও মূল্য পায় না। মূল্য পাননি জীবদ্দশায় কবি জীবনানন্দ দাশ।

ব্লগ মানেই ‘বন্ধুদের বগল বাজানো’- এমন একটা ধারণা কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে। এ ধারণা থেকে সংশ্লিষ্ট সবার বের হওয়া উচিত। ভালো লেখা কালের কাছে মূল্য পাবেই। তাই মনে রাখা দরকার, কোনো লেখায় ৪০-৫০টি মন্তব্য মানেই সেটি ভালো লেখা নয়। ফেসবুকে আজকাল না পড়েই অনেকে লাইক দেন। ফলে লাইক পড়ে ৩০০-৪০০। এর কোনো মূল্য আছে?

আবারও বলি, সামাজিক গণমাধ্যম মূলত ডায়েরি। এ ডায়েরি লেখার আগে অনেক কিছু ভাবা উচিত। মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কী গ্রহণ করবে আর কী বর্জন করবে। প্রজন্মের জন্যও এসব গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কারণ ইন্টারনেটে কে কী লিখছে, তার স্ক্রিনশট রেখে দিয়ে প্রমাণ করা কয়েক যুগ পরও সম্ভব। বিষয়গুলো নিয়ে ভাবলে শংকিত তো হতেই হবে।