ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 
tarek-masud

 

।এক।

সকালে ঘুম থেকে জেগে এমন একটি সংবাদ দেখব, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ১৩ আগস্ট ২০১১ শনিবারের সকাল (নিউইয়র্ক সময় সকাল ৯টা, বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টা) এমন চরম দুঃসংবাদ বয়ে আনবে তা কল্পনার বাইরে ছিল। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের কৃতী চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ নিহত হয়েছেন! শিরোনাম শুনেই কেঁদে ফেলি। এ কেমন কথা! এ কেমন প্রস্থান!

১৩ আগস্ট একই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন দেশের আরেক প্রতিথযশা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীর। শহীদ মুনীর চৌধুরীর এই সন্তান স্বপ্রতিভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মিডিয়া আকাশে। এটিএন নিউজের সিইও হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র ক’মাস আগে।

তারেক মাসুদ নেই। ভাবতেই বার বার শিউরে উঠি আমি। আহত হয়েছেন ক্যাথরিন মাসুদ। রিকশা করে আহত ক্যাথরিনকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর অ্যাম্বুলেন্সে করে যাচ্ছে তারেক মাসুদের শবদেহ। টিভির পর্দায় এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবি জীবন এত ছোট কেন?

তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৮৯ সালে। নিউইয়র্কে। টগবগে এক মিডিয়াম্যান। কাঁধে বড় ক্যামেরা নিয়ে ঘুরেন। তার সঙ্গে ক্যাথরিন। পার্কে, আড্ডায়, সমাবেশে তার পদচারণা। বাঙালিদের সমাবেশ, সভা, আড্ডা, আলোচনার ছবি ভিডিও করে রাখেন একমনে। বলেন, কাজে লাগবে, এক সময় কাজে লাগবে এগুলো।

তার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘আদম সুরত’ তখন দেশে-বিদেশে বেশ আলোচিত। জানতে চাই, এমন ধারা কেন বেছে নিলেন? তারেক মাসুদ হেসে জবাব দেন, শিকড়ের সন্ধান করছি যে! তার কাছে ‘শিকড়ের সন্ধান’ শব্দ দুটি শুনে আবারও আপ্লুত হই।

নব্বইয়ের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক থেকে নাজমুল আহসানের সম্পাদনায় ‘পরিচয়’ ম্যাগাজিন আকারে বের হয়। মাসিক আয়োজন। আমি সেই কাগজের প্রধান প্রতিবেদক। নাজমুল আহসান ও আমি সিদ্ধান্ত নিই, তারেক মাসুদের একটা ইন্টারভিউ করব। তারেক মাসুদ আমাদের সময় দেন।

নির্ধারিত দিনের সেই সন্ধ্যায় আমি ও নাজমুল আহসান গিয়ে হাজির হই তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের স্ট্যাটান আইল্যান্ডের সেই বাড়িতে। নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোর মধ্যে স্ট্যাটান আইল্যান্ডে যেতে ফেরি পার হতে হয়। আমরা ফেরিতে উঠেই তারেক মাসুদের দেখা পেয়ে যাই। তারেকও একই ফেরিতে বাড়ি ফিরছেন। তার ইন্টারভিউ সেই ফেরিতে বসেই শুরু করি। উচ্ছল হাসি দিয়ে তারেক বলেন, আরে দূর, কিসের ইন্টারভিউ! আমি কি বুড়ো হয়ে গেলাম যে সাক্ষাৎকার দেব। চলেন, বাসায় বসে বরং আড্ডাই দেই।

হ্যাঁ, আমরা তার বাসায় দীর্ঘ রাত পর্যন্ত আড্ডাই দিয়েছিলাম। অনেক কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। তার কর্মযজ্ঞ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দেশে ফিরে গিয়ে কর্ম-উদ্যমের প্রত্যাশা, বিশ্ব চলচ্চিত্রসহ নানা বিষয়ে। সে আড্ডার আলাপ নিয়ে আমি তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছেপেছিলাম ‘মাসিক পরিচয়’ ম্যাগাজিনে (এখন অবশ্য সাপ্তাহিক পরিচয়)।

।দুই।

তারেক মাসুদ ছিলেন বাংলা মায়ের কাদামাটির লালিত কৃতী সন্তান। লাখো বাঙালি তরুণ যখন বিদেশে অভিবাস নিয়ে স্থায়ী হওয়ার জন্য তুমুল জীবনযুদ্ধ করছিলেন তখন তারেক মাসুদ জানান তিনি বাংলাদেশেই স্থায়ী হবেন। প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন ক্যাথরিন মাসুদকে। ক্যাথরিন আমেরিকান মেয়ে। তারেক ক্যাথরিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অনেকেই ভেবেছিলেন ক্যাথরিন বাংলাদেশে গিয়ে স্যাটেল হতে পারবেন তো? হ্যাঁ, ক্যাথরিন পেরেছিলেন এবং তার পাশের আসন থেকেই সড়ক দুর্ঘটনায় চিরবিদায় নিয়েছেন বাংলা মায়ের সেই কর্মবীর সন্তান তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদের একটি অন্যতম আগ্রহের বিষয় ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তিনি বিদেশে বিভিন্ন আর্কাইভ থেকে বাংলাদেশে ১৯৭১-এর গণহত্যা, যুদ্ধ পর্ব, শরণার্থীদের অবস্থা, গণমানুষের আকুতি ইত্যাদি চিত্রের ফুটেজ সংগ্রহের কাজটি করছিলেন খুব দক্ষতার সঙ্গে। তারেক বলতেন, আমার জীবনের বড় দুঃখ মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি_ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা, উপাত্ত, তথ্য, তত্ত্ব নিয়ে চলচ্চিত্র জগতে কাজ করতে চাই।

তারেক তার সংগৃহীত বিভিন্ন ফুটেজ আমাদের দেখিয়েছিলেন। তা থেকেই সম্পাদনা করে তিনি নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’, যা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনবদ্য দলিল। আমি বিশ্বাস করি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তার এই ‘মুক্তির গান’ বাঙালি জাতিকে শাণিত করবে।

মনে পড়ছে, তিনি ‘মুক্তির গান’ নিয়ে যখন নিউইয়র্কে এসেছিলেন তখন হাজারও প্রবাসী কয়েক বারই তার এ ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারিটি দেখেন। বিভিন্ন ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ‘মুক্তির গান’ প্রদর্শিত হয়।

তারেক ছিলেন মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ধ্রুব প্রতীক। দেখেছি, কাজ করতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যে থাকা যায় তেমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। তার একমাত্র অভিপ্রায় ছিল ‘হাউ ক্যান আই ডু দ্যা বেস্ট’। যে মানুষের মাঝে এমন প্রত্যয় থাকে তিনিই সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারেন সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে।

বাংলাদেশের মননশীল দর্শককে বাংলা চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যে ক’জন মানুষ নিরলস শ্রম দিচ্ছেন, তারেক ছিলেন তাদের অন্যতম। তার ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রগুলো দেখলে সে প্রমাণই পাওয়া যাবে। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান এনেছিলেন।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং লোকজ সংস্কৃতি। তিনি নিজে মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন, তাই গোঁড়ামি, মৌলবাদ, জঙ্গিতন্ত্র, ধর্মীয় উন্মাদনা কীভাবে এদেশের মানুষের মাথায় জেঁকে বসানোর জন্য একটি মহল চেষ্টা করছে, তা তার অজানা ছিল না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে সতর্ক, সজাগ করার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন।

তারেক মাসুদের মৃত্যু এদেশের জন্য যে ক্ষতি বয়ে এনেছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তারেক বিদেশে এসে অভিজ্ঞতা, কৌশল, স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা রপ্ত করে মাতৃমাটির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। তার জীবনের অর্জন জাতিকে উপহার দিতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই দেশের মাটিতেই তাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করতে হলো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কেন এখনো হচ্ছে না, সে প্রশ্ন বারবারই আসছে। সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন তো হচ্ছেই না, বরং বড় বড় সড়ক-মহাসড়কগুলোর দৈন্যদশা দেখলে রীতিমতো ভীত হতে হয়। একটু বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের রাজপথ। আর ছোট ছোট শহরের কথা তো বাদই দিলাম

সড়ক দুর্ঘটনা এদেশের অনেক মেধাবী মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নিজ স্ত্রীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে সামাজিক আন্দোলনে নেমেছেন নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ ব্যানার বুকে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন গোটা দেশ। কিন্তু কাজ কি কিছু হচ্ছে? তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মৃত্যু আমাদের বার বার দায়ী করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে টুওয়ে হাইওয়ে গড়ে তোলা খুবই জরুরি। হাইওয়ে পেট্রোন পুলিশ, লাইসেন্সধারী অভিজ্ঞ ড্রাইভার, কমার্শিয়াল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবস্থার ওপর কড়াকড়ি, নেশাগ্রস্ত ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের সংযুক্তি এবং প্রয়োগ সময়ের জরুরি দাবি। ভাবতে হবে, আমরা মানুষ নাম ধারণ করেও কেন মানবিক বিবেচনা এবং দাবি-দাওয়ার বোধকে ধারণ করতে পারছি না। কেন এত লুটপাটের পরও শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের উন্নয়নে সামান্যতম ব্যয় করতে কার্পণ্য করছেন।

তারেক মাসুদ তার অবুঝ শিশু রেখে গেছেন। কী করবেন এখন ক্যাথরিন_ ভাবতেই আমি শিউরে উঠছি বার বার। মার্কিনি আভিজাত্যের জীবন ছেড়ে ক্যাথরিন তো বাংলাদেশকেই মনে-প্রাণে ভালোবেসেছিলেন। বাংলাদেশ তাকে এই প্রতিদান দিল! তারেক ভাই, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় স্বজন আমার। আপনাকে নিয়ে এই শোকগাঁথা লিখব, জীবনে ভাবিনি। বড় অসময়ে চলে গেলেন আপনি। এই জাতি আপনাকে মনে রাখবে, তারেক ভাই। আপনি চির শান্তিতে ঘুমান।