ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

বদলে গেছে অনেক কিছুই। রিসেশন চলছে মার্কিন মুল্লুকেও। নেমে গেছে মধ্যবিত্তের আয়ের অংক। চারদিকে একটা হতাশা। বেকারত্ব বাড়ছে। শাসকগোষ্ঠী বলছেন ছোট মুখে অনেক বড় বড় কথা। কাজ খুব একটা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী।

এমন অনেক প্রতিকূলতা সামনে রেখে এবারও যুক্তরাষ্ট্র পালন করল সেপ্টেম্বর ইলেভেন। নিউইয়কের্র মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ বলেছেন, এখন থেকে আর ‘গ্রাউন্ড জিরো’ বলা ঠিক হবে না। বলতে হবে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’। যেই কথা সেই কাজ। আমরা দেখলাম মিডিয়াগুলো পরদিন থেকেই তা লেখা শুরু করেছে।

আপনার শিশুকে আপনি কিভাবে জানাবেন সেপ্টেম্বর ইলেভেনের সেই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কথা? প্রশ্নটি এখনও উত্থাপিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে। ২০০১ থেকে ২০১১, দশ বছর পেরিয়ে গেছে সেই ভয়াবহ দিনটির। তারপরও এখনও মার্কিনিদের মনে সেই বেদনার স্মৃতি খুবই করুণ। যারা ওই দিনটিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং বেঁচে নেই, তাদের বেশকিছু কথাবার্তার রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। ‘৯১১’ জরুরি ফোন নম্বরে ফোন করে তারা বলেছিলেন, ‘আমাদের বাঁচাও।’ ‘আমরা নিশ্চিত আমরা মারা যাব।’ ‘উই নো, উই আর গোয়িং টু ডাই।’

সেই শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে এক দশকের ‘নাইন-ইলেভেন’ পালিত হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। আলোচনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে সেপ্টেম্বর ইলেভেন পরবর্তী বিশ্ব ও আমাদের প্রজন্ম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিকগুলো এই আলোকে সিরিজ প্রতিবেদন করেছে। বিভিন্ন প্রচ্ছদ কাহিনীতে স্থান পেয়েছে ‘নিউইয়র্কে তরুণ মুসলিম প্রজন্ম।’ ‘ধর্ম ও সমাজ।’ ‘আমাদের সংবিধান ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ ইত্যাদি।
এ প্রচ্ছদ কাহিনীতে বেশ কয়জন তরুণ-তরুণীর সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। তাদের সবার বক্তব্য হচ্ছে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিছু বিপথগামী, ভ্রষ্ট মতবাদীর উচ্ছৃংখল কার্যকলাপ দিয়ে গোটা ইসলাম ধর্মকে বিচার করা উচিত নয়। তারা বলেছে, উগ্রবাদী-মৌলবাদী সব ধর্মেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম প্রজন্ম কোন বৈষম্যের শিকার হতে রাজি নয়।

এসব প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ মুসলিম প্রজšে§র জীবনচিত্র। এতে দেখা গেছে, তারা প্রায় সবাই আমেরিকান স্টাইলেই হালাল খাবারে অভ্যস্ত। তারা আমেরিকান জাজ, হিপহপ, ক্ল্যাসিকেল মিউজিক শোনে। তারা আমেরিকান মুভি, ড্রামা, থিয়েটারে যায়। তারা বড় হয়ে ‘আমেরিকান ওয়ে’তেই মুসলিম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

এই প্রজন্ম আরও স্পষ্ট করে বলছে, আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা ফিলিস্তিন, ইসরাইল, লেবাননে যে নিরপরাধ মানুষ মারা যাচ্ছে- তাও গ্রহণযোগ্য নয়। কোন রক্তপাতকেই মানতে রাজি নয় তারা। এরা আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বমানবের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তরুণ প্রজšে§র এই যে আশাবাদ, তারপরও এই যুক্তরাষ্ট্রই এখনও ভুগছে এক অজানা শংকায়। ২০০১-২০১১ এই এক দশকে ঘটে গেছে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। একটি খুব সামান্য ঘটনার কথা বলা দরকার, যা ‘কামান দাগানোর’ মতোই দেখেছিল মার্কিনি প্রশাসন।

২০০৬ সালে ক’জন আরবি ভাষাভাষী ছাত্রের নিখোঁজ সংবাদটি কাঁপিয়ে তুলেছিল গোটা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে। মিসরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯ জন ছাত্র স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এসেছিল জুলাই মাসের মাঝামাঝি। তাদের সবার মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে রিপোর্ট করার কথা ছিল। এর মধ্য থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র ৮ জন ছাত্র ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রিপোর্ট করেছিল। বাকি ১১ জন লাপাত্তা হয়ে গেছে বলে খবর বেরোয়। এরা সবাই নিউইয়কের্র জেএফকে বিমানবন্দরে এসে যথাসময়ে ‘ইজিপ্ট এয়ার’ বাহনে নামে। তারপর সংযোগ ফ্লাইটে মন্টানা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গিয়েছে মাত্র ৮ জন। বাকি ১১ জন নিউইয়র্কেই লাপাত্তা হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। প্রভাবশালী টিভি ‘চ্যানেল লাইন’ তা নিয়ে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট করার পরপরই সর্বত্র শুরু হয় হইচই এবং ব্যাপক তল্লাশি।
সাংবাদিকতায় ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট’ স্টাইলটি ইতিমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তথ্য ও তত্ত্বসমৃদ্ধ এসব রিপোর্টে নানা ধরনের বিষয় তুলে আনা হয়। বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট অ্যান্ড সাবজেক্টের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দেন। ছাত্রদের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান পিটার কিং। পিটার কিং বলেছিলেন, নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসীরাও ঠিক একই কায়দায় যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছিল। যে ১১ জন ছাত্র লাপাত্তা রয়েছে তাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে, যা অনেকটাই সেপ্টেম্বর ইলেভেনের সন্ত্রাসীদের অনুরূপ।

পিটার কিং বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রমাণ রাখতে চায় আমরাই শ্রেষ্ঠ। তা না হলে বিশ্বের সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী ডেঞ্জার জোন বলে বিবেচিত রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা ইস্যু না করলেও পারত। কিন্তু এখনও যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেসব ভিসা ইস্যুর চুক্তি ভঙ্গ করে এর ‘অ্যাবিউজ’ করা হচ্ছে। না হয় ছাত্ররা মিসর থেকে এভাবে এসে লাপাত্তা হবে কেন? পিটার কিং আরও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা, সুবিধার কথা ভাবতে হবে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে ভেবে দেখবে বলে আমি আশাবাদী। যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতারা বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে আরও কঠিন আইন প্রণয়নে নিশ্চয়ই মনোযোগী হবেন।

কংগ্রেসম্যান পিটার কিংয়ের এই দৃঢ়চেতা বক্তব্যের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যাপক তৎপর হয়েছিল ওই ১১ জনকে খুঁজতে। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন, মিসর হচ্ছে এমন এক রাষ্ট্র যেখানে যে কোন আরব রাষ্ট্রের নাগরিক সহজ সুবিধা পায়। মিসরীয় পাসপোর্ট বানিয়ে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকা যে কোন দেশের মিসরের দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ কঠিন বিষয় নয়। আর যেহেতু মেধাবী ছাত্রদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দ্বার এখনও উš§ুক্ত, তাই এমন সুযোগ আÍঘাতী সন্ত্রাসীরা কাজে লাগাতেই পারে।

এটা সবার জানা, যুক্তরাষ্ট্রে এমন অনেক অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পর্যাপ্ত ছাত্রছাত্রীর অভাবে কোন কোন সেমিস্টার শুরুই করতে পারে না। নর্থ ক্যারোলিনা, সাউথ ক্যারোলিনা, মন্টানা, মিজৌরি, অ্যারিজোনা, উইসকিনসন এমন অনেক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন কলেজ-ইউনিভার্সিটি মাঝে মাঝে বিশেষ ডিসকাউন্ট দিয়ে ছাত্র ভর্তি বিজ্ঞাপন বিশ্বের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, ওয়েবসাইটে দেয়। নাইন-ইলেভেন পূর্ববর্তী সময়ে ছাত্র ভর্তি ভিসাটি বেশ সহজলভ্যই ছিল মেধাবীদের জন্য। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। তারপরও ছাত্রছাত্রীদের যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে আসার হাতছানি এখনও অবারিতই রয়েছে। প্রধান প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ছাত্র ভিসায় সন্ত্রাসী গ্র“পগুলো তাদের দুর্ধর্ষ কমান্ডোদের যুক্তরাষ্ট্রে যে পাঠাবে না, কিংবা পাঠাচ্ছে না এর নিশ্চয়তা দেবে কে? আর জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নির্বিশেষে মানবতা, মানবসত্তার প্রতি বৈষম্য দেখানো যাবে না এই নিশ্চয়তা তো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানই নিশ্চিত করেছে। তাই অনেকটা উভয় সংকটেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই বিশেষ রিপোর্ট প্রচারের দুদিন পর টিভির সংবাদে প্রচারিত হল, ওই ১১ জন ছাত্রের মধ্যে ৩ জনকে এফবিআই খুঁজে পেয়েছে নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যে। তারা বলছে, তারা ভালো ইংরেজি জানে না বিধায় হারিয়ে গিয়েছিল এয়ারপোর্ট থেকে। এখন একজন মিসরি-আমেরিকান নাগরিকের আশ্রয়ে আছে। তাদের মার্কিন আদালতে হাজির করা হবে। ভিসার আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গের কারণে বিচারক তাদের মিসরে ফেরত পাঠাবেন নাকি পড়ার সুযোগ এখানে দেবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অপর ৮ জনকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল এফবিআই। কারণ তাদের প্রধান মতলব কী তা শংকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের।

এত কাঠখড় পোড়ানোর পর জানা গেল, এসব ছাত্র তাদের বন্ধুদের সঙ্গে আয়েশ কাটাতেই চলে গিয়েছিল। না, তাদের পরে ডিপোর্ট করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ক্ষমা করে দিয়েছিলেন মাননীয় বিচারক।
প্রায় একই সময়ে ১০ আগস্ট ’০৬ লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে আরও ২০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী পাকড়াও হওয়ার পর বিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নতুন কাঁপন শুরু হয়েছিল। লন্ডন পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইউএস এয়ার, ডেলটা এয়ারলাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনসের বিভিন্ন যুক্তরাষ্ট্রগামী ফ্লাইটে যাত্রীবেশে অবস্থান নিয়ে নাশকতা ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে ঝুঁকি ও হুমকির মুখে বিশ্বশান্তি কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে? কতটা সত্য ও ন্যায়ের আলো দেখবে এই বিশ্বের চলমান প্রজš§? আর কত ধ্বংসলীলার শিকার হবে এই মৃত্তিকা?
এই প্রজন্ম যে যুদ্ধ কিংবা হানাহানি চায় না তা তারা বারবার বলছে। ৬৬তম জাতিসংঘ অধিবেশনে ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জাতিসংঘের স্বীকৃতি চায়’- এই দাবি উত্থাপন করেছেন ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস। হাজারো জনতা জাতিসংঘের বাইরে ২৩ সেপ্টেম্বর শান্তি সমাবেশ করেছে এর সমর্থনে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেবে। তারপরও দাবি উত্থাপন করেছেন মাহমুদ আব্বাস। গোটা বিশ্বের রাজনীতিকরা এখন মাহমুদ আব্বাসের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাই মাহমুদ আব্বাস কিংবা ফিলিস্তিনের যে অর্জন হল না, তা তো বলা যাবে না।

বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রজন্মই এখন ভুগছে চরম অস্থিরতায়। এর প্রধান কারণ সামন্তবাদ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের অবসান কামনা করে জাতিসংঘকে কয়েক হাজার বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব বারবারই তাগিদ দিয়ে আসছেন।

সেপ্টেম্বর ইলেভেনের স্মৃতিছায়ায় প্রখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা ওলিভার স্টোনের পরিচালনায় ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ নামের ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পরই ব্যাপক তোলপাড় হয় যুক্তরাষ্ট্রে। পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার ঝড় ওঠে সর্বত্র। যুক্তরাষ্ট্রের মানবতাবাদী নেতারা বলছেন, আমরা বিশ্বের কোথাও ধ্বংসলীলা দেখতে চাই না। রাজনীতিকদের কাছে গণমানুষ সেই নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু খুব নির্মম সত্য, এই নিশ্চয়তা দিতে শীর্ষ ক্ষমতাসীনরা খুব মনোযোগী নয়। আরেকটি ছোট সংবাদ দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই।

প্রেসিডেন্ট ওবামার মনোনীত ড্যান মোজেনা আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। তার মনোনয়নের অংশ হিসেবে গেল ২১ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াশিংটনে সিনেট শুনানিতে অংশগ্রহণ করেছেন। ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটাল হিলে ডারকেন সিনেট অফিস বিল্ডিংয়ে এই শুনানিতে তিনি বাংলাদেশকে একটি মধ্যপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর সঙ্গে তিনি এ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দুর্বল চর্চা, সাংঘর্ষিক রাজনীতি, দুর্নীতি ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সরকারের অস্পষ্টতাকে তার কর্মের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কংগ্রেসনাল ডকুমেন্টস অ্যান্ড পাবলিকেসন্স সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন রিলেশন্স কমিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনেটর জিনি শাহিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে বাংলাদেশ ছাড়াও বাহরাইন ও লুক্সেমবার্গের নতুন রাষ্ট্রদূত এবং একজন অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারির শুনানি গ্রহণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী এ ধরনের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সিনেট শুনানিতে অংশ নিয়ে মনোনয়নে অনুমোদন নিতে হয়।

সিনেট কমিটিতে দেয়া লিখিত ভাষণে ড্যান মোজেনা বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা সফর করে জনগণের সঙ্গে সম্প্রীতি গড়ে তোলার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মানুষ নমনীয় ও পরিশ্রমী, যার ফলে দারিদ্র্যের হার গত পাঁচ বছরে ৪০ শতাংশ থেকে ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া বাংলাদেশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে বলে সিনেটকে জানান।

ড. ইউনূসের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ড্যান মোজেনা গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে তার ইতিবাচক ধারণার কথা জানান। এর সঙ্গে ড. ইউনূসের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আচরণে তার হতাশার কথা ব্যক্ত করেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের অবদান, সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা মে মাসে ড্যান মোজেনাকে বাংলাদেশে পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যে ১৯৪৯ সালে জন্ম নেয়া পেশাদার কূটনীতিক ড্যান রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স। এর আগে তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল অবধি ড্যান মোজেনা এঙ্গোলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সংবাদটি খুব ভালোভাবেই প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে প্রথম বিশ্ব কিংবা তৃতীয় বিশ্বের যে কোন দেশের ব্যাপারে কতটা আগ্রহী। ডিভি ভিসা প্রদানের ২০১৩ এর তালিকা থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়েছে। কারণ দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে। নানা কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন উদ্বিগ্ন। নাইন-ইলেভেন এই বিশ্বে যে দুর্যোগ নামিয়েছে সেই আগুনের আঁচ সবাইকে তো সইতেই হবে কম-বেশি।