ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সামাজিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন, তেমন মানুষের সংখ্যা এদেশে কম। যারা ভাবেন, তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব সব সময়ই কম। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে ক’টি প্রধান লক্ষ্য ছিল, এর একটি ছিল পরিশুদ্ধ সমাজ নির্মাণ। কারণ পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা সেরা বুদ্ধিজীবীদের মূল্যায়ন কখনোই করেনি। না করার পেছনে যুক্তি ছিল তাদের এই, বাঙালি সমাজ এগিয়ে গেলেই জাতি এগিয়ে যাবে। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করত না, সেই পাকিস্তানি শাসকদের কাছ থেকে তাই স্বীকৃতি কখনো চায়নি বাঙালি মননশীল শ্রেষ্ঠজনেরা।

স্বাধীন বাংলাদেশে তাই সৃজনশীল সামাজিক কাঠামো নির্মাণের একটি গভীর প্রত্যয় ছিল। সেই প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা আশাবাদীও ছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রামের একেবারে শেষ দিকে এসে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী নিধনের যে কাজটি এদেশীয় খুনিরা করেছিল, তা তারা করেছিল জেনেশুনেই। কারণ এটা কে না জানে, জাতি মেধাশূন্য হলেই সমাজ পিছিয়ে পড়ে।

বিধ্বস্ত মাটি নিয়েই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের দরবারে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা ছিল তৎপর। তাই আইয়ুব-ইয়াহিয়ার কায়দায় বাংলাদেশেও সামরিক শক্তিকে জনগণের অন্যতম ‘ত্রাতা’ হিসেবে দাঁড় করাবার সার্বিক প্রচেষ্টা ছিল। সামরিক শাসনই জনগণের ভাগ্য নিয়ামক-এমন বাণীর প্রবক্তারা পালাক্রমে এদেশের মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। এতে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে ভোটের জনপ্রিয়তা বাড়াবার চেষ্টা চলেছে। একসময় প্রজন্ম দাঁড়িয়েছে এসব সামরিক রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে। একাত্তরের পর, অনেক নির্মমতম পরিকল্পনা নিয়ে ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ যারা ঘটিয়েছিল, তাদের জগদ্দল পাথরের সর্বশেষ প্রেতাত্মা সরাতে ১৯৯০ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল এই জাতিকে।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই দেশের সমাজ একবার রুখে দাঁড়িয়েছিল। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জোরদার করার জন্য সামরিক শাসকরা যে মৌলবাদী শক্তিকে সহযাত্রী করেছিল, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তারাও নীতি নির্ধারক হতে পেরেছিল। শুধু তাই নয়, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সহযাত্রী হয়ে মৌলবাদী ধর্মীয় রাজনৈতিক কিছু দল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার হওয়ার দাবি করেছিল। পরে এরা সরাসরি রাষ্ট্র ক্ষমতার ভাগও পেয়েছে।

গত পনের বছরের সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে অনেকগুলো বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতিক ও প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের রাজনীতিকদের যৌথ মালিকানায়। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অনেক সিনিয়র নেতাই মনে করেন ধর্মীয় তমদ্দুনপন্থিরা বিশ্বস্ত! হ্যাঁ, টাকাকড়ির লেনদেনে তারা তাদের কাছে বিশ্বস্ত হতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই দেশ, এই সমাজ, এই প্রজন্মের জন্য তারা কতটা বিশ্বস্ত? এ প্রশ্নগুলো সমাজের প্রতিটি মানুষেরই ভাবা দরকার।

বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা এগিয়েছে কিছুটা হলেও। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা এগোয়নি। পাক শাসনামলে এই দেশে ব্যাপকভাবে রবীন্দ্র মেলার কথা ভাবাও যেত না। এখন তা পালিত হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ, গ্রীষ্ম মেলা, রবীন্দ্র মেলা, নজরুল উৎসব, স্বাধীনতা উৎসব এমন অনেক সামাজিক উৎসবের বেলুন এখন উড়ছে বাংলাদেশে। সংস্কৃতির এই যে বিকাশ তা রাষ্ট্রের জন্য শুভ সংবাদ তো বটেই। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই যে সংস্কৃতির বিকাশ তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে দেশের করপোরেট ব্যবসায়ীদের দ্বারা। বড় বড় কোম্পানিগুলো স্পন্সর করছে বিভিন্ন উৎসবগুলো। সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করছে রাষ্ট্রের বড় বড় ব্যাংকগুলো। মিডিয়াগুলো এসব পুরস্কারের পার্টনার হয়ে নিজেদের প্রচার-প্রসার বাড়াচ্ছে।

যারা অর্থ সম্পদের মালিক তাদের একটি সামাজিক দায়িত্ব অবশ্যই থাকে। কিন্তু তা হতে হবে নিঃস্বার্থ। সমাজ নির্মাণে যারা ব্রতী তারা বিনিময়ে কিছুই চান না ঠিকই কিন্তু সমাজ তাদের মূল্যায়ন করতে ভুল করে না। পুরস্কার প্রবর্তন কিংবা মিডিয়া মালিক হওয়ার পেছনে যদি নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা তো মহৎ প্রজন্ম নির্মাণে কোন কাজে লাগে না, লাগতে পারে না।

যে কোন অগ্রসরমান সমাজেই পতন এবং পচন আগেও ছিল এখনো আছে। প্রজন্মকে তা যাচাই-বাছাই করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। একটি সমাজ নির্মাণের শর্টকাট কোন পথ খোলা নেই। যা করতে হবে, তাতে ধীশক্তির ছাপ থাকতেই হবে। আর প্রজ্ঞাবান সমাজ গঠনের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছেন বিশ্বস্ত রাজনীতিকরা। যারা দুর্নীতির প্রশ্রয় দেবেন না। যারা প্রজন্মকে নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহার করবেন না। অতি সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ‘ভিসি গ্রুপ’ গোটা রাষ্ট্রের মানুষের জন্যই একটি অশনি সংকেত বয়ে এনেছে। অতি উৎসাহী এমন সরকারি চাটুকাররাই শেষ পর্যন্ত সরকার, সমাজ ও প্রজন্মের জন্য সংকট বয়ে আনেন। বিবেকবান কোন বুদ্ধিজীবী কী এমন নগ্ন কর্মকা-ের নেপথ্য নায়ক হতে পারেন? গোটা জাতিকে এমন লজ্জিত আর কত হতে হবে?

আমরা সমাজের বিশুদ্ধ বিবর্তন চাইছি। অথচ নিজেরা ট্যাক্স দিচ্ছি না। খবরে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের লংমার্চের গাড়ির বহরের টোলট্যাক্স দিয়েছেন দেশের যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এটা তো কোন বিশ্বস্ত রাজনীতির বার্তা হতে পারে না। কোটি কোটি টাকার নমিনেশন বেচাকেনা করবেন। আর সরকারের কয়েক হাজার টাকা সেতু টোল দেবেন না কেন?
বাংলাদেশে বড় বড় পেশাজীবীরা লাখ লাখ টাকা মাসে রোজগার করছেন। কোটি কোটি টাকার প্রোপার্টি বেচাকেনা হচ্ছে প্রতি দিন। এর সঠিক ট্যাক্স কি সরকারকে দেয়া হয়?

আমাদের সমাজের চারপাশে এখন বিষধর অজগরের ফণা। একটি মহল অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা কিনে নিতে চাইছে। আর একটি মহল নিজেদের অস্তিত্ব দেউলিয়া করে দুর্নীতি, সন্ত্রাস লুটপাট, স্বজনপ্রীতির প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রকারন্তরে এরা, সেই পরাজিত মৌলবাদীদের হাতেই রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বন্ধক রেখে দিচ্ছে। যা এই দেশের সামাজিক ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষকে এই অনিশ্চিয়তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিদেশি কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশি কোন প্রভু আমাদের সমাজ নির্মাণ করে দেবে না। এই দেশের মানুষকে মেধাবৃত্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। অর্থ বিত্তের কাছে বিবেক বিসর্জন দিয়ে কেউ রাষ্ট্রের পক্ষে, সমাজের পক্ষে দাঁড়াতে পারে না। এই সত্য উপলব্ধি না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনীতি, অর্থনীতি জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে না। সরকারি চাকরিজীবীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। কোন রাষ্ট্রে ‘সামাজিক ব্যবসা’র স্তর কত নিচে নেমে গেলে সরকারকে এমন উদ্যোগী হতে হয়। বিষয়গুলো আমাদের ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। হ্যাঁ, এটাও ঠিক একজন সরকারি চাকরিজীবী তার অর্জিত বেতনে সংসার চালাতে পারছেন না বলেই তাকে বৈধ, অবৈধ অনেক ব্যবসা করতে হচ্ছে। এর দায়ও রাষ্ট্রের। এসব বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পুনশ্চ : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শেয়ারে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন ১৮ জানুয়ারি জারি করার ২ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার করা হয়।