ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

ভাবলে এখনও শিউরে উঠি। আমার ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়েছিল সেই হায়েনা পাকসেনা। আমার মা বলেছিলেন, এ সন্তান আমার। আমি মুসলমান।
ঐতিহ্যবাহী সুরমা নদীর শাখা নদী ‘বাসিয়া’। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকা স্পর্শ করে বিশ্বনাথের দিকে বয়ে গেছে এই বাসিয়া নদী। সিলেট-লক্ষ্মীবাসা এলাকার লোকাল বোর্ডের সড়কটি গিয়ে শেষ হয়েছে এ নদীটির তীরেই। এ নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এলাকার নাম কামাল বাজার। সিলেট শহর থেকে মাত্র সাড়ে তিন মাইল পশ্চিমে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ এলাকার মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার মানসপটে।
মার্চের শুরুতেই একটি অনিবার্য মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে থাকেন এ এলাকার মানুষ। পঁচিশে মার্চের কালোরাতে পাক হায়েনারা যখন বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন মিছিলমুখর হয়ে উঠেন এ অঞ্চলের মানুষ। মনে পড়ছে হাজারো জনতার একটি বিশাল মিছিল বাসিয়া নদীর পারে সমবেত হয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় সিলেট শহর অভিমুখে।

কারও হাতে বাঁশের লাঠি, কারও হাতে রামদা। না তাদের হাতে মারাত্মক কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। তবুও মনের বলে তারা ছিলেন বলীয়ান। হাজার হাজার মানুষের সেই মিছিলটি ‘মকনের দোকান’ পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। এরপরই পাক বাহিনীর গুলি চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন জনতা।

এ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের শাণিত চেতনার নেতৃত্ব যারা দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ সোলেমান হোসেন। এ বীর তরুণ লাউড স্পিকার দিয়ে গ্রামে গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সাইকেল চালিয়ে তিনি ঘুরেছিলেন সর্বত্র। মহান বিজয়ের মাত্র ক’দিন আগে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন সোলেমান হোসেন। তিনি যুদ্ধের প্রাক্কালেই বলছিলেন, প্রাণের বিনিময়ে হলেও এ দেশ স্বাধীন করব। কথা রেখেছিলেন প্রাণ দিয়ে।

একাত্তরের জুলাই মাস। দেশজুড়ে তুমুল যুদ্ধ চলছে। সুরমা নদী দিয়ে ভেসে আসছে প্রতিদিন অগণিত লাশ। হঠাৎ একদিন শুনলাম, সুরমার সংযোগ নদী, বাসিয়া নদী দিয়েও লাশ ভেসে আসতে শুরু করেছে। আমাদের বাড়ির সামনেই নদীর চরে ‘তারা’ গাছের শেকড়ে আটকা পড়েছে এক জোড়া লাশ। সেদিন বিকেলে বড় ভাইর সঙ্গে দেখতে গেলাম চুপি চুপি। দু’জন তরুণ-তরুণী। স্বামী-স্ত্রী অথবা প্রেমিক-প্রেমিকা হবে বলেই মনে হলো। দু’জনের হাত এক সঙ্গে বাঁধা। উবু হয়ে পড়ে আছে লাশ দুটি। পেছন থেকে বুলেটগুলো ঝাঁঝরা করে দিয়েছে দেহ। শুধু একবার কাছ থেকে দেখলাম। আর স্থির থাকতে পারলাম না। ছুটে এলাম বাড়িতে। বেশ ক’রাত ভয়ে ঘুমাতে পারিনি।

একাত্তরের আগস্ট মাসে হঠাৎ একদিন পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করল আমাদের এলাকা। কে একজন দৌড়ে বলে যেতে থাকল-‘পাঞ্জাবি আসছে, পাঞ্জাবি আসছে’। গ্রামের মানুষ হানাদার জল্লাদদের ‘পাঞ্জাবি’ বলেই সম্বোধন করতেন। আমাদের এ এলাকায় বেশকিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাস। কোন দালাল নাকি তথ্য দিয়েছিল, এসব হিন্দু সম্প্রদায় তথাকথিত ‘পাকিস্তান’র বিরুদ্ধে কাজ করছেন। তাই এ আক্রমণ।
মনে পড়ছে, বাসিয়া নদীর তীরে এসে পাক সেনাদের জিপ, ট্রাকগুলো থামল। সেখান থেকে তারা সামরিক কায়দায় দৌড়ে এসে ঢুকে পড়ল গ্রামের অভ্যন্তরে। বাড়ি বাড়ি ঢুকে তল্লাশি শুরু করল।

‘ইধর কোই হিন্দু হ্যায়’?- কথাগুলো এখনও কানে বাজে আমার। গ্রামের মানুষ উর্দু জানেন না। উর্দু জানেন না, আমার মা – ও। প্রাণের ভয়ে অনেকেই তখন চৌকির নিচে, ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
যাদের ওরা সামনে পেয়েছে, দাঁড় করিয়েছে বাড়ির উঠোনে। ‘হিন্দু’ শব্দটি শুনেই সবাই ভয়ে মাথা নাড়ছেন। না, আমরা ‘হিন্দু’ নই!

আমি তখন স্কুলছাত্র। পালাব কোথায়? কিছুই ভাবতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে মায়ের কাছে আশ্রয় নিলাম। আমার মা আমাকে বুকে চেপে ধরলেন। বাবা তখন প্রবাসে। নিজেদের পৃথিবীর অসহায়তম মানুষ বলেই মনে হলো।

পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী আমাদের বাড়ি পর্যন্ত এসে পৌঁছার আগেই মা আমার মাথায় একটি সাদা গোল টুপি পরিয়ে দিয়েছিলেন। যাতে একথা প্রমাণিত হয়, আমি হিন্দু নই-আমি মুসলমান। তারপরও পাকিস্তানি সেনার মুখোমুখি দাঁড়াতে হলো আমার মাকে, আমাকে নিয়ে। ব্যাজ ও স্টার দেখে বুঝলাম, সে একজন অফিসার। আমার মাকে বেশ দাম্ভিকভাবে জিজ্ঞাসা করল ‘এই বুড্ডি, ইয়ে লাড়কা তোমারা হ্যায়? ইয়ে হিন্দু তো নেহি?’ আমার মা মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দিলেন। অথচ এ প্রশ্নটি না শোনার জন্যই আমার মা আমাকে টুপি পরিয়েছিলেন। দুঃখ হয়, আমার মাথার টুপিটিও সেদিন আমার প্রকৃত ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরতে পারেনি পাক হানাদারদের কাছে।

মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের গোটা এলাকা যেন নিথর হয়ে পড়ল। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে দু’টি এবং উত্তরে একটি বাড়ি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সেসব বাড়ির নারী-পুরুষ-শিশু সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন পশ্চিমের গ্রামগুলোতে। পাক সেনারা ওসব বাড়িতে ঢুকেই পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকল আগুনের লেলিহান শিখা।

আমাদের বাড়ির পশ্চিমের বাড়িটি বসন্ত কাকাদের। বসন্ত কুমার দেব। ছোটকাল থেকেই তার স্নেহ পেয়ে বেড়ে উঠেছি আমরা। অকৃতদার,এই মানুষটি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডাক কর্মচারী। পোস্টমাস্টারের কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছিলেন। বাড়ির সবাই দৌড়ে পালাতে পারলেও, তিনি পালাতে পারেননি। ফলে ঘাতকরা তাকে বাড়িতেই পেয়ে যায়। তারা পেছন থেকে তার হাত বেঁধে ফেলে। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই পথ। তিনটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে উল্লাস-নৃত্য করতে করতে ফিরে যাওয়ার সময় বসন্ত কাকাকে সঙ্গে করেই নিয়ে যাচ্ছিল খুনিচক্র।

এ সময় তিনি হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। তার গগনবিদারী চিৎকারে আঁতকে উঠেছিলাম আমরা, প্রতিবেশীরা। ‘আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কেন? আমি তো কোন অপরাধ করিনি। আমাকে ছেড়ে দাও না’… প্রবীণ এ মানুষটির আকুতি ছিল হৃদয়বিদারক।

পাক সেনাদের গাড়িতে তোলা পর্যন্ত অনেকেই দেখেছিলেন তাকে। এরপর আর তাকে দেখা যায়নি। কোনদিনই গ্রামের পথ ধরে ফিরে আসেননি আমাদের বসন্ত কাকা।

যেসব শহীদের রক্তের স্মৃতি বহন করে চলেছে আমার মাতৃভূমি কামাল বাজার এলাকা, তারা হচ্ছেন- শহীদ সোলেমান হোসেন, শহীদ এনামুল হক, শহীদ বসন্ত কুমার দেব, শহীদ নরেশ চন্দ্র দেব ও শহীদ বারিক আলী।

শহীদ এনামুল হক, যিনি একজন স্কুলছাত্র হিসেবেই অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন তিনিও। এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ শতাধিক। তারা সিংহভাগই এখন বেঁচে আছেন বড় দীনতা নিয়ে।

এসব কথা যখন মনে পড়ে তখন কেবলই ভাবি কী চেয়েছিলেন তারা? তারা কী কোটিপতি হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন? গোটা বাংলাদেশের সিংহভাগ মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল একটাই, আর তা ছিল-একটি স্বাধীন জন্মভূমি। একটি মানচিত্র।

বাঙালি সেই পতাকা পেয়েছিল ঠিকই ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি মহান চেতনার সূর্যছবি। কারণ, কতিপয় চিহ্নিত রাজাকার বাদে বাকি সবাই সেদিন একটি রাষ্ট্রের জন্য ছিলেন উদগ্রীব।
মনে পড়ছে, নভেম্বরের এক গভীর রাতে আমাদের এলাকার বেশক’জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আমার বড়ভাই। আগেই সংবাদ জানানো হয়েছিল। তাই আমার বড় বোন, মা, চাচিরা সবাই রান্না করে অপেক্ষায় ছিলেন গভীর রাত পর্যন্ত। মুক্তিসেনারা মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য বাড়িতে এসেই আবার হারিয়ে গিয়েছিলেন রণাঙ্গনের উদ্দেশে।

আমার আজও খুব মনে পড়ে সেই সরদার মাঝির কথা। যে গভীর রাতে বাসিয়া নদীর খেয়া পার করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। আর সরদার মাঝি আমার বড় চাচাকে বলেছিল, ‘চাচা আমি তো যুদ্ধে গেলাম না। বড়ভাইদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) খেয়া পার করে দিয়েছি, এটাই আমার সান্ত্বনা।’ সেই মাঝিভাই এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানি না। জানি না, তিনি তার কাংখিত বিজয় খুঁজে পেয়েছেন কী না ।

***
ফিচার ছবি: গ্রাফিক্সে ব্যবহৃত ছবি আন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত