ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ সম্প্রতি একটি সেমিনারে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আবার যে ক্ষমতায় আসা যাবে তারও কোন গ্যারান্টি নেই। বর্তমান সরকারের মেয়াদ তিন বছর শেষ হতে চলেছে; কিন্তু সরকার রাষ্ট্র ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। স্পিকার বলেন, শুনেছি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে ফান্ড এসেছে, তা দিয়ে বিনোদন পার্ক তৈরি করা হবে। এটা কী ধরনের প্রহসন? স্পিকার আরও বলেন, হাওর উন্নয়ন বোর্ডের কাজ থমকে আছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের মেয়াদে মাত্র একটি মিটিং হয়েছে। এভাবে কোন রাষ্ট্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনউন্নয়ন সঠিক হতে পারে না।

স্পিকার আবদুল হামিদ দেশের হাওর অঞ্চল কিশোরগঞ্জের জনপ্রতিনিধি। একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান এমপি হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল থেকে ওই এলাকার গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি দেশের খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশা জানেন এবং বোঝেন। না, বাংলাদেশের সব এলাকার এমপি এমন নন। জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের সময় আমরা কিছু এমপি’র পুকুরচুরির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। কেউ কেউ এমপি না হয়েও দরিদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। বিদেশে গিয়ে সে টাকা উড়িয়ে আমোদ-ফুর্তি করেছেন। সেসব ঘটনা এখন ক্রমেই বেরিয়ে আসছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা এসে বাংলাদেশের আদালতে এসব লুটেরা শ্রেণীর নব্যপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিচ্ছেন।

এসব ঘটনা আসলেই রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ শঙ্কার খবর। তারপরও আমরা দেখছি, এসব লুটেরা শ্রেণীর প্রতিনিধিদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর জন্য একটি শ্রেণী মরিয়া হয়ে কাজ করছে। এদের জন্মদিন পালনের নামে রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বিস্তারের মহড়া দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশে এই যে মহড়া দেখানোর প্রতিযোগিতা, তা ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের মননশীল মানুষের মেরুদন্ড। প্রজন্ম সাহস পাচ্ছে না দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্ছার হতে; বরং তাদেরই কেউ কেউ টেন্ডার, চাঁদাবাজি, ভাগ-বাটোয়ারায় অংশ খেতে কক্ষচ্যুত হয়ে দলীয় সন্ত্রাসী বনে যাচ্ছে। অথচ আমরা জানি, এই বাঙালি জাতির তরুণ প্রজন্মই বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাহলে আজ এই প্রজন্মের এত সামাজিক অবক্ষয় কেন?

এর কিছু কারণ আছে। তার অন্যতম হলো রাষ্ট্র মেধাবী প্রজন্মকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে বারবার কার্পণ্য দেখিয়েছে। ফলে পচনশীল সমাজ ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত নেতৃত্বের দাপট গণমানুষের স্বপ্নের বাংলাদেশের দখল নেয়ার অপচেষ্টা করেছে। দেশে ধনি-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন করতে মানুষ যে চেষ্টা করছে না, তা কিন্তু নয়। তারপরও নিষ্পেষণের করাঘাতে মানুষ বারবার পরাজিত হয়েছে লুটেরা শ্রেণীর কাছে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য দেশপ্রেম কতটা অপরিহার্য, তা বিশ্বের যে কোন সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পারি। ভারতের রাজনীতিকরা মুখে একে অপরের যতই সমালোচনা করুন না কেন, লোকসভায় তারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ তা আমরা বরাবরই দেখছি। অথচ বাংলাদেশে লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। নিজেদের গা বাঁচানোর জন্য হরতাল ডেকে জনমানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়।

বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইএ’র দুজন এজেন্ট সাক্ষ্য দিয়েছেন আদালতে। এ সাক্ষ্য প্রদানকালে তারা বর্ণনা করেছেন, কীভাবে মানিলন্ডারিং করে সেই অর্থ বিদেশে আমোদ-প্রমোদে খরচ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি বলছে বিদেশ থেকে নাকি ভাড়া করে সাক্ষী আনা হয়েছে। জবাব দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ভাড়া করে এফবিআইএ’র এজেন্ট আনা যায় কি না, তা বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই জেনে নিতে পারে।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কথাটি বেশ চমৎকারভাবেই বলেছেন। এটা বিশ্বস্বীকৃত, ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) একটি ক্ষমতাবান গোয়েন্দা সংস্থা। এই সংস্থার প্রতিপত্তি এতই প্রবল, তারা চাইলে বিশ্বের যে কোন দেশে থেকে অপরাধী ধরে আনতে পারে। পানামার মাদক সম্রাট এবং শাসক নরিয়েগা এই সংস্থার কাছে ধরা পড়েই এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন। এফবিআইকে ভাড়া করা যায়, তা শুনলে যে কোন পাগলও হাসবে। বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতা বাংলাদেশের মানুষকে বোকা বানানোর যে চেষ্টা করছেন, তা কি এতই সোজা।

হাওয়া ভবন চক্র বাংলাদেশে কেমন দৌরাত্ম্য তৈরি করেছিল, তা তিলে তিলে টের পেয়েছেন দেশবাসী। একজন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল গোটা দেশের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব। সাড়ে চৌদ্দ কোটি মানুষের দেশে একজন স্যুটেড-বুটেড স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন সর্বেসর্বা আর নেপথ্যে ছিল একটি শক্তিশালী লুটেরা চক্র। যারা এখন সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
একটি কথা খুব স্পষ্ট, লুটেরা শ্রেণীই তাদের প্রতিপক্ষ লুটেরা শ্রেণীর ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে। এ অবস্থার চিরঅবসান চেয়েই বাংলাদেশের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে ক্ষমতায় এনেছিল। কিন্তু এখন কিছু মন্ত্রী-এমপিদের অবৈধ দাপট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে তটস্থ করে তুলেছে।

বাংলাদেশের মানুষ বারবারই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্ন দেখেছেন; কিন্তু সেই বিকেন্দ্রীকরণ যদি লুটেরা শ্রেণীর সামন্তবাদ প্রতিষ্ঠার নব্য ক্ষেত্র হয় তবে তা তো মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে ভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। উত্তর এবং দক্ষিণ- দুই ভাগে ভাগ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে দেখেছি শীর্ষ ক্ষমতালোভী কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা না মেনেই ‘অমুকের শুভেচ্ছা নিন’ মার্কা ফেস্টুন, লাগানো শুরু করেছে। এদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। এর অর্থ কী? আগাম এমন জোর প্রস্তুতি কি প্রমাণ করে না, সিটি মেয়র সবার নামে মূলত একটি অবৈধ, অনৈতিক মহড়া দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি ২০১২ নির্বাচন হবে। ইএমভির দোহাই দিয়ে বিএনপি এ নির্বাচনও বয়কট করতে পারে। তারপরও যদি নির্বাচন হয় এবং এতে কালো শক্তির পেশি প্রদর্শিত হয় তবে তা তো রাষ্ট্র ও জনগণকে ক্রমে শঙ্কার দিকেই ঠেলে দেবে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি প্রতিবেশী ইস্যুতেও বাংলাদেশ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তিস্তার পানি চুক্তি ঝুলে আছে। এরই মধ্যে আমাদের মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের কার্যক্রম শুরু হওয়ার খবরে তোলপাড় হচ্ছে বাংলাদেশে। টিপাইমুখ বাঁধ হলে বৃহত্তর সিলেটসহ বাংলাদেশের একটি বড় অঞ্চল বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন আশঙ্কা করছেন পানিবিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিশেষজ্ঞরা। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং খুব জোর গলায় বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষতি হয়, এমন কিছু করবে না। তারপরও টিপাইমুখ বাঁধ দেয়া হচ্ছে কেন? আর এই সুযোগে ভারতবিরোধিতার নামে একটি মহল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে উঠেপড়ে লেগেছে কেন?

মনে রাখা দরকার, ভারত টিপাইমুখ বাঁধ দিতে হলে আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেমন দিচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও একই কায়দায় দিত। তাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করা দরকার জরুরি ভিত্তিতে। শুধু প্রতিবাদ নয়, ক্ষতিরোধের সুরাহা বের করতে আলোচনায় বসতেই হবে। বাংলাদেশ তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়নি দেশি কিংবা বিদেশি লুটেরা শ্রেণীর কাছে জিম্মি থাকার জন্য। এই আগল ভাঙতেই হবে।