ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

আরেকটি বছর আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল। নানা উৎকণ্ঠা আর শঙ্কায় ঘেরা ছিল এই বছর। বাংলাদেশের জন্য বছরটি ছিল নানাভাবেই উল্লেখযোগ্য। এ বছরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের যাত্রা শুরু করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবন তো বটেই, সামাজিক জীবনেও বছরটি ছিল বেশ হতাশার। নানাস্থানে সরকারিদলের অভ্যন্তরীণ হানাহানি চরম রূপ লাভ করে। নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকান্ড কাঁপিয়ে তোলে গোটা রাষ্ট্রের ভিত। চাঁদাবাজি, টেন্ডার, পেশিবাজি প্রভৃতি কাজে সরকারি দলের সমর্থকদের মহড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। কিছু মন্ত্রী-এমপির দুর্নীতির সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়ায় সিরিজ আকারে প্রকাশে জনমানুষের দৃষ্টি কাড়ে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিল অত্যন্ত সঙ্গিন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমন বুলি আওড়ালেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। গুম, গুপ্তহত্যা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- ছিল সংবাদ মাধ্যমে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এই ধুয়া তোলে একটি মতলবি মহল স্বার্থ হাসিলের চেষ্টাও করেছে বিভিন্ন সময়ে। অথচ যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কসরত করেছে এরা পরোক্ষভাবে মদত দিয়েছে নানা রকম জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী সংস্থাকে।

সরকার যে বিষয়টিতে মোটামুটি সফলতা দেখাতে পেরেছে তা হচ্ছে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোকে কিছুটা দমিয়ে রাখা। এরা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হওয়ার কসরত করলেও প্রকাশ্যে সামনে আসতে পারেনি। বছরের শেষ মাসে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের নামে একটি মধ্যস্বত্বভোগী ডানপন্থি চক্র দেশে একযোগে গন্ডগোল বাঁধাবার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেনি। যা সরকারকে একটি সংঘাত থেকে বাঁচিয়েছে।

বাংলাদেশে এ বছরে অধিক আলোচিত বিষয়টি ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়। কৃতী চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর দেশের বিবেকবান মানুষেরা সোচ্চার হন। দাবি ওঠে যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের। বছরের শেষ দিকে যোগাযোগমন্ত্রীর পদে রদবদল করা হয়। পদ্মা সেতুর আর্থিক বরাদ্দ বাতিলে বিশ্বব্যাংকের ঘোষণা সরকারকে মোটামুটি বেকায়দায় ফেলে।
যদিও সরকারের নীতি নির্ধারকদের শীর্ষ স্থানীয়রা বলেন, তারা একটি নয় দুটি পদ্মা সেতু করবেন।

সার্বিকভাবে ডিজিটাল প্রক্রিয়ার কিছু উন্নতি হলেও সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে সরকারি ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। ফলে মোবাইল, কম্পিউটার ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে জিম্মি করা, চরিত্র হননের চেষ্টাটি ছিল এ বছরে বেশ প্রকট। সরকার ছিল এসব ব্যাপারে বেশ নির্বিকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বললেও এর কালো অধ্যায়গুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্মাণে সরকারি পর্যায়ের কাজে অসঙ্গতি ছিল পীড়াদায়ক।

বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রক্ষায় বছরটি ছিল স্থবিরতায় ঘেরা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে সরকারও ইউনূসের সম্পর্কের চরম অবনতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত গড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে হিম শীতলতা নেমে আসে। তাই বারাক ওবামা কিংবা হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর বিষয়ে কোন সুরাহাই করতে পারেনি বর্তমান সরকার। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুধু কথা-বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে বাংলাদেশ। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কোন ইতিবাচক সম্মতি উদ্ধার করতে পারেনি।

ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের দরকারি ইস্যুগুলোর সমাধান হয়নি। মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করে গেলেও তিস্তার পানি চুক্তি বিষয়ক বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি। বরং শেষ দিকে ভারত টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে মূলত বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বৈরীসুলভ আচরণ করতে চাইছে। বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না, এমন কাগজি কথার উপর কোন ভরসাই করতে পারছেন না বাংলাদেশের মানুষ। অথচ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ সহযোগিতাকারী রাষ্ট্র ভারত, বাংলাদেশের সঙ্গে সবসময় সৌহার্দপূর্ণ, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় সহযোগী থাকবে এমনটিই কাম্য ছিল সবসময়। বিভিন্ন দরকারি ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে একটি সুষ্ঠু বোঝাপড়া করতে না পারার ব্যর্থতা থেকেই গেছে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর।

বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা তুঘলকি মানসিকতা দেখিয়েছে। সরকার তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। ফলে খাদ্যমন্ত্রী পদেও রদবদল করতে হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নিউইয়র্ক রুটে চালু হয়নি। লন্ডন-সিলেট সরাসরি ফ্লাইটও বন্ধ হয়ে গেছে এ বছরই। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রীর পদও বদল হয়েছে।
প্রধান বিরোধীদল বিএনপি, সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দাবি করেছে। যা ছিল বছরের চরম মারাত্মক হতাশাজনক সংবাদ। বেগম জিয়ার এমন কথাবার্তা, বিএনপি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকেই আবার ভাবিয়েছে নতুন করে। বিএনপি আসলেই যে জঙ্গিবাদের সমর্থক তা তারা প্রমাণ করেছে।

রোডমার্চের নামে বিএনপি দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় শোডাউন করেছে। তারা তাদের শক্তি পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ দেখিয়েছে জনসভা, সমাবেশের মাধ্যমে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে পুরো বছরেই ছিল ধীর গতি। একাত্তরের অভিযুক্ত প্রধান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা হয়নি। যা গোটা দেশবাসীর মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

ধানের ফসলে বাম্পার ফলন হয়েছে, সরকারি পক্ষ থেকে এমন দাবি করলেও ধানচালের মূল্য কমেনি। গ্রামীণ জনপদের মানুষ তাদের উৎপাদিত কাঁচামালের বিক্রয়মূল্য পাননি। ফড়িয়া মুনাফাখোররা তাতে ভাগ বসিয়েছে নানাভাবে।

দেশে রিয়েল অ্যাস্টেট ব্যবসা ছিল রমরমা। কিন্তু ‘রিহ্যাব’ এর সদস্য হওয়ার পরও বেশকিছু প্লট এবং ফ্ল্যাট বিক্রেতা কোম্পানি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে প্লট এবং ফ্ল্যাট কিনে প্রতারিত হওয়ার খবর ছাপা হয়েছে পত্রপত্রিকায়।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ছিল বছরের অন্যতম আলোচিত দুর্ঘটনা। সরকার বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিশন গঠন করেও এর সুরাহা করতে পারেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু রাঘব বোয়াল শেয়ার কেলেঙ্কারির মূল হোতা এমনও চাউর করেছেন রাষ্ট্রের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। ডলারের বিপরীতে টাকায় মূল্য কমে যাওয়ার ঘটনা ছিল আশঙ্কাজনক।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ২০১১ ছিল শঙ্কা ও সন্দেহের বছর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হঠাৎ করে ‘গণতন্ত্রের হাওয়া’ বয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল নানা সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু। তিউনিসিয়া, মিসর, ইয়ামেন, সিরিয়া, লিবিয়া, প্রভৃতি দেশে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ‘গণতন্ত্রকামী’ প্রতিপক্ষের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন লিবিয়ার লৌহমানব, স্বৈর শাসক কর্নেল মোয়াম্মার গাদ্দাফি। এতে ন্যাটোসহ পাশ্চাত্যের বুর্জোয়ারা খুশি হলেও বিশ্বের সাধারণ মানুষ হয়েছেন শঙ্কিত।

এই বছরেই পাকিস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের হাতে নিহত হয়েছেন জঙ্গিবাদীদের শিরোমণি ওসামা বিন লাদেন। যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী এতে তুষ্টির ঢেঁকুর তুললেও আল কায়দা ঘোষণা দিয়েছে তারা এর বদলা নেবেই। ফলে শঙ্কা এবং ভয়ের বাঘ তাড়া করেছে ইউরোপ-আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষকে।

অ্যাপল ম্যাকের উদ্ভাবক স্টিভ জবসের মৃত্যু ছিল অন্যতম শোকের ঘটনা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ভুপেন হাজারিকা দেহত্যাগ করেন এই বছরে।বাংলাদেশেও বরেণ্য সাহিত্যিক রশীদ করিম, মুক্তিযোদ্ধা ফটোগ্রাফার রশীদ তালুকদার বীর মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক আবদুর রাজ্জাক, এনামুল হক চৌধুরী বীরপ্রতীক, কৃতী চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, আজম খানসহ অনেক কৃতী সন্তান প্রয়াত হয়েছেন। গুণী মানুষের মৃত্যু সবসময়ই সমাজের ক্ষতি সাধন করে।

এ বছরেই ইরাক থেকে মার্কিনি সেনাদের শেষ দলটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ৩১ ডিসেম্ব্বরের মধ্যেই ইরাক ছেড়ে আসার ঘোষণা ছিল। এর আগেই শেষ দলটি ইরাক ত্যাগ করে এসেছে। কিন্তু এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি পুরোপুরি রহিত করেছে তা বলার অবকাশ নেই। দুবাই, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিনি স্থাপনাগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন মিডিয়া খবর দিয়েছে।

গোটা বিশ্বের মানুষ অত্যন্ত উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছে ২০১১। ইরান- আমেরিকা স্নায়ুযুদ্ধ বেড়েছে বহুলাংশে। পাকিস্তানে জঙ্গিবাদের চরম উত্থান, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা উপমহাদেশের জন্য অশনি সংকেত বহন করেছে। পাক-মার্কিন টানাপড়েন যে কোন মুহূর্তে জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষও শান্তি চেয়েছেন এই গোটা বছর জুড়ে। কিন্তু তার সিকিভাগও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন তাদের বিষয়টি ভাবতে হবে। নতুন বছর সবার জন্য আনন্দ ও সুখ বয়ে আনুক। সবাইকে ইংরেজি নববর্ষ ২০১২-এর শুভেচ্ছা।