ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

বিজয়ের চার দশক পার করে দিল বাঙালি জাতি। বাংলাদেশ, জাতিসত্তা নিয়ে দাঁড়ানোর ৪০ বছর মোটেও কম সময় নয়। এ সময় অনেক কিছুই হতে পারত; হয়নি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সততা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রের অর্জন ভূলুণ্ঠিত হয়েছে সামরিক জাঁতাকলে। ব্রিটিশ শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত উপমহাদেশ শাসনমুক্ত হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা- মুক্তি। দুই মেরুতে অবস্থান করেও ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মূলমন্ত্র বলা হয়েছিল ধর্মীয় তমদ্দুন ও ভ্রাতৃত্ববোধ। এতে বাংলা ভাষাভাষী হয়েও বাঙালিদের উর্দু জাতীয় সংগীত ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গাইতে হতো। বৈষম্যের বীজবপন সেখানে থেকেই শুরু। শুরু শোষণের নানা ছলাকলা।

বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রপতির প্রয়োজন ছিল ১৯৪৭ সালেই; হয়নি। কারণ ওই সময় রাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে বাঙালি নেতারা বারবার দোনোমনো করছিলেন। তাদের লক্ষ্য স্থির ছিল না; ঐক্য ছিল না; ফলে উর্দু ভাষাভাষী চতুর নেতারা বাঙালি জাতিকে তাদের তাঁবেদার করে রেখে দেয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এবং তারা তাৎক্ষণিক সার্থকও হয়েছিল।

বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলনের অসমসাহস ও শক্তির পথ ধরে স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিল বাঙালি জাতি। তারপরও গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মননের উৎকর্ষতা থামিয়ে দেয়ার জন্য পশ্চিমা শাসকচক্র ছিল সবসময়ই তৎপর। দেশ শাসনের নামে সামরিক জান্তারাই হয়ে উঠেছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাগ্যবিধাতা। এর অন্যতম কারণ, উর্দু ভাষাভাষীরা ছিল সংখ্যালঘু আর বাঙালি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই ভোটের রাজনীতিতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় উর্দু ভাষাভাষীরা যে জিতে উঠতে পারবে না, সেই সত্য ছিল অবধারিত।

প্রায় চব্বিশ বছর ছলে-বলে-কৌশলে বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রেখেছিল পশ্চিমা শাসকরা। তারপর জেগে ওঠার সময় এসেছিল- রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি বীরের বেশে। ১৯৭১ সাল ছিল বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের একটি স্মরণীয় বছর। অমিততেজ নিয়ে সেই মহাসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গোটা জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মহান মুক্তি সংগ্রামে। একটি পতাকার জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল তীব্র।

এই মুক্তি সংগ্রামকে পন্ড করার জন্য পশ্চিমা হায়েনাচক্র যেমন তৎপর ছিল, তেমনি তৎপর ছিল তাদের এদেশীয় দোসররা। যে চিহ্নিত চক্রটি ব্রিটিশ শাসন থেকে পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধিতা করেছিল, সে চক্রটিই একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করেছিল। অথচ এই জাতির জাগ্রত প্রজন্মের কণ্ঠে সেদিন স্লোগান ছিল-‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। এই যে চেতনা, এটাই ছিল একটি মুক্তির স্বপ্ন, একটি বিজয় এবং স্বদেশ পাওয়ার প্রত্যয়- যা এই প্রজন্ম এখনো মনে-প্রাণে ধারণ করে চলেছে।
আজ অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ আরও দীর্ঘ হবে, এমন ধারণা তারা করেছিলেন। এই মুক্তি সংগ্রামকে দীর্ঘতম করার প্রচেষ্টা যে পাক সেনাশাসকরা করেনি, তা কিন্তু নয়। তারা বলেছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তারা চায় না। তারা ‘তামার জমি’ চায়। ‘তামার জমি’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, মাটিকে মানুষ-শূন্য করে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে তাম্ররূপ দেয়া হবে। আর সে পরিকল্পনামাফিকই অগ্রসর হয়েছিল তারা। মাত্র নয় মাস সময়ে তিরিশ লাখ মানুষ তারা হত্যা করেছিল; সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছিল দুই লাখ নারীর।

অস্বীকার করার উপায় নেই, মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির ভিনদেশি বন্ধুরা ছিলেন সোচ্চার। ভারত, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রত্যক্ষ সমর্থন স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বজনমত গঠনে বিশ্বের নানা দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। প্রধান শক্তিগুলোর সামনে ‘বাংলাদেশ’ গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন। ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর পাকিস্তান যে ভারত আক্রমণের কথা ভাবেনি, তা কিন্তু নয়। কিন্তু তারা সাহস করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে তারা মানসিকভাবে ছিল চরম দুর্বল। তাছাড়া ভারতকে সামাল দেয়াও তাদের সাধ্যের আওতায় ছিল না।

আমি মনে করি, আমাদের বিজয়ের ৪০ বছরে ‘বাংলাদেশ’-এর তুলনা পাকিস্তানের সঙ্গে করা উচিত নয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী রেখে তাকালে দেখা যাবে পাকিস্তানে এখনো ‘সামরিক রক্তচক্ষু’ই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান নিয়ামক। পাকিস্তানের রাজনীতিকরা পরস্পরকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না বলেই বর্তমান সেনাপ্রধান আশফাক কায়ানিই নেপথ্য নায়ক হিসেবে সেই দেশ চালাচ্ছেন বলে বিভিন্ন মিডিয়া চলছে। আসিফ জারদারি-ইউসুফ গিলানি সরকারকে বেকায়দায় ফেলে সামরিক প্রভুরা রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিতে পারে এমন চাওর করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হ্যাঁ, বাংলাদেশেও এমন মহড়া দেখানো হয়েছে। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন, জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পেছনে সেই পরাজিত পাকবাহিনীর গোয়েন্দা চেলাদের হাত ছিল, তা এখন আর গোপন করার কোন বিষয় নয়। স্বাধীন হলেও শান্তিতে থাকতে দেব না, এমন একটি পরিকল্পনা নিয়েই দাবার গুটি চাল দিয়েছিল পাক গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরা। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে ‘প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’দের বুটের আঘাত ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল এই বাংলার সবুজ জমিন।

বাংলাদেশের বিজয়ের চল্লিশ বছরের অধিক সময় কেটেছে সামরিক জাঁতাকলে। দেশ সেবার নামে এসব উর্দি পরা জান্তারা ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছে। ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে। সামরিক জগদ্দল পাথর সরাতে গণমানুষকে বারবার রক্তাক্ত হতে হয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ যারা সরাসরি প্রশ্রয় দিয়েছে মূলত এরাই রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চেয়েছে সবচেয়ে বেশি। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে যারা আলবদর প্রধানদের মন্ত্রিত্ব দিয়েছিল তাদের লক্ষ্য ছিল ওই পাক পরাজিত গোয়েন্দাদের মতোই। সেসব গোয়েন্দারা এখনো চায় বাংলাদেশও তালেবানি জঙ্গলে পরিণত হোক।

এই যে একটি স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য প্রজন্মকে কী করা উচিত, সে বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিজয়ের মূলবাণী ছিল মৌলিক স্বাধীনতা অর্জন। তার সিকিভাগ কি পেয়েছে বাংলাদেশ? কেন পায়নি? তা পেতে হলে কী করা উচিত? এমন প্রশ্ন বারবার আসছে।

দেশে তরুণ ভোটারের সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে ভোটের শক্তি প্রয়োগে। আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। বিষয়টি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনুধাবন করতে পারছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তরুণ প্রজন্মের বিশেষ ভূমিকা ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে আঠারো থেকে তিরিশের কোটায় বয়সী মুক্তি সেনার সংখ্যা ছিল অর্ধেকেরও বেশি, মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা থেকে। তাই আজও সেই তরুণ প্রজন্মই দেশের নেতৃত্ব দেবে, এই প্রত্যাশা মোটেই অমূলক নয়।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রধান এবং প্রথম রাষ্ট্রসনদটি হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই চেতনাটি কী? তা হচ্ছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেমন আমরা একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, এখন সেই আলোকেই রাষ্ট্রের উন্নয়নে নিঃস্বার্থভাবে মনোনিবেশ করা। পরখ করতে হবে, এই দেশকে কারা পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। তাদের লক্ষ্য কী? কারা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, কারা এই দেশে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদকে প্রত্যক্ষ মদতে এগিয়ে নিয়েছে, কেন নিয়েছে? মনে রাখা দরকার একটি রাষ্ট্রে শুধু ভোটের অধিকারই গণতন্ত্র নয়। দুর্নীতি, অনিয়ম, অপশাসন, মিথ্যাচার, লুটপাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াও অন্যতম গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতান্ত্রিক সুসভ্য দেশে ভিন্ন দল আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের উন্নয়নে তাদের মতের ঐক্য প্রশ্নবিদ্ধ নয়। আর তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এখন গণতন্ত্রের অন্যতম শত্রু হচ্ছে মৌলবাদ ও সামরিক শাসন। গণতন্ত্রবাদীরা পারছে ন-এই দোহাই দিয়ে জঙ্গিবাদ এবং সামরিক স্বৈরাচার পাখনা মেলছে সমান্তরালভাবে। বাংলাদেশে সামরিক শাসক জিয়া এবং এরশাদের সময় মৌলবাদীরা ভেতরে ভেতরে যে সংগঠিত হয়েছিল, উত্থান ঘটিয়েছিল তার বহিঃপ্রকাশ তারা দেখায় নিজামী-খালেদার চারদলীয় জোট সরকারের সময়। বিষয়টি আজকের প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে।

জঙ্গিবাদ এবং সামরিকতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরতে না পারলে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের মতো ভয়াবহ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার কোন উপায় নেই।

একটি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা কেন আসে, তার কারণ প্রতিটি সচেতন মানুষকেই খুঁজতে হবে। রাজনীতিকদের তো খুঁজতে হবে বটেই। একটি রাষ্ট্রে রেল, সড়ক, যোগাযোগ, বিমান, রাজস্ব ও স্থানীয় প্রশাসন বিভাগ সবসময়ই লাভজনক সেক্টর বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এসব সেক্টরগুলো নিয়মিত লোকসান দিয়ে চলেছে। এর কারণ কী? একজন চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে লাখ লাখ টাকা রোজগার করবেন আর সরকারের ট্যাক্স দেবেন না এটা কেমন মানসিকতা? ট্রেনের ভাড়া দেবে না বলে ছাদের উপরে চড়বে মানুষ, এটাও কী এই ২০১১ সালে মানা যায়?

তাই মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে আনতে প্রজন্মকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিটি জেলা-উপজেলা শহর কিংবা প্রতিটি ইউনিয়নে যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য একটি তরুণ প্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায় তবে এই অঞ্চলের বাসিন্দাকে স্বাস্থ্য সচেতন, পরিবেশ সচেতন হতেই হবে। এটা একটি উদাহরণমাত্র। জননিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন, সমাজ সচেতনতা সড়ক যোগাযোগ, সমবায় প্রভৃতি ইস্যুতে তরুণ প্রজন্মের হাত হতে পারে রাষ্ট্রের হাতিয়ার। বিজয়ের সুফল ভোগ করতে হলে, অধ্যবসায়ী হতেই হবে। ইন্টারনেটের অবারিত এই যুগে জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করতে এগিয়ে আসতে হবে সম্মিলিত প্রয়াসে।

***
ফিচার ছবি কৃতজ্ঞতা: ব্লগার শেরিফ আল সায়ার