ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন সরকারদলীয় এমপি তারানা হালিম। তিনি বলে দিয়েছেন যদি পরীক্ষা ছাড়া গড়পড়তা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়, তবে তিনি অনশন করবেন। তার এ বক্তব্য দেশের মানুষের জন্য ভাবনার বিষয়। সরকারদলীয় একজন এমপি এমন ঘোষণা দেয়ার পর সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, সরকারের ভেতরের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

টেলিভিশনে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের চলতি সেশনের কিছু অংশ দেখলাম। সরকারদলীয় বেশ কজন এমপি, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সমালোচনা করেছেন কঠোর ভাষায়। দাবি উঠেছে যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের। কিন্তু রাষ্ট্রের যোগাযোগমন্ত্রী বাগাড়ম্বর করেই যাচ্ছেন। তিনি নানা ছলছুতোয় ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় যে কতটা ব্যর্থ, তার খতিয়ান ইতোমধ্যে দেশের মানুষের কাছে পানির মতোই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারপরও তার কোন টনক নড়েনি। সবশেষে আমরা টিভিতে দেখছি, যোগাযোগমন্ত্রী পায়ে হেঁটে মহাসড়কের কর্মকাণ্ড পরিদর্শন করছেন। তিনি দাম্ভিক উচ্চারণে বলে বেড়াচ্ছেন, ঈদের আগেই দেশের মহাসড়কগুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।

এটা দেশবাসী জানেন ও বোঝেন, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে এমন কোন আলাদিনের দৈত্য কিংবা চেরাগ নেই, যা দিয়ে তারা দেশের চেহারা রাতারাতি পাল্টে দিতে পারবেন। গেল আড়াই বছর তারা ছিলেন কোথায়? এই আড়াই বছর দেশের সড়ক ও জনপথ বিভাগ আশানুরূপ কাজ করেনি কেন?

জাতীয় দৈনিকগুলো এরই মাঝে রিপোর্ট ছাপতে শুরু করেছে ত্বরা করে সড়ক উন্নয়নের নামে লুটপাটের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ, সেটাই হয়। না হয় ঈদের আগে এমনভাবে ‘উন্নয়ন’-এর তড়িঘড়ি কেন? সংশ্লিষ্টদের ভূরিভোজের জন্য? ঈদের বখরা বাড়ানোর জন্য?

কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য মনিটরিং সেল দরকার। প্রধানমন্ত্রী নিজে এসব তদারকি করবেন, নাকি তা দেখার জন্য লোকবল নিয়োগ করেছেন?

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান নিজে নামকরা শ্রমিক নেতা, তাই শ্রমিকদের প্রতি তার একটা বিশেষ দরদ আছে, তা ধরেই নেয়া যায়। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সুপারিশে ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিষয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ দেন খোদ মন্ত্রী। জানা যাচ্ছে, বিনা পরীক্ষায় বিনা ট্রেনিংয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নবীন ড্রাইভারদের প্রবীণ ড্রাইভাররা খানসেনা বলে হাস্যরস করে থাকেন। কারা এই ‘খানসেনা’?

বাঙালিরা ‘৭১-এ সশস্ত্র সংগ্রাম করে এই বাংলার মাটি থেকে হায়েনা খানসেনাদের চিরতরে বিতাড়িত করেছিল। সেই খানসেনারা আবার বাংলায়! বাস-ট্রাক ড্রাইভাররূপী ঘাতকদের এভাবে প্রশ্রয় দিতে চান মন্ত্রী শাজাহান খান! এভাবে ঘাতক ‘খানসেনা’ তৈরি করবেন তিনি?

তাহলে তো তারানা হালিম এই ঘাতক খানসেনাদের বিরুদ্ধে অনশনের হুমকি দিয়ে সময়োচিত সাহসী কাজটিই করেছেন; কারণ বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স দিয়ে এভাবে ঘাতক ড্রাইভারদের তো মহাসড়কে নামতে দেয়া কোনমতেই উচিত নয়। কোন সভ্য সমাজ তা হতে দিতে পারে না।

মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, নতুন ড্রাইভাররা বেশি শিক্ষিত না হলেও চলবে। গরু-মুরগির ছবি চিনলেই যথেষ্ট। কী আজব বাণী শোনালেন তিনি! তাহলে তো বোঝা গেল বাংলাদেশে মানুষের চেয়ে গরু-মুরগির মূল্যই বেশি, কারণ মানুষ না চিনলেও চলবে! রাষ্ট্রের সামাজিক অবক্ষয় কতটা অধোমুখী হলে একজন মন্ত্রী মানুষের ব্যাপারে এত দায়িত্বহীন উক্তি করতে উদাসীন হতে পারেন। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তায় মারাত্মকভাবে ধস নামতে শুরু করেছে। বর্তমান সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী চরমভাবে অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন- দিয়েই যাচ্ছেন। তারপরও তাদের শিকড় এত মজবুত যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও সব দেখেও যেন না দেখার ভান করছেন। এর গোপন রহস্য কী? আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি। আমরা সংবিধান সংশোধন করে জনগণের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় দেখাচ্ছি। অথচ গত আড়াই বছরে একজন ‘ব্যর্থ মন্ত্রী’ও চিহ্নিত করতে পারিনি। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মনমোহন সিংয়ের কজন মন্ত্রী ইতোমধ্যেই ব্যর্থতার দায় দিয়ে ক্যাবিনেট থেকে সরে পড়েছেন-পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশ এমন ধারা অনুসরণ করতে এত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে কেন? এটা কিসের লক্ষণ?

মহাজোটে অনেক যোগ্য নেতা আছেন, যারা মন্ত্রিত্ব পেলে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগেও কারা ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতা তা শীর্ষ মহলের অজানা নয়। কারও প্রতি কারও ব্যক্তিগত ক্ষোভ-অভিমান থাকতেই পারে; কিন্তু যে জন যে কাজের যোগ্য, তাকে সেই পদ অবশ্যই দেয়া দরকার; কিন্তু তা না করে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন ভিন্ন কথা। ২১ আগস্টের নির্মম গ্রেনেড হামলা স্মরণে আওয়ামী লীগ আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় এলজিআরডি মন্ত্রী, দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, যারা বাংলাদেশে ‘আন্না হাজারে’ হতে চাইছেন তারা দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। তিনি বলেছেন, অত্যন্ত সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র করে শেখ হাসিনার জীবননাশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেছেন, আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর জন্য নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সংবাদটি তো খুবই ভয়াবহ! আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার তা রুখতে সর্বময় শক্তি প্রয়োগ করছে না কেন? দলের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে কিংবা মন্ত্রিত্ব পেয়েও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে, উভয় গ্রুপই সমানভাবে দোষী এবং দায়ী। দল এবং সরকারের দায় নেয়ার কোন কারণ আছে বলে রাষ্ট্রের কোন মানুষই মনে করছেন না। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে। তাই এ অর্জনকে যদি কিছু উচ্চাভিলাষী, স্বার্থপর মন্ত্রীর জন্য হারাতে হয়, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যোগাযোগমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। ধরে নেয়া যাক, তারা বিরোধিতার খাতিরেই বিরোধিতা করছেন। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা কী? দেশের গত আড়াই বছরের শাসনামলে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ড, জাতির জনক হত্যাকারী খুনিচক্রের ফাঁসি কার্যকর, শেয়ারবাজারে মারাত্মক ধস, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু প্রভৃতি যোগাত্মক এবং বিয়োগাত্মক ঘটনা সামাল দিতে হয়েছে সরকারকে। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে হচ্ছে রাষ্ট্র স্বার্থ, জনস্বার্থ। জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সরকারের শীর্ষ মহল যদি উদাসীনতা দেখায়, তবে মানুষ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেবেই; যার কিছুটা প্রমাণ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এর মধ্যেই দেখা গেছে।
শাসনব্যবস্থায় পচন থামাতে হলে ব্যর্থ, বাচাল এবং অকর্মণ্য মন্ত্রীদের সরিয়ে দেয়ার কোন বিকল্প নেই। এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, মন্ত্রীদের কাউকে পদ থেকে অব্যাহতি দিলে সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হবে; বরং ব্যর্থ মন্ত্রীদের সরিয়ে দিলে সরকার জনগণের কাছে নন্দিতই হবে। মন্ত্রীরাও বুঝতে পারবেন ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদে থাকা সম্ভব নয়।

‘প্রধানমন্ত্রীর জীবন হুমকির মুখে’- এলজিআরডি মন্ত্রীর এ বাণীর প্রতিধ্বনি করেই বলি, দ্রুত মহাজোট সরকারের শুদ্ধি অভিযান চালানো হোক। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে আন্না হাজারেদের উত্থান থামানো যাবে না, কারণ অনশন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।

এ লেখাটি যখন শেষ করব তখনই প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেল, বগুড়ায় ৯টি গাড়ির দৈনিক পত্রিকা লুট করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তারই লোক পত্রিকা লুট করে নিয়ে গেছে। এটা কেমন অশনি সংকেত! শীর্ষ কাগজ সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়েছে চাঁদাবাজির অভিযোগে। কাগজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্পাদক সরকারি রোষানলের শিকার। প্রকৃত সত্য তবে কী?