ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

গেলো সপ্তাহেও আক্রান্ত সাংবাদিক বিষয়ে লিখেছিলাম। আমরা আরেকজন কৃতী সাংবাদিক হারিয়েছি। দীনেশ দাস। তার লেখা নিয়মিত পড়তাম। দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার ছিলেন তিনি। সেখান থেকে চাকরিচ্যুত হন। কাগজটির মালিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেকার হয়ে যান এই পেশাজীবী সাংবাদিক।

দীনেশ দাসের মৃত্যুর পর বেশ কিছু কথা আলোচিত হয়েছে। আমরা জেনেছি অনেক অজানা কথা। এসব কথা আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বলেছে- হে মানুষ, এই কি তোমার মনুষ্যত্ববোধ? এই কি তোমার সামাজিক দায়িত্ব?

নিজের একমাত্র মেয়ে অথৈকে দেয়া কথা রাখতে পারেননি বাবা দীনেশ। নিয়তি তাকে মৃত্যুর কোলে টেনে নিয়েছে। অথৈকে কথা দিয়েছিলেন, স্কুল ছুটির পর নিরাপদে তাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন। অথৈর স্কুল ছুটির আগেই তিনি লাশ হয়ে চিরবিদায় নিলেন।

দীনেশের স্ত্রী পলি দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেছেন, চাকরি চলে যাওয়ার পর দীনেশ একমাত্র মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে ভাবতেন। কিভাবে খরচ চালাবেন তাই নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকতেন। মৃত্যুর আগের রাতেও মেয়ের লেখাপড়ার খরচের সমস্যা নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলেছি। এই হলো একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত জীবনের চিত্র!

দীনেশের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জানান, চাকরিচ্যুতির পর থেকেই অর্থকষ্টে দিন চলছিল তার। মৃত্যুর আগের দিনও মেয়েকে স্কুলে নিয়ে গেছেন কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি করতে পারেননি। সকালে স্ত্রীর মাটির ব্যাংক ভেঙে দেড়শ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হন। একদিকে বাসাভাড়া দেয়া হয়নি, বাসায় বাজার নেই, অন্যদিকে মেয়ের নতুন শ্রেণীতে ভর্তি করতে হবে- এমন পরিস্থিতিতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। চাকরির সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন এক পত্রিকা থেকে আরেক পত্রিকা অফিসে। কিন্তু কেউই দেননি চাকরির সুযোগ। তিনি যে বেকার জীবনযাপন করছিলেন প্রথম দিকে স্ত্রীর কাছে তাও গোপন করেছিলেন। তিনি পূর্ব রামপুরায় স্ত্রী পলি দাস ও কন্যা অথৈ দাসকে নিয়ে বসবাস করতেন।

এদিকে বিভিন্ন সূত্র ও লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, তার আগের কর্মস্থল দৈনিক আমাদের সময় থেকে ন্যায্য বেতন-পাওনা না পেয়েই বিদায় নিয়েছিলেন দীনেশ দাস। ঐ সময় আমাদের সময়ের সম্পাদক ও অন্যতম মালিক ছিলেন নাঈমুল ইসলাম খান।

আমরা টিভিতে দেখেছি, সেই নাঈমুল ইসলাম খানই দীনেশ দাসের মৃত্যুর পর তার মরদেহের পাশে গিয়ে আহাজারি করেছেন। অথচ এই সাংবাদিক, মালিক পরিবর্তন ও কর্পোরেট মিডিয়া ক্যারিকেচালের শিকার হয়ে অর্ধচন্দ্র খেয়েছিলেন!

দীনেশ দাসকে যে বাস ড্রাইভার চাপা দিয়েছে, সে একজন অদক্ষ ড্রাইভার। টিসিবির ভাড়া করা বাস (ঢাকা-মেট্রো-জ-১৪-২৪৩৫)টি দীনেশ দাসকে চাপা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় গাড়িটি আটক করা হয়। এছাড়া, বাসের চালক বাদশাহ মিয়া ও মাহমুদুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে বাদশাহ মিয়া বাসের হেলপার বলে পরিচয় দেয়। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে চালক বলে স্বীকার করে। তরুণ এই ড্রাইভারের দক্ষতা না নিয়েই রাস্তায় নেমে আসার বিষয়টি অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রবক্তা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতিক্রিয়া টিভিতে দেখলাম। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন প্রায় ৫৭ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয় পরিবহন খাত থেকে। এ টাকার ভাগ সরকারের সব মহলে যায় বলে অভিযোগ করছেন তিনি। আমরা দেখছি, নৌপরিবহনমন্ত্রী বারবার বেপরোয়া চালকদের পক্ষ নিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, ড্রাইভারদের সম্মান করে কথা বলতে হবে। ‘খানসেনা’ বলা যাবে না! ভালো কথা। কিন্তু দোষী, অদক্ষ ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা কি নেয়া হচ্ছে? কেন নেয়া হচ্ছে না? দীনেশ দাসের মৃত্যু আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রীয় ভিতকে কাঁপিয়েছে। সরকার তার পরিবারকে দশ লাখ টাকা সরকারি অনুদান দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

একই সঙ্গে দীনেশ দাসের স্ত্রী পলি দাসকে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া একমাত্র মেয়ে অন্বেষা অথৈ দাসকে ভিকারুন নিসা নূন স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে অধ্যয়নের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, দীনেশ দাসের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। বসুন্ধরা চেয়ারম্যানের সচিবালয়ে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের এক বৈঠকে তিনি এ ঘোষণা দেন। বৈঠকে বসুন্ধরা চেয়ারম্যান দীনেশ দাসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। আগামী সপ্তাহে দীনেশ দাসের শোকসন্তপ্ত পরিবারের হাতে এ অর্থ সহায়তার চেক তুলে দেয়া হবে বলেও সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর, আমাদের সময়ের সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার সাংবাদিক দীনেশ দাসের অসহায় পরিবারের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের সময়ের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান নতুন ভিশন লিমিটেড। এর অংশ হিসেবে প্রয়াত দীনেশ দাসের একমাত্র কন্যা অন্বেষা অথৈ দাসের (৮) উচ্চশিক্ষাসহ গোটা শিক্ষা জীবনের ব্যয়ভার নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দৈনিক আমাদের সময়ের নতুন মালিক ও নতুন ভিশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলী এ ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়াত সাংবাদিকের পরিবারকে সার্বিক সহায়তারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

এদিকে বিএফইউজে সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী জানিয়েছেন, দীনেশ দাসের কর্মস্থল দৈনিক আমাদের সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে তার পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। হ্যাঁ, পাওনা না পেয়েই বিদায় নিয়েছেন দীনেশ দাস। এই হলো আমাদের বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ট্রাজেডি!

আমরা লক্ষ করছি, অগ্রসরমান প্রজন্মের মননের উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটি একটি গৌরবের পেশা হিসেবে অনেকেই গ্রহণ করছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি, সাংবাদিকরা কি তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছেন? তাদের কি সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে? বিষয়টি মিডিয়া মালিক ও পেশাজীবী সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভেবে দেখা দরকার।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েব মিডিয়ায় পেশাজীবী তরুণ সাংবাদিকদের আলোচনা থেকে জেনেছি, অনেক তরুণ সাংবাদিককেই দীর্ঘ সময় অন ডিউটিতে রাখা হয়। কোনো কোনো সিনিয়ররা জুনিয়রদের নাকি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন। অনেক কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। রাত ১২টার পর একজন জুনিয়র সাংবাদিক কিভাবে বাড়ি ফিরবেন, তার খোঁজও রাখা হয় না। আর বেতনভাতা, বোনাসের দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। এসব অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা খুবই অমানবিক। কোনো সভ্য সাংবাদিকতার ইতিহাস তা মেনে নেয় না, নিতে পারে না। এ বিষয়ে আমি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই। মিডিয়া ও সাংবাদিক সমাজের বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত।

১। মিডিয়ায় সাংবাদিকদের টাইম শিফট সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক লেবার ল’ অনুযায়ী ৪০ ঘণ্টা সপ্তাহে কাজের নিয়ম রয়েছে। এর প্রতিফলন হওয়া প্রয়োজন।

২। পেশাজীবী সাংবাদিকরা যাতে তাদের বেতনভাতা, বোনাস সময় মতো পান, এর নিশ্চয়তা মিডিয়া মালিকদের পক্ষ থেকে দেয়া উচিত। যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য সাংবাদিকদের প্রয়োজনে বাহনের জোগাড় করা দরকার মিডিয়ার পক্ষ থেকেই।

৩। প্রতিটি মিডিয়াকর্মীকে একটি সুনির্দিষ্ট সময় চাকরির মেয়াদ শেষের পরপরই জীবনবীমার আওতায় আনা দরকার মিডিয়া হাউসের পক্ষ থেকে। বিশ্বের সকল উন্নত দেশেই গ্রুপ জীবনবীমা ক্রয়ের মাধ্যমে সাংবাদিকদের এই সুবিধা দেয়া হয় মালিক-মিডিয়ার পক্ষ থেকে। মনে রাখা দরকার, এই বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়। আমরা যশোরের বরেণ্য সাংবাদিক শামছুর রহমানকে সন্ত্রাসীদের গুলিতেই হারিয়েছি। এমন আরো অনেক ঘটনা বাংলাদেশে আছে। তাই ‘লাইফ ইনসুরেন্স ফর এভরি জার্নালিস্টস’ এই সময়ের অন্যতম দাবি। এটা কোনো কঠিন কাজ নয়। প্রিমিয়াম মিডিয়াকেই দিতে হবে, গ্রুপ বীমা ক্রয়ের মাধ্যমে।

৪। জাতীয় প্রেসক্লাবের তরফ থেকে ‘আক্রান্ত সাংবাদিক সাহায্য তহবিল’ এর কার্যক্রম আরো ব্যাপৃত করা দরকার। তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘দুস্থ সাংবাদিক সাহায্য তহবিল’ এর ফান্ড শক্তিশালী করা দরকার।

৫। আক্রান্ত সাংবাদিক সুবিচার যাতে পান, সে বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে, কোনো সরকার যা এড়িয়ে যায়- কোনো সাংবাদিকই তা দেখেন তার বিবেকের চোখ দিয়ে। এই সত্য বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃত।

দীনেশ দাসের আত্মার প্রতি আমাদের দায় অনেক। কারণ তার মৃত্যুর পরই তার ন্যায্য পাওনা আদায়ে আমরা মাঠে নেমেছি! এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক একটি জাতিসত্তার জন্য আর কী হতে পারে! আমাদের ক্ষমা করবেন দীনেশ দাস। আপনার সৎ সাংবাদিকতা আমাদের জন্য পাথেয় হবে। আপনার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।