ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বললেন, সম্মানজনক মৃত্যু, মানুষের মৌলিক অধিকার। গাদ্দাফিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা নিন্দনীয়। এর আগে তিনি বলেছিলেন, একটি স্বৈরশাসক যুগের অবসান হয়েছে।

আচ্ছা, একজন যুদ্ধবন্দিকে কি নির্মমভাবে হত্যা করা যায়? না, যায় না। অন্তত জাতিসংঘ সংবিধান সেই সাক্ষ্য দেয়। কিছুই মানা হয়নি। আহত মুয়াম্মার আল গাদ্দাফিকে টেনে-হিঁচড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তা ক্রমশ প্রমাণিত হচ্ছে। আরও হবে। ইতিহাস তা লিখে রাখবে। রাখতেই হবে। তা না হলে, মানুষের ইতিহাস, মানবতার ইতিহাস মুছে যাবে।

গাদ্দাফি নিজ জন্মভূমেই নিহত হয়েছেন। তার অনেক দোষ ছিল। তিনি প্রায় ৪২ বছর লিবিয়ার স্বৈরশাসক ছিলেন। অনেক বিচার (!) করেছেন গোপনে, প্রকাশ্যে। হত্যা করেছেন অনেক মানুষ।বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীদেরকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। ছিল তার চরম দাম্ভিকতা।

বলা দরকার, তিনি লিবিয়ার রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তখন লিবিয়ার বাদশাহ ছিলেন সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিস বিন মুহাম্মদ আল মাহদি। ১৯৬৯ সালে গাদ্দাফির নেতৃত্বে ছোট্ট একটি সামরিক গ্রুপ লিবিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।

কেন তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন? নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য। কিন্তু তিনি তা কতটুকু করেছিলেন? আদৌ করেছিলেন কি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু পেছনে ফিরে দেখা দরকার।

কিশোর বয়সেই তিনি ছিলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ও তার আরব সমাজবাদের ভক্ত। জাতীয়তাবোধের আদর্শে উজ্জীবিত। ১৯৫৬ সাল থেকে তিনি ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নেন। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর জুনিয়র একটি দলকে নিয়ে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেন বাদশা ইদ্রিসকে। ওই সময় বাদশা ইদ্রিস চিকিৎসার জন্য ছিলেন তুরস্কে। এরপর বাদশার ভাইপো যুবরাজ সাঈদ হাসান অর রিদা আল মাহদিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় একদল বিপ্লবী সেনা কর্মকর্তা। রিদা আল মাহদিকে করা হয় গৃহবন্দি। এভাবে মুয়াম্মার গাদ্দাফির নেতৃত্বে লিবিয়া রাজতন্ত্রমুক্ত হয়। লিবিয়াকে ঘোষণা করা হয় ‘লিবিয়ান আরব রিপাবলিক’। তখন গাদ্দাফির বয়স মাত্র ২৭ বছর। সাফারি স্যুট ও সানগ্লাস পরা গাদ্দাফি যেন হয়ে ওঠেন আরেক চেগুয়েভারা।

তারপর থেকে ক্রমশ লিবিয়া হয়ে ওঠে পশ্চিমাবিরোধী একটি শক্তি। ১৯৭০ সালে তিনি লিবিয়া থেকে ইতালিয়ানদের তাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। এর ফলে লিবিয়া থেকে ইতালীয়রা সরে পড়তে থাকে। এমন সময় দেশ চালাতে গঠন করা হয় ‘রেভ্যুলিউশনারি কমান্ড কাউন্সিল’। এর চেয়ারম্যান করা হয় গাদ্দাফিকে। ১৯৭০ সালে তার নামের সঙ্গে যোগ করা হয় প্রধানমন্ত্রী খেতাব। তবে সেই পদে তিনি বেশি দিন থাকেননি। ১৯৭২ সালেই ওই খেতাব বাদ দেন। অন্য সামরিক বিপ্লবীদের মতো গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করেও নিজেকে জেনারেল হিসেবে ঘোষণা দেননি। তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন। ক্ষমতা দখল করার পর সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তিনি কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। তারপর থেকে তিনি সেই কর্নেল পদেই বহাল ছিলেন। একজন কর্নেল দেশ শাসন করেন এমন ঘটনা পশ্চিমা দুনিয়ায় বিরল। গাদ্দাফি তার দেশের জন্য একটি স্লোগান চালু করেন। তা হল, লিবিয়া ‘জনগণ কর্তৃক পরিচালিত’। কিন্তু সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি নিজে। মানুষের কোন বাকস্বাধীনতা ছিল না।

১৯৭৭ সালে তিনি ঘোষণা দেন লিবিয়া তার সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। প্রজাতন্ত্র থেকে লিবিয়া পরিণত হচ্ছে ‘আরব জামাহিরিয়ায়’। এর অর্থ লিবিয়া হল, জনমানুষের সরকারের দেশ। প্রকৃতপক্ষে লিবিয়া পরিণত হয় গণতান্ত্রিক সরকারের নামে একটি গোষ্ঠীর শাসনভূমিতে। এক ধরনের ‘বাদশাহি’ প্রবর্তন করেন গাদ্দাফি নিজেই।

লিবিয়ায় গঠন করা হয় বিভিন্ন কাউন্সিল ও স্বশাসিত ক্ষুদ্রতম এলাকা। আর সব কাঠামোর ওপরে রাখা হয় জেনারেল পিপলস কংগ্রেস। এর সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি। গাদ্দাফি দেশকে দেন সমঅধিকারের দর্শন। মাঝেমধ্যেই তিনি অভ্যন্তরীণ ও অন্য দেশের বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। বিদেশে বসবাসকারী ভিন্নমতাবলম্বী লিবিয়ানদের ১৯৮০ সালের এপ্রিলে হত্যা করার আহ্বান জানায় তার রেভ্যুলিউশনারি কমিটি। এজন্য লিবিয়ার হিট স্কোয়াডকে বিদেশে পাঠানো হয়। ১৯৮০ সালের ২৬ এপ্রিল গাদ্দাফি ওইসব ভিন্নমতাবলম্বীকে দেশে ফিরে আসার জন্য একই সালের ১১ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। বলা হয়, তারা দেশে ফিরে না গেলে তুলে দেয়া হবে রেভ্যুলিউশনারি কমিটির হাতে। ওই সময়ে হত্যা করা হয় মোট ৯ লিবিয়ানকে। এর মধ্যে ৫ জনকে হত্যা করা হয় ইতালিতে। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর এভাবেই তিনি ক্রমশ খড়গ নামাতে থাকেন। অন্যদিকে বিভিন্ন পরাশক্তি গাদ্দাফিবিরোধী মোর্চাকে মদদ দিতে থাকে।

আরব দেশগুলো নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল বিশাল। তিনি ১৯৭২ সালে ‘ফেডারেশন অব আরব রিপাবলিকস’ ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে তিনি একটি একীভূত আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা করেছিলেন। কিন্তু সে আহ্বানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনটি দেশ। ফলে একীভূত আরব গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এ লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৪ সালে তিউনেসিয়ার হাবিব বারগুইবার সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু সে উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। আউজোউ উপত্যকা নিয়ে প্রতিবেশী দেশ চাদের সঙ্গে লিবিয়ার বেশ কয়েকবার উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। লিবিয়া ওই উপত্যকা দখল করে ১৯৭৩ সালে। আপত্তি ওঠে তা নিয়েই। এ নিয়ে একবার যুদ্ধও হয়। পরে তা ১৯৮৭ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের ১৯৯৪ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারির এক রায়ের ফলে চাদ থেকে লিবিয়া সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়। গাদ্দাফি ফিলিস্তিনের ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’-এর একজন ভক্তে পরিণত হন। তবে পশ্চিমাবিরোধী নীতির কারণে গাদ্দাফিকে পশ্চিমারা সব সময়ই নেতিবাচক চোখে দেখেছে। কূটনৈতিক অঙ্গনেও তার প্রতি দৃষ্টি তেমনই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময় লিবিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্কে টান টান উত্তেজনা দেখা দেয়। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে গাদ্দাফির আপসহীন অবস্থানের কারণে ওই সময় পশ্চিমা শক্তিগুলো মিলে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে। রোনাল্ড প্রশাসন লিবিয়াকে একটি ‘যুদ্ধবাজ বদমাশ রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করে। রোনাল্ড রিগ্যান নিজেই গাদ্দাফিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার নাগরিকদের লিবিয়া সফর বাতিল করতে তাদের পাসপোর্ট অকার্যকর করে দেয়। ১৯৮২ সালের মার্চে লিবিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে লিবিয়ার তেল শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবিতে প্যানঅ্যাম এয়ারলাইন্সের একটি জাম্বো জেট বিমানে বোমা হামলায় ২৭০ জন নিহতের ঘটনায় গাদ্দাফির জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পরিকল্পনা করার জন্য অভিযুক্ত হন একজন লিবীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা। বহু বছর ধরে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন তিনি। এর ফলে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয় লিবিয়াকে। ১৯৯৯ সালে লকারবি বিমান হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন দু’জনকে হস্তান্তর করে গাদ্দাফি প্রশাসন। স্কটল্যান্ডের আদালতে তাদের একজন দোষী সাব্যস্ত হন। গাদ্দাফি প্রশাসন এ বোমা হামলার দায় স্বীকার করে নেয়। এ ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের এক কোটি ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন তিনি। এছাড়া তার দখলে থাকা গণবিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করার ঘোষণাও দেন। এর ফলে তার প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর মনোভাবের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ লিবিয়ার ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ায় লিবিয়ার অর্থনীতি বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে আবারও লিবিয়া সফর করেন ব্লেয়ার। তবে ২০০৯ সালে অভিযুক্ত লিবীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরলে গাদ্দাফির পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেয়ায় আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সমালোচনার মুখে পড়েন গাদ্দাফি।

২০০৯ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে আসেন গাদ্দাফি। এ অধিবেশনে ১৫ মিনিটের বদলে দেড় ঘণ্টা ভাষণ দেন, জাতিসংঘের নীতিমালার অনুলিপি ছিঁড়ে ফেলেন এবং নিরাপত্তা পরিষদকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার সঙ্গে তুলনা করেন। একই সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর জন্য ৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। ২০১০ সালে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্দেশে ইতালি সফর করেন গাদ্দাফি। কিন্তু সফরের সময় প্রায় ২০০ ইতালীয় নারীকে ইসলামধর্ম গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানালে গাদ্দাফির মূল উদ্দেশ্য ঢাকা পড়ে যায়।

২০১১ সালের ফেব্র“য়ারিতে গাদ্দাফির শাসনের বিরুদ্ধে লিবিয়ায় গণআন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু ওই গণআন্দোলনকে তেমন আমল না দিয়ে কঠোর হস্তে দমনের চেষ্টা চালান গাদ্দাফি। পরে এ গণআন্দোলন গণবিদ্রোহে রূপ নেয় যা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। গৃহযুদ্ধ বাধার পর পরই জাতিসংঘ গাদ্দাফিবিরোধী ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এনটিসি) সমর্থন দেয়া শুরু করে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ এর মদদ জোগায়। ন্যাটো লিবিয়ায় আক্রমণ শুরু করে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ এনটিসি, জাতিসংঘ অধিবেশনে লিবিয়ার আসনটি পেয়ে যায়। এনটিসিই হয়ে ওঠে লিবিয়ার অঘোষিত সরকার।

গাদ্দাফির অন্যতম গুণ ছিল তিনি তার দেশ মাতৃকাকে ভালোবাসতেন। নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ তার কাছে ছিল অনেক বড়। ফলে লিবিয়ায় তেল উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো যা-তা করতে পারত না। তার অনুগত সেনাবাহিনীও ছিল বেশ শক্তিশালী। প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য লিবিয়ার ১১টি সীমান্ত এলাকাকে ৪টি জোনে ভাগ করে সব সময় আগলে রাখত। তার সেনাবাহিনীতে আরও ছিল ১০ ট্যাংক ব্যাটালিয়ন, ১০ মেকানাইজড ইনফ্যানট্রি ব্যাটালিয়ন, ১৮ ইনফ্যানট্রি ব্যাটালিয়ন, ৬ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, ২২ আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন, ৪ এসএসএম ব্রিগেড এবং ৭ এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন। দেশকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত করার কাজটি তিনি করেছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায়। ’৭০ এবং ৮০’র দশকে তিনি ভারী অস্ত্র এবং যুদ্ধের নানা সরঞ্জাম ক্রয় করেছিলেন দেশটি থেকে। যেগুলোর বেশির ভাগই এখনও দেশটির অস্ত্রভাণ্ডারে মজুদ আছে। কিন্তু একসময় সবকিছুই তার বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে আটমাস সময়ের মাঝে।

ইরাকের সাদ্দাম হোসেন নিহত হওয়ার পর খুব মুষড়ে পড়েছিলেন গাদ্দাফি। যদি এসময় রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতেন তবুও হয়তো তার এমন পরিণতি হতো না। বলার অপেক্ষা রাখে না, গাদ্দাফিকে যেভাবে মারা হয়েছে তা কোনাভবেই মেনে নেয়া যায় না। তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। আল জাজিরায় প্রচারিত মোবাইলে তোলা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি ট্রাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বসে আছেন গাদ্দাফি। এরপরই দেখা গেল মাটিতে পড়ে আছেন ক্ষতবিক্ষত গাদ্দাফি। মাঝে কী কী ঘটেছে তা এখনও জানা যায়নি।

লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল ফরেনসিক রিপোর্টের বরাত দিয়ে ত্রিপোলিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ২০ অক্টোবর সিরতে এনটিসি বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের একপর্যায়ে গাদ্দাফির মাথায় গুলি লাগে। অর্থাৎ ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয় তার। জিবরিল বলেন, আমি ফরেনসিক রিপোর্ট পড়ে শোনাচ্ছি। গাদ্দাফি সিরতের একটি পানি নিষ্কাশন পাইপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর সামনে কাউকে না দেখে চলে যেতে থাকলে এনটিসি যোদ্ধারা তাকে গুলি করে। গুলি লাগে ডান হাতে। এরপর আহত অবস্থায় তাকে ট্রাকে ওঠানো হয়। সেসময় শরীরের আর কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এরপর তাকে বহনকারী গাড়িটি যখন চলতে শুরু করে সেসময় আক্রমণ চালায় গাদ্দাফির যোদ্ধারা। ফের শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ। সেসময় মাথায় গুলি লাগে গাদ্দাফির। তবে কার গুলি লেগেছে তা রিপোর্টে নেই। জিবরিল আরও বলেন, সিরতে ত্যাগের সময় গাদ্দাফি জীবিত ছিলেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা যান। আর ডিএনএ, চুল ও রক্ত পরীক্ষায় গাদ্দাফির মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। তাকে হত্যা করার পর মার্কিন মুল্লুকেও বেশ আনন্দ প্রকাশ করেছেন শাসকগোষ্ঠী। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, একটি কলংকময় যুগের অবসান হয়েছে।

আমরা জানি, লিবিয়ায় আরেকটি হামিদ কারজাই-নূরি আল মালিকী সরকার আসবে। লিবিয়ার তেলসম্পদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি বাড়বে এই গৃহযুদ্ধের নেপথ্য নায়কদের। মূল লক্ষ্য ছিল, লিবিয়ার মানুষকে গণতন্ত্র উপহার দেয়া- একথা যারা বলছেন তারা সৈন্য ফিরিয়ে নেবেন লিবিয়া থেকে অক্টোবরের মধ্যেই। এসেছে সেই ঘোষণাও। তারপরও গাদ্দাফি নিজে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন, একজন সেরা জাতীয়তাবাদী ছিলেন তা ইতিহাসকে স্বীকার করতেই হবে। তিনি যদি স্বৈরশাসক না হতেন, তিনি যদি ৪২ বছর লিবিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান না থাকতেন তাহলে এমন পরিণতি তার হতো না। বিশ্বের আরও বাদশাহ, স্বৈরশাসকদের তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নেয়া উচিত। গণতন্ত্রের নাম ভাঙিয়ে যারা মানবতাবাদকে ভূলুণ্ঠিত করছেন, ইতিহাস তাদেরও ক্ষমা করবে না। সামন্তবাদী সেসব নায়করাও গণমানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন একদিন।