ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা, ক্ষমা করবেন। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। তারপরও লিখতে হচ্ছে।এই দেশে ৪০ বছর আগে মুক্তিসংগ্রাম হয়েছিল। আমি সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি।তাই জানি কী ভয়াবহ ছিল সেইসব দিন ! কীভাবে গোলার আওয়াজ স্তব্ধ করে দি‌য়েছিল আমার মতো লাখো বালক-বালিকার বুকের পাঁজর। সেই মুক্তিসংগ্রামে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা। জীবন বাজী রেখে তারা যুদ্ধ করেছিলেন দেশ মাতৃকার জন্য। তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। মৃত্যু, জীবনের পরিণত পরিণাম। আজ থেকে শত বছর পর এই বাংলাদেশে আর কোনো জীবন্ত মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না।আমরা
এই সত্য জানি এবং মানি। তারপরও এই দেশের রাজনীতি, এই দেশের সমাজব্যবস্থা সেই মুক্তিসেনানীদেরকে নিয়ে না না রকম ‘কূটচাল’ করছে। দলীয়করণ করছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে
চাইছে। বিষয়গুলো ভাবতেই বেশ কষ্ট হয় বৈ কী !

খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান তালিকা থেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে বাদ দেয়াসহ মুক্তিযোদ্ধার তালিকাকে বিতর্কমুক্ত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে ইউএনও’র মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তালিকা পাঠানোর শেষ সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছেছে। আগামী মাস থেকে নতুন সফটওয়্যার খুলে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করবে। এরপর জনসন্মুখে তালিকা প্রকাশ করে তা চূড়ান্ত করা হবে। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে ৯টি সিকিউরিটি কোডমার্ক সংবলিত বিশেষ আইডি কার্ডও দেয়া হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি স্পর্শকাতর। তাই সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে কোন অমুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান না পায়। সেজন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয় করে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে মন্ত্রণালয় থেকে ডাটাবেজের মাধ্যমে এ তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। সরকারী নীতি নির্ধারকরা বলছেন, চলমান তালিকায় কোন অমুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তা অবশ্যই বাদ পড়বে।

সরকারী বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়নের কাজ করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেয়ার কাজটি এ দফতর করে থাকে বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ডাটাবেজ ফরম পূরণ করার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ণয়ের এই প্রচেষ্টা নতুন নয়। তবে সব সময়ই তা করা হয়েছে, নিজ নিজ দলীয় আদলে। মহান মুক্তিসংগ্রামের পর আমরা দেখেছি প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর সাক্ষর করা সনদ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতে। এর পর থেকেই তা বদলেছে শাসকগোষ্টীর ইচ্ছে অনুসারে।

মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও একেক সময় একেক রকম তথ্য পাওয়া পাওয়া গেছে। এরশাদের আমল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ দফায় তালিকা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে সনদ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ২৬ হাজার। এর মধ্যে সাময়িক সনদ পেতে ১৭ হাজার এবং যুদ্ধাহত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরও ৮ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় এ সংখ্যা ছিল প্রথম দফায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জন। পরে তা ২ লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনে উন্নীত হয়। এর আগে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভোটার তালিকায় ৮৬ হাজার এবং ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের খসড়া তালিকায় ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নাম।

এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮৬-৮৭ সালে জাতীয় কমিটি কর্তৃক প্রণীত তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মুক্তিবার্তা (লাল মলাটে) পত্রিকায় প্রকাশিত নামের তালিকাকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। লাল মুক্তিবার্তায় ১ লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় মুক্তিবার্তার লাল মলাটের বাইরে যারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছেন তাদের অনেকে এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যমান গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় প্রায় ৪০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঢুকে পড়েছে। ডিজিটাল ডাটাবেজ তালিকায় যাদের বাদ পড়ার আশংকা রয়েছে।

কিন্তু ঘটনা কী এখানেই শেষ হবে ? না হবে না। কারণ বিএনপি যদি আবার কখনও ক্ষমতায় আসে তারা এই তালিকা আবার বদলাবে, সন্দেহ নেই। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ফেরত সৈনিকদের কদর কেমন তা জানি এবং দেখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভেটার্নস ডে’ পালন করা হয় শুধু যুদ্ধ প্রত্যাগত সৈনিকদের সম্মাননা জানানোর জন্য। এখানে সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত সমাধিস্থলে গেলে মনে হয়, কী পরম শান্তি ও শ্রদ্ধা-মমতায় ঘুমিয়ে আছেন এরা। আর জীবিত যুদ্ধ প্রত্যাগত সৈনিকরা যে সম্মান পাচ্ছেন তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিদান বলা যায়।

অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে অর্ধাহারে। এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত। সম্পদ ও কর্মহীন অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার তাদের পরিবারের সদস্যদের খাদ্যের যোগান দিতে এখনও ভিক্ষাবৃত্তি, দিনমজুরী, রিক্সা চালনাসহ অনেক কঠোর পরিশ্রমের পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবন যাপন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংস করে, মনগড়া কল্পিত ও মিথ্যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করে আদর্শহীন, দূর্নীতবাজ একটি শ্রেনী ব্যক্তিও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত, নষ্ট ও ধ্বংস হয়েছে এদের হাতেই।

অন্যদিকে রাজাকার আলবদর গোষ্টির নেতারা টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে কিছু মুক্তিযোদ্ধাকেও। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে একটি বিশেষ অংশগ্রহন ছিল নারী সমাজের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৩০ লাখ মানুষের গণহত্যার শিকার হয়, যার অন্তত ২০ শতাংশ নারী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সরকারি নথিপত্রে এর কোন তথ্য প্রমাণ নেই। বিভিন্ন ভাষ্য মতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখ মা-বোন নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু মাঠভিত্তিক গবেষণা চালাতে গিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের গবেষণা কর্মীদের মনে নিশ্চিত ধারণা জন্মেছে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা যা এতদিন বলা হয়ে আসছে, আসলে তা এর চেয়েও অনেক বেশি।

তবে এতদিন পর তথ্য-প্রমাণ দিয়ে হয়তো এসব প্রমাণ করার সুযোগ কম। তাছাড়া নির্যাতিতরা সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তার কারণেই চান না এতদিন পর এসব নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি হোক। এসব কারণেই অনেক নির্যাতিত নারী তাদের ওপর নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী গবেষণা কর্মীদের কাছে মুখে মুখে বললেও তা টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করতে বা লিপিবদ্ধ করতে দিতে চাননি।

এ প্রসঙ্গে একটি সাম্প্রতিক ঘটনা বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াত নেতা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট শেষ হয়েছে। প্রসিকিউশন তাদের স্টেটমেন্টে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াত নেতা সাঈদী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাড়েরহাট বন্দরের বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিয়মিত যৌননির্যাতন করতেন। বিপদ সাহার বাড়িতেই আটকে রেখে অন্যান্য রাজাকারসহ ভানু সাহাকে নিয়মিত ধর্ষণ করতেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। একসময় ভানু সাহা দেশত্যাগে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

স্টেটমেন্টে আরও বলা হয়, সাঈদী একাত্তরে অসংখ্য হিন্দুকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছিলেন, নামাজ পড়তেও বাধ্য করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করে এবং কেউ কেউ ভারতে চলে যান।

এই হলো আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একটি খন্ডচিত্র। কী মূল্য দিয়ে কেনা আমাদের স্বাধীনতা ! অতীতে যে তালিকাগুলো হয়েছে সেগুলো কী স্বচ্ছ ছিল। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অনেক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকলেও তাতে ঠাঁই হয়নি কুড়িগ্রামের বীর প্রতীক তারামন বিবির নাম। ২০০৫ সালের ২১ মে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ৩৭৫৫ নম্বর থেকে ৩৮৭৪ নম্বর পৃষ্ঠায় কুড়িগ্রাম জেলার ৩ হাজার ৬১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ তালিকায় বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত তারামন বিবির নাম নেই, তা ধরা পড়ে জেলা পোর্টাল তৈরি করতে গিয়ে। এই হলো আমাদের তালিকার অবস্থা !

আমরা জানি মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু তাঁদের কর্ম, তাঁদের স্বপ্ন , তাদের গৌরবগাঁথা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। জাগ্রত থাকবে তাঁদের চেতনা। থাকতেই হবে। না থাকলে বাংলাদেশ থাকবে না। বাঙালী জাতিসত্তার অস্তিত্ব থাকবে না। সেই প্রত্যয় এবং ঐতিহ্যের শক্তিই প্রজন্ম ধরে রাখতে চায়।

তাই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সম্মান জানাতে হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। আমরা দেখছি আজ রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সনদ দেবার চেষ্টা করছে। বুলি পাল্টে এরাই হতে চাইছে মুক্তির নিয়ামক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সম্মান চান। যে দেশে কোটি কোটি টাকা লুটেরা শ্রেণী প্রতিদিন লুটপাট করে সেই দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধা মাসে পাঁচ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পাবেন না , তা মেনে নেয়া যায় না। তাই হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়, রাষ্ট্রীয় সম্মান, রাষ্ট্রের মানুষের সম্মান বাড়ানোর জন্যই জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক পুনর্বাসন খুবই দরকারী। দরকার পরলোকগত মুক্তিযোদ্ধদের পোষ্য,সন্তান,পরিবারকেও সার্বিক সহযোগিতা করা। কারণ একাত্তরের বীর সেনানীরা বার বার জন্ম নেবেন না।