ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝে মধ্যে কিছু ‘রাজনীতিক জ্যোতিষী’ আবির্ভূত হন। তারা রাজনীতির ভবিষ্যদ্বাণী করেন। আমাদের মনে আছে, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল তেমনি একটি ভবিষ্যদ্বাণী করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। তিনি গত টার্মের বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের ব্যাপারে বলেছিলেন, ৩০ এপ্রিলের পর জোট সরকার আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। আবদুল জলিলের বক্তব্য এবং জ্যোতিষ তত্ত্ব ভুয়া প্রমাণিত হয়েছিল। চারদলীয় জোট সরকার তার মেয়াদ ঠিকই পূর্ণ করেছিল। আর আবদুল জলিল হয়ে গিয়েছিলেন ‘এপ্রিল ফুল জ্যোতিষী’।

এমনি আরেকজন জ্যোতিষী আবির্ভূত হয়েছেন সম্প্রতি। তিনি এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সম্প্রতি অলি আহমদ নিউইয়র্ক সফরে এসেছিলেন। নিউইয়র্কে এলডিপির কোন শাখা নেই। গঠন করা বোধ হয় সম্ভবও হয়নি। সেই অলি আহমদকে নিয়ে নিউইয়র্কে একটি ছোটখাটো সভা করেছেন বিএনপির কিছু সমর্থক-কর্মী। এ সভায় অলি আহমদ বলেছেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবে। তবে কীভাবে বিদায় নেবে তা আমি জানি না।’

অলি আহমদের এ বক্তব্যের বিশ্লেষণ করা যায় দুই ভাবে। একটি হচ্ছে_ তিনি প্রলাপ বকছেন, আর একটি হচ্ছে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোন ষড়যন্ত্রমূলক প্রক্রিয়ায় সরকারকে সরানোর প্রক্রিয়ায় অলি আহমদ সরাসরি জড়িত আছেন। আর আছেন বলেই তিনি জানাচ্ছেন, সরকার ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদায় নেবে!

এটা খুব পরিষ্কার অলি আহমদ বাংলাদেশে কোন শুভ রাজনীতির প্রতিভূ নন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে দাবি করেন। কিন্তু ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা শুধু ভোগের জন্যই ছিল না, তিনি এবং তার সরকার বাংলাদেশে আলবদর-রাজাকারদের রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগ দিয়েছিলেন। আগে তিনি মন্ত্রী ছিলেন। ২০০১-২০০৬ সালে চারদলীয় জোটের নেত্রী তাকে মন্ত্রিত্ব দেননি। আর মন্ত্রিত্ব পাননি বলেই বেশ কবছর অপেক্ষা করে, পরে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এটা খুবই নিশ্চিত, নিজামী-মুজাহিদ এদের পাশাপাশি যদি অলি আহমদকে একটি মন্ত্রিত্ব দেয়া হতো তবে তিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত করতেন না।

অলি আহমদ বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে এলডিপি গঠন করেন। কিন্তু তাতে বিএনপির কিছুই আসে যায়নি। বরং অলি আহমদ-জাহানারা বেগম প্রমুখরা প্রায় গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ২০০৮-এর নবম সংসদ নির্বাচনে শুধু অলি আহমদই জিতে আসেন। আর তা সম্ভব হয় তার এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয়তা ও আঞ্চলিকতার কারণে।

মনে পড়ছে, অলি আহমদ এলডিপি দলটি গঠনের পর, যুক্তরাষ্ট্রে তার দলের শাখা হচ্ছে, এমন গুজব ছড়িয়েছিল, বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা নিউইয়র্কে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘যেখানে অলি-এলডিপি, সেখানেই প্রতিরোধ’। খুব অবাক হয়ে যুক্তরাষ্ট্রবাসী বাঙালিরা দেখলেন সেসব বিএনপিপন্থি নেতা-কর্মীরাই অলি আহমদকে নিয়ে নিউইয়র্কে সমাবেশ করলেন। তার কারণ হলো এই এলডিপি প্রধান, নিঃশর্তভাবে খালেদা জিয়াকে আগামী আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন।

অলি আহমদ নিউইয়র্কে আরও বলেছেন, জিয়া এবং মঞ্জুর হত্যায় জেনারেল এরশাদ সরাসরি জড়িত ছিলেন। যদি তাই হয়, তবে বিএনপি দুই মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার পরও জিয়া হত্যা মামলায় এরশাদের বিচার করল না কেন? করতে পারল না কেন? বরং বেগম খালেদা জিয়া, এরশাদকে নিয়ে জোট করতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতার ভাগ দিতে চেয়েছিলেন। এরশাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে আওয়ামী লীগ খেলায় জিতেছে সাময়িকভাবে। আর বিএনপির দানবীয় চেহারা স্পষ্ট হয়েছে মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের সঙ্গে অাঁতাতের মাধ্যমে।

অলি আহমদ যুগপৎভাবে বিএনপি-জামায়াতের দোসর হয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করবেন? লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিকল্প ধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও গণফোরামের তিন নেতা, একিউএম বি. চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী এবং ড. কামাল হোসেন শুধু জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার কারণেই বিএনপি থেকে দূরে থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু যে অলি আহমদ নিজে বীর মুক্তিযোদ্ধার দাবি করেন, তিনি প্রকারান্তরে মৌলবাদীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে মোটেই কার্পণ্য করেননি কিংবা করছেন না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা জ্যোতিষী মূলত, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎই ভালো করে জানেন না। আবদুল জলিলের দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার পরও তিনি আজ রাজনীতি থেকে প্রায় নির্বাসিত। বাণিজ্যবিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, তার রাজনীতির সর্বশেষ পরিণতি। যে অলি আহমদ আজ ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, তিনিও একটি কমিটির চেয়ারম্যান। তার পরিণতি কী হবে, তা সময়ই বলবে।

এমন ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী আরেক রাজনৈতিক জ্যোতিষী হচ্ছেন, ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুল হক আমিনী। তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতন আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছেন।’ তা কেউ ঠেকাতে পারবে না।

আমরা খুব ভালো করে জানি, শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মহীয়সী মহিলা। তিনি তার প্রভুর প্রার্থনা নিয়মিত করেন। মহান আল্লাহর দরবারে তারও তো অনেক চাওয়া পাওয়া আছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন কেউ চাইতে পারে। তাই বলে তা নিয়ে জনসভার রাজনীতি করতে হবে কেন?

এটা বাঙালি জাতির চরম দুর্ভাগ্য, এমন কিছু ভুঁইফোড় রাজনীতিক জ্যোতিষীর কাছে তাদের জিম্মি থাকতে হচ্ছে। অথচ শটতা, কপটতার রাজনীতি বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি রাজনীতিকরা নীতিবান হতে পারতেন। তারা তা করছেন না।

একজন রাজনীতিকের মূল চেতনা কী হতে পারে, তার সম্প্রতি একটি উদাহরণ আমরা দেখতে পারি। ফিলিস্তিন সরকারপ্রধান মাহমুদ আব্বাস ৬৬তম জাতিসংঘ অধিবেশনে জাতিসংঘের সদস্যপদ চেয়ে দাবি উত্থাপন করেছেন। ২১ সেপ্টেম্বর ২০১১ বুধবার দিনটি ছিল গোটা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বারাক ওবামা-মাহমুদ আব্বাসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে মাহমুদ আব্বাস বারাক ওবামাকে জানান, তিনি জাতিসংঘে দাবি উত্থাপন করছেন। ওবামা সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেবে। তারপরও মাহমুদ আব্বাস বলেন, আমি দাবি উত্থাপন করবই।

মাহমুদ আব্বাস জানেন, তিনি এই দাবি পাস করাতে পারবেন না। তারপরও তিনি দাবি উত্থাপন করেছেন। রাজনীতিতে এই যে সুদৃঢ় চেতনা, তাই একজন রাজনীতিবিদকে শাণিত করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে যে অবিসংবাদিত নেতার আবির্ভাব হয়েছিল, তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির প্রতি তার একমাত্র প্রচেষ্টা ছিল, বাঙালি জাতির স্বাধিকার দেয়া। না তিনি ‘ধনী’ হওয়ার জন্য রাজনীতি করেননি। তার ব্যক্তিগত কোন লোভ-লালসাই ছিল না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই রাজনীতির প্রজ্ঞা ও রক্তস্রোত বহন করছেন। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে ভোগবাদীদের খুব বেশি প্রভাব। মনে রাখা দরকার, কালো টাকার মালিকরা কখনই জনস্বার্থের রাজনীতির প্রতিভূ হতে পারে না।

২০০১-এর পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর বাংলাদেশে যে অরাজকতা এবং জঙ্গিবাদের উত্থান হয়, তার প্রত্যক্ষ মদতদাতা ছিল এই কালো টাকার মালিকরাই। এরা কখনো বড় বড় বুলি আওড়ায়। কখনো জ্যোতিষী সাজে। কখনো সন্ত্রাসীদের হাতকেই করে তোলে নিজেদের হাত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন। রাজনীতি করবেন, রাজনীতিকরা। কালো টাকা অর্জন করে যদি রাজনীতি, সমাজনীতির নিয়ন্ত্রক হওয়া যায়, তবে তো জাতি একদিন মেধাবৃত্তিক রাজনীতিকশূন্য হবেই।

বাংলাদেশের গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে মুখোশধারী, শটতাপূর্ণ রাজনীতিকদের চিহ্নিত করা জরুরি। এই রাষ্ট্রের একটি মৌলিক প্রত্যয় আছে। তা হচ্ছে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ঐক্য হতে হবে সেই সূত্র ধরেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্যে ভেটো, হুমকি যেমন মাহমুদ আব্বাসের দাবি উত্থাপনকে থামাতে পারেনি, বাংলাদেশের মানুষ সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হলে কোন অপশক্তি-পরাশক্তি তা থামাতে পারবে না। আর মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থিদের দ্বারা রাষ্ট্রের পেছনে ছুরিকাঘাত ছাড়া আর কোন মহৎ কাজই সম্ভব নয়। সম্ভব হবেও না। বিষয়গুলো পরখ করতে হবে, এই রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষকেই।