ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সৌদি আরবে আটজন বাংলাদেশির প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাদের অপরাধ, তারা একজন মিসরীয়কে হত্যা করেছিল। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, জনসমক্ষে এমন আইনের কার্যকারিতা গোটা মানবসমাজের জন্য কী বার্তা জানান দিচ্ছে। একটি প্রজন্মের মননে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে এমন নৃশংসতা!

ঘটনাটিতে বাংলাদেশের কট্টরবাদী কিছু মানুষ বেশ উল্লাস প্রকাশ করছে। তারা শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ব্লগ, মুক্ত ফোরাম, মিডিয়ায় লেখালেখি করে নর্তন-কুর্দন করছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, সৌদি আরব ইসলামী আইন অনুযায়ী তা বাস্তবায়িত করেছে। ধর্মের প্রশস্তি গীতি করে তারা দাঁড়াতে চাইছে কট্টরবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র সৌদি আরবের পক্ষে।

ধর্ম এবং শান্তি বিষয়ে বিশ্বের অনেক মনীষীর অনেক বাণীই আমরা জানি। কোন বীভৎস, ভীতিকর দৃশ্য মানুষের মনে কেমন প্রভাব বিস্তার করে তা নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তাছাড়া সমকালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আইনের উপযোগিতা নিয়েও কথা রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন যুক্তি। রয়েছে ভাষাগত সমস্যা। ঐ দেশে বিচার হয় আরবী ভাষায়।
বাংলাদেশী শ্রমিকরা কী অনর্গল আরবী ভাষায় কথা বলতে পারেন ?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বেদুইন, বর্বর, অজ্ঞ এবং হানাহানির অন্যতম হোতাদের ভূমি আরব মুল্লুকেই সব নবী ও রাসুলরা আবির্ভূত হয়েছিলেন। সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আমরা তার বিদায় হজের ভাষণের দিকে তাকাতে পারি। সেই ঐতিহাসিক মহান ভাষণে তিনি বিশ্বমানবকে সাম্যের বাণী শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আজ থেকে বিশ্বে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করছি। মানুষ মানুষের প্রভু নয়। একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তাই মানুষের প্রভু।

কথা হচ্ছে, এই দর্শনটি কি আরব মুল্লুকে মেনে চলা হচ্ছে? না হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে যারা চাকরি নিয়ে যান, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু হয় এয়ারপোর্ট থেকেই। যখন একজন লোক এয়ারপোর্ট থেকে বের হন, এর সঙ্গে সঙ্গেই তার পাসপোর্টটি দিয়ে দিতে হয় তার কোম্পানির মালিক অথবা প্রতিনিধির হাতে। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় ‘শ্রমিক কোয়ার্টারে’। গাদাগাদি করে বাস, অমানবিক আচরণ প্রথমেই একজন শ্রমিকের মন ও মানসিকতাকে বিষিয়ে তোলে। বেতনের চুক্তিও অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না।

এ বিষয়টি অনেকেরই হয়তো জানা আছে, মধ্যপ্রাচ্যে দুই ক্যাটাগরির ভিসা আছে। একটি ‘কোম্পানি ভিসা’ আর অন্যটি হচ্ছে ‘ফ্রি ভিসা’। এর মধ্যে কিছু কিছু কোম্পানি আছে, যারা নামসর্বস্ব। এদের মূলত কোন কর্ম প্রজেক্ট নেই। তারা কোম্পানরি নাম দেখিয়ে, প্রভাব খাটিয়ে সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ভিসা বের করে। বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে গিয়ে এদের ‘ফ্রি কাজ’ করার জন্য ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ যেখানে যে কাজ পাও কর। এর জন্য স্পন্সরকে মাসিক কমিশনও দিতে হয়। নিজে কাজ খুঁজে বের করে প্রতি মাসে স্পন্সরকে কমিশন দিতে তাই অনেক শ্রমিককেই হিমশিম খেতে হয়। নেমে আসে তাদের নানারকম মানসিক যাতনা। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার গ্লানি কুরে কুরে খায়।
মধ্যপ্রাচ্যে মূলত ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কোন ভিসাই নেই। কোম্পানির নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ভাঙিয়ে শ্রম অধিদফতর থেকে ভিসা বের করে আরব ‘কফিল’রা উচ্চমূল্যে বিভিন্ন দালালের কাছে বিক্রি করে। কথা হচ্ছে, যদি কোন কোম্পানির আদৌ কোন কর্মক্ষেত্র না থাকে সংশ্লিষ্ট দেশের লেবার ডিপার্টমেন্ট ওই কোম্পানিকে লোক আনার অনুমোদন দেবে কেন? ওইসব দেশে লোক নিয়ে গিয়ে কমিশন মুনাফার লক্ষ্যে বেকারত্ব, হতাশা তৈরি করাটাও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। সে বিষয়ে ওইসব দেশ পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেন?

সম্প্রতি সৌদি আরবে আটজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনার পর আমরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে অনেকগুলো যোগাত্মক-বিয়োগাত্মক সংবাদ দেখছি। ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নানা অপকর্ম। এর কিছু ক্লিপিং আমি খুব মনযোগ দিয়ে দেখেছি। আরবি ভাষা রপ্ত থাকার কারণে বিষয়গুলো বুঝতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি। এসব তথ্যচিত্রে দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবে বাংলাদেশিরা লাঠিসোঁটা নিয়ে কীভাবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে। কীভাবে একটি সংঘবদ্ধচক্র সৌদি আরবে গণিকাবৃত্তির মতো জঘন্য পেশার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। কীভাবে সংঘবদ্ধ চুরি, খুন, ছিনতাইয়ের মতো নিকৃষ্টতম ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসা করছে ইত্যাদি।

বিষয়গুলো অবশ্যই অপরাধ। স্বদেশে কিংবা বিদেশে কোথাও এমন কর্মযজ্ঞকে সাপোর্ট করা যায় না; করা উচিতও নয়। এছাড়া সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে এসব অপকর্মের শাস্তি কী, তা-ও শ্রমিকদের অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও তারা এসব করছে। কেন করছে? মানুষ কীভাবে, কখন, অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে? কেন সে মারমুখো হয়?

এসব বিষয়ের কিছু মনস্তাত্তি্বক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেলে আদম রপ্তানিকারক সংগঠন ‘বায়রা’র একজন কর্মকর্তার মন্তব্য দেখলাম। তিনি বলেছেন, বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মারাত্মক অপরাধজনিত কর্মে জড়িয়ে পড়ায় কুয়েত, সৌদি আরব, ওমানসহ অনেক দেশের কোম্পানি এখন বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিচ্ছে না।

তিনি বলেছেন, নিজ কোম্পানির মালিককে খুন করে ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মতো জঘন্য অপরাধ পর্যন্ত বাংলাদেশিরা মধ্যপ্রাচ্যে করেছে। তিনি বলেন, ক্রিমিনাল, সে মক্কায় গিয়েও তার চরিত্র বদল করবে না।
এ বিষয়ে আমি কিছু প্রশ্নের অবতারণা করতে চাই। মনে রাখা দরকার, কোন বিদেশি শ্রমিক তার নিজ কোম্পানির মালিককে হত্যা করার মানসিকতা নিয়ে বা ওই প্রস্তুতি নিয়ে বিদেশে যায়নি। তাকে ‘অপরাধী’ হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে সেখানের সার্বিক পারিপাশ্বর্িক অবস্থা। একজন শ্রমিক মাসের পর মাস কাজ করে বেতন পাবে না, একটি ছোট্ট কামরায় গাদাগাদি করে দশজনকে ঘুমাতে হবে, সময়মতো খাবার, পানীয় জল, মলমূত্র ত্যাগের ফুরসতও পাবে ন-এমন কোন ধারাকে তো বিশ্বশ্রমিক সংবিধান স্বীকৃতি দেয়নি।

অথচ আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো কোম্পানিতে শ্রমিক চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখানে আরও ন্যক্কারজনক বৈষম্য হলো এই, আরব মুল্লুকের অনেক কোম্পানি ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান শ্রমিকদের সঙ্গে যে আচরণ করে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ আচরণ করে। অথচ এটা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, বাংলাদেশি শ্রমিকরা অধিকতর কর্মঠ, অনুগত এবং নিয়মানুবর্তিতার অনুশীলনকারী।

এর জন্য দায়ী কে বা কারা, তা খোঁজা খুবই জরুরি। বাংলাদেশি শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে, তার সমাধানে ওইসব দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয় এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে কি না, সে বিষয়েরও উপাত্ত অন্বেষণ জরুরি।

এবার আসা যাক, আরব দেশগুলোর প্রচলিত আইন প্রসঙ্গে। মনে রাখা দরকার, মধ্যপ্রাচ্যে আরবি একটি কথা বহুল প্রচারিত আছে। তা হচ্ছে_ ‘আল ওয়াস্তা আল ফুক মিন কানুন।’ অর্থাৎ ‘খাতির সবসময়ই আইনের ঊর্ধে।’ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে সে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষভাবে সঞ্চয় করেছি। মূল কথা হচ্ছে, যার হাত যত লম্বা, আইন তারই সহায়। হ্যাঁ, খায়-খাতির থাকলে আইন অমান্য করা মধ্যপ্রাচ্যে কোন বিষয় নয় সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য। সমস্যা কেবল বিদেশি ‘নফর’দের বেলায়। যারা মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের ক্রীতদাস হিসেবেই কর্মজীবন কাটায়।

আর ইউরোপ-আমেরিকায় এসে মধ্যপ্রাচ্যের শায়খ, ধনিকরা কী করে, তা হয়তো কেউ কেউ অনুমানই করতে পারেন। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন, যিনি নিউইয়র্কে একটি ফাইভ স্টার হোটেলে কাজ করেন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে। একদিন তিনি আমাকে একটি বিল দেখালেন। একজন সৌদি শায়খ তাদের হোটেল স্যুটে এক রাতে ৩৫ হাজার ডলারেরও বেশি খরচ করেছেন। মদ, এসকর্ট সার্ভিস (নারীসঙ্গ)-সহ আমোদ-আপ্যায়নে এক রাতেই তার এই খরচ। পেট্রো ডলার এভাবেই উড়ছে ইউরোপ-আমেরিকার হাওয়ায়। আরব শায়খরা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এসে যে বেলেল্লাপনা করে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আর স্বদেশে তাদের বহুবিবাহ, নৈতিক স্খলনের কথা তো বিশ্বস্বীকৃতি। হ্যাঁ, মধ্যপ্রাচ্য তথা সৌদি আরবে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের মতো জঘন্য আইন এখনো বলবৎ থেকে গেছে; যা বিশ্ব মানবতার জন্য কলঙ্কজনক তো বটেই। মৃত্যুদন্ড বিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন পন্থায় কার্যকর হয়। কিন্তু প্রকাশ্য জনপথে মুন্ডুপাতের এই বীভৎস উল্লাসের আইন কেন সংশোধন করা হচ্ছে না?

সম্প্রতি সৌদি আরবে আটজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের পর বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান একটি টিভিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, সৌদিরা হত্যার বদলে বিচার হিসেবে প্রকাশ্যে মুন্ডুপাতের যে আইন বহাল রেখেছে, তা এই একবিংশ শতাব্দীতে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ প্রক্রিয়ার অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার-আলবদরদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা জানি, সৌদি আরব এসব যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে নেপথ্যে দূতিয়ালি করছে। এই শিরশ্ছেদের ঘটনার পর সৌদি আরবের কোনমতেই উচিত হবে না, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে নাক গলানো। ড. মিজানুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে সৌদিদের কোন কথা বলার অধিকার নেই।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সৌদি আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোন দেশে অপরাধের জন্য ইউরোপ-আমেরিকার কোন নাগরিকের এভাবে মুন্ডুপাত সাম্প্রতিককালে হয়নি। ওইসব দেশের স্থানীয় দূতাবাস যে কোনভাবেই হোক, তাদের নাগরিককে ছাড়িয়ে এনেছে। শুধু পারেনি বাংলাদেশ। লক্ষ্য করলে আরও দেখা যাবে, বিভিন্ন অপরাধে স্থানীয় বাসিন্দা সৌদিদের যাদের মৃত্যুদ- হচ্ছে, এরাও গরিব শ্রেণীর প্রজা। কোন ধনী শায়খের মৃত্যুদ- কার্যকর হতে আমরা দেখিনি। অথচ এসব শায়খ অহরহ সুরা পান করছে, অর্থের লিপ্সা দেখিয়ে এক ধরনের জেনা-ব্যাভিচারে মত্ত রয়েছে। সৌদি রাজতন্ত্রের দানবদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রকাশ্যে মুন্ডুপাতের আইনটি বাতিল কিংবা সংশোধনের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। একই মত ব্যক্ত করেছেন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর নিউইয়র্ক অফিসের সিনিয়র কর্মকর্তারাও। বলা দরকার, বাংলাদেশের কোন চিহ্নিত সন্ত্রাসী, জঙ্গি বিদেশে গিয়ে যাতে দানবে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকেও সতর্ক হতে হবে। প্রতিটি বিদেশ যাত্রীর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক, পুলিশি ক্লিয়ারেন্সে কড়াকড়ি অবশ্যই বাড়াতে হবে।