ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমরা একটি কথা প্রায়ই শুনি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ভূমিকা রাখছে। পনেরো কোটির বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। এই দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজ-স্কুলগুলো সব ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাব্যবস্থার সংকুলান করতে পারবে, এমন প্রত্যাশা করার কোন কারণ নেই। বিশ্বের অন্য সব দেশেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অধিকসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা নিশ্চিত করে থাকে। সরকার কর্তৃক পরিচালিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক দেশে ছাত্রছাত্রী যেতেই চায় না। ফলে সরকারনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের বেশি সুবিধা যেমন ফাইনান্সিয়াল এইড, স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। যাতে তারা সহজে ছাত্রছাত্রী জোগাড় করতে পারে।

একটি বিষয় আমাকে খুব বেশি ভাবায়। আমরা যখন কলেজে পড়তাম, তখন থেকেই বিষয়টি আমাকে বেশ পীড়া দিত। কলেজের প্রতিটি ক্লাসেই সে সময় রোল-কল হতো। এখনো কি হয়? বর্তমানের অবস্থা আমার জানা নেই। পাঠক, ক্ষমা করবেন। কলেজের প্রতিটি ক্লাসের স্থায়িত্ব হয় ৪০-৪৫ মিনিট। এর মধ্যে ১২-১৫ মিনিট চলে যায় রোল-কল করতে করতে। এই সময়টি কোন সৃজনশীল কাজেই লাগে না। শুধু হাজিরা রক্ষার মহড়া পালিত হয়। যদি প্রতিদিন ছয়টি ক্লাস থাকে তবে দেখা যাচ্ছে গড়ে প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা (১৫ মিনিট হিসেবে ছয় ক্লাসে) শুধু হাজিরা খাতেই ব্যয় হচ্ছে। এই সময় কিন্তু শিক্ষার কাজে ব্যয় করা যেত। কেন যাচ্ছে না?

প্রতিটি ক্লাসে হাজিরা দেয়ার এমন রেওয়াজ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নেই। একজন ছাত্রকে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয় নিজ নিয়মানুবর্তিতা থেকেই। উপস্থিত না থাকলে ক্ষতিটা নিজেরই হচ্ছে। এই যে মানসিক পরিবর্তন, তা হওয়া উচিত প্রতিটি সৃজনশীল ছাত্রছাত্রীর। সমতা রক্ষা করা উচিত গোটা বিশ্বের সঙ্গে।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই এখন কম্পিউটারাইজড অ্যাটেনডেন্স কার্ড পাঞ্চিং সিস্টেম চালু হয়েছে। ছাত্রছাত্রীকে ক্লাসে ঢোকার সময় ওই কার্ড পাঞ্চ করে ঢুকতে হয়। এতে সময় সাশ্রয় হয় অনেক বেশি। বাংলাদেশের বর্তমান আধুনিক স্কুল-কলেজগুলো কি এসব ব্যবস্থার কথা ভাবছে? মনে রাখতে হবে, পরিবর্তনের কথা শুধু মুখে বললেই হবে না। ডিজিটাল পরিবর্তন বলুন আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কথাই বলুন, ব্যবহারিক জীবনে এর ব্যাপক প্রয়োগ ঘটাতে হবে, চালু করতে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানাভাবে এগোনোর চেষ্টা করছে। শিক্ষা এর একটি অন্যতম বিষয়। পাশ্চাত্যের সব দেশেই যে উচ্চশিক্ষিতের হার খুব বাড়ছে, তা ঠিক নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্রতন্ত্রের একটি অন্যতম নীতি হচ্ছে, রাষ্ট্রের সব মানুষই যেন উচ্চশিক্ষিত না হয়। যদি তা-ই হয়, তবে ম্যাকডোনাল্ড, বার্গার কিং, পিজা হাটয়ের মতো ফাস্টফুডের দোকানে কে কাজ করবে? অথবা ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোর বড় বড় দফতরে নৈশপ্রহরীর কাজগুলো কে করবে?

না, আমি কোন পেশার প্রতি কটাক্ষ করে এমনটি বলছি না। বলছি বৈষম্যের সিঁড়ি বজায় রাখার সনাতনী প্রথার কথা। করপোরেট বাণিজ্যবাদীরা সব সময়ই চায় একটি শ্রেণী কুলি-মজুরের কাজের জন্য তাদের গুদামঘরগুলোর ধরনা অব্যাহত রাখুক। এটা বিশ্বের সেরা ধনী দেশগুলোর মনন থেকে এখনো সরে যায়নি।

আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও বিচিত্র। এখানে রাজনীতিবিদদের অনেকেই চান না প্রজন্ম সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার বুঝে নিক। কারণ সেটাই যদি ঘটে যায় তবে জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-ঘেরাওয়ের মতো কাজগুলোতে মাঠে থাকবে কে।

সমকালীন প্রকৃত শিক্ষা প্রদান এবং গ্রহণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে একটি আধুনিক কারিকুলাম। বেশ দুঃখের সঙ্গেই বলতে পারি, স্কুলজীবনে ইতিহাস পড়তে গিয়ে আমরা পাকিস্তানের যুদ্ধ আর আকবর, বাবর, আওরঙ্গজের আলীবর্দী খাঁদের কৃতিত্বের কথা পড়েছি। ভাবি, এসব বিষয় কি এখন আমার প্রাত্যাহিক জীবনে কোন কাজে লাগছে? না লাগছে না।

ধরা যাক, অঙ্কশাস্ত্রের কথা। সুদকষা শিখতে গিয়ে আমরা শিখেছি গোয়ালা দুধ বিক্রি করতে গিয়ে অনুপাত সমানুপাত হারে কীভাবে দুধের সঙ্গে পানি মেশায়। তার পর কীভাবে তা বিক্রি করে। সন্দেহ নেই, বিষয়টি খুবই অনৈতিক। এক ধরনের প্রতারণার শামিল। অঙ্কের তো আরও অনেক চমৎকার বিষয় আছে। তাহলে এসব বিষয় আমাদের শেখানো হয়েছিল কেন? বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামে এসব বিষয়ের সংযোজন-বিয়োজন খুবই জরুরি। সত্তর দশকের পরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সাইন্স, আর্টস, কমার্সই ছিল প্রধান বিভাগ। সে সময় যারা অনার্স পড়তেন তারা ছিলেন অধিক ভাগ্যবান। মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল কলেজে ছাত্রদের প্রতিযোগিতা বেশি থাকলেও কৃষি, শিল্প, ফাইন আর্টস, লিবারেল আর্টস, ফ্যাশন ডিজাইন- এসব অনুষদে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক ছিল কম।

আশার কথা, গত তিরিশ বছরে এমন অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ব্যাচেলর কিংবা মাস্টার্স করার ইচ্ছে এখন অনেক ছাত্রছাত্রীই করেন। এর পাশাপাশি কম্পিউটার সাইন্স, গ্রাফিক্স, ডিজাইন, ফ্যাশন আর্টস, ভূতত্ত্ব্ব, খনিজসম্পদ তত্ত্ব, সৌরতত্ত্ব, বন ও পরিবেশতত্ত্ব, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণতত্ত্ব, পুষ্টিবিদতত্ত্ব, এমন অনেক সমকালীন আধুনিক বিষয় গঠিত হচ্ছে বিশ্বে এ সময়ের বিদ্যা নিকেতনে। মনে রাখা দরকার নরসুন্দর কিংবা নাপিতের পেশার জন্যও পাশ্চাত্যে স্কুল রয়েছে। সেই পাট চুকিয়ে লাইসেন্স নিয়েই তবে সেলুনে কাজ পেতে হয়। কথায় কথায় আমরা ‘তুমি কি বেবি সিটিং করছ’ বলে যে মশকরা করি, সেই বেবি সিটিং করতে হলেও পাশ্চাত্যে ট্রেনিং এবং লাইসেন্স দুটোই নিতে হয়।

এ বিষয়গুলো মনে রেখেই আমাদের বাঙালি প্রজন্মকে গড়ে উঠতে হবে। বাংলাদেশে মাদ্রাসাশিক্ষা একটি স্থান দখল করছে ক্রমে। যারা মাদ্রাসায় পড়বে তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং সৃজনশীল আধুনিকতা শিক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক বিষয়। তা কোনদিনই শেষ হয় না। কর্মজীবনের জন্য অপরিহার্য শিক্ষা গ্রহণ করে কাজ করে খাওয়া যায়। কিন্তু মেধা বিকাশ এবং মননের উৎকর্ষ সাধনের কাজটি থেকে যায় আজীবন। বিভিন্ন দেশে ষাট বছর বয়সেও পিএইচ-ডি করার খবর আমরা প্রায়ই পত্রপত্রিকায় পড়ি। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীই শুধু পাঠ্য বই নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সংবাদপত্র, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত, চিত্রকলা, নাটক প্রভৃতি মননের বাতায়ন খুলে দেয়। প্রকৃত শিক্ষার্থীর উচিত এসব বিষয়ে পড়াশোনা করা। জ্ঞানের পরিচর্যা নিয়মিত অব্যাহত রাখা।

এ প্রসঙ্গে আমার এক সুহৃদ ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, গবেষক ড. জনসন বার্নস বলেন, আমার মা আমাকে নিয়ে খুব দরিদ্র জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু কিছু অর্থ হলেই তা থেকে তিনি আমাকে বই কিনে দিতেন। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ভালো ভালো মুভি এনে দেখাতেন। তাই আমি প্রতিবছরই বিভিন্ন লাইব্রেরিতে কয়েক হাজার ডলারের বই ডোনেট করি। এটাই হচ্ছে জ্ঞান বিতরণের অনুচক্র। আমাদের প্রজন্ম সে শিক্ষায় শিক্ষিত হোক।