ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

Golam+Azam

এই ২০১২ সালে একটি চমৎকার সত্য কথা বলেছেন, সাবেক ক্রিকেট তারকা ও পাকিস্তানের রাজনীতিক ইমরান খান। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে পাকিস্তান কিছুই শিক্ষা নেয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধ সংঘটনকারীরা শাস্তি পেলে, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি অন্য রকম হতো। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য কারাভান’-এ চলতি বছরের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ইমরান খান এসব কথা বলেন। তৎকালীন শাসক ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা শাস্তি পেলে আমরা (পাকিস্তান) আবারো একই পথে হাঁটতাম না।’

ইমরান বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি যখন ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে ঢাকায় ছিলেন, বাঙালিদের হত্যার নির্দেশনা দেয়ার বিষয়টি তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে অভিযান শুরুর আগে তিনি শেষ বিমানে করে ঢাকা ছেড়েছিলেন।

১৯৭১ সালে বাঙালি হত্যায় পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের নির্দেশ প্রদান প্রসঙ্গে ইমরান খান বলেন, ‘আমি নিজ কানে শুনেছি, তারা বলেছে, এই বামন ও কালোদের হত্যা করো। তাদের একটা শিক্ষা দাও।’ তবে কে বা কারা কাকে এই নির্দেশ দিয়েছিল, সে সম্পর্কে ইমরান কিছুই বলেননি।

পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের নেতা ইমরান খান জানান, তিনি এখন পাকিস্তানের ভেতরেও একই ধরনের নির্দেশনা শুনছেন। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক একই ধরনের ভাষা। একাত্তরে যা শুনেছিলাম, তা এবারো শুনছি।’ তিনি আরো বলেন, এখন পশতুনরা এই অবহেলার শিকার। পাকিস্তানে পশতুনদের ওপর চলমান নির্যাতন সম্পর্কে ইমরান বলেন, ‘পিন্ডি, লাহোর, করাচিতে তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং জেলে পাঠানো হচ্ছে। কারণ তারা পশতুন। এটা এক দুঃখজনক ধারাবাহিকতা।’ ইমরান জানান, তিনি বিশ্বাস করেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি অপরাধীরা শাস্তি পেলে পশতুনরা আজ হয়রানির শিকার হতো না।

ম্যাগাজিনে বলা হয়, ১৯৭১ সালে ঢাকা সফরের আগ পর্যন্ত ইমরান খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় বিশ্বাস করতেন। ওই প্রচারণায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত-সমর্থিত সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করা হতো। ইমরান খান বলেন, ‘ওই সময় প্রথমবার আমি বুঝতে পারি, সেখানে একটা বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন চলছে।’ তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে কী হচ্ছে, তার কিছুই আমরা জানতাম না।’

ইমরান খানের ভাষ্য থেকে আমরা একটি সত্য জানতে পেরেছি। ’৭১ সালে বাঙালি জাতিকে ‘বামন ও কালো’ বলে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল। হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

ইমরান খান বেশ আগে থেকেই বলে আসছেন একাত্তরে বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। এজন্য এখনো পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তার মতে একাত্তরের নির্মম গণহত্যা ও অত্যাচার-নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতেই হবে। রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা বলেন শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই হবে না, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমাও চাইতে হবে। সেই সঙ্গে ঢাকায় আটকেপড়া পাকিস্তানের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেয়া ও আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে বাংলাদেশের কোনো আর্থিক পাওনা থাকলে তা নিয়েও আলোচনা করতে হবে।

ইমরান খান স্বীকার করে নিয়েছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের কাছ থেকে মুক্তিলাভের চার দশক পর বাংলাদেশ, পাকিস্তানের তুলনায় অনেক শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে। পাকিস্তান দিনকে দিন ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেছেন, তিনি পাকিস্তানের রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তন আনতেই রাজনীতিতে এসেছেন।

হ্যাঁ, বাংলাদেশ গেলো চার দশকে অনেক এগিয়েছে। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে, এই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও একাত্তরের পরাজিত রাজাকার-আলবদর নেতারা ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করেছিলেন।

এসব অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআদালতে অন্যতম সাক্ষী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন ‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলে গোলাম আযম পাকিস্তানে বসে মাহমুদ আলীসহ ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের সূচনা করেন।

পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার আয়োজন করেন এবং ১৯৭২ সালে গোলাম আযম লন্ডনে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে আবার এই ভূখ-কে পাকিস্তানের অংশে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করেন।

১৯৭৩ সালে ফেডারেশন অব স্টুডেন্টস ইসলামিক সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে এবং ব্রিটেনের লেসটারে অনুষ্ঠিত ইউকে ইসলামিক কমিশনের বার্ষিক সভায় তিনি বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা দেন। ১৯৭৪ সালে মাহমুদ আলীসহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির এক বৈঠক করেন। এই সভায় গোলাম আযম ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থেকে ‘কাজ চালানোর’ প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন। এভাবেই গোলাম আযম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছেন।

জামাতের এই নেতার বিরুদ্ধে আরো মারাত্মক অভিযোগ আছে। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে গোলাম আযম রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি যুব সম্মেলনে যোগদান করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত তিনি সাতবার সৌদি বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়ার আহ্বান জানান এবং কখনো তিনি বাদশাহকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে ও কখনো বাংলাদেশকে আর্থিক বা বৈষয়িক সাহায্য না দিতে অনুরোধ করেন। ১৯৭৪ সালে রাবেতায়ে আলমে ইসলামির উদ্যোগে মক্কায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং ১৯৭৭ সালে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। জামাতে ইসলামীর এ সাবেক আমির ২০০২ সালে প্রকাশিত তার নিজ জীবনী ‘জীবনে যা দেখলাম’ বইয়েও এসব কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

গোলাম আযম যে হত্যাকারী ছিলেন, এর সাক্ষ্য দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়। ১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সিরু মিয়া দারোগা (তৎকালীন পুলিশের উপপরিদর্শক) ও তার কিশোর ছেলে আনোয়ার কামালকে (অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র) গোলাম আযমের লিখিত পত্রের নির্দেশে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ অক্টোবর সিরু মিয়া ও তার ছেলে আনোয়ার কামাল মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার সময় অন্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। সিরু মিয়া দারোগা মুক্তিযুদ্ধে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। তিনি প্রবাসী বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী বেগম তাজউদ্দীনকে সপরিবারে কুমিল্লা সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছিলেন।’ বক্তব্যকালে শেখ হাসিনা এ হত্যাকান্ডের নির্দেশ সংবলিত দলিল তার কাছে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। সেই হত্যাকান্ড সংক্রান্ত কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘পাক্ষিক একপক্ষ’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, সংখ্যা ১-এ।

সেখানে বলা হয়, ২৯ অক্টোবর সিরু মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম তাদের মুক্তির জন্য ঢাকায় দূরসম্পর্কের আত্মীয় মহসীনের কাছে আসেন। মহসীন ছিলেন খিলগাঁও সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক এবং গোলাম আযমের দুই ছেলের গৃহশিক্ষক। তার মাধ্যমে গোলাম আযমকে ধরলেন তিনি। গোলাম আযম একটি চিঠি লিখে খাম বন্ধ করে আনোয়ারার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটি কুমিল্লা জেলার রাজাকার কমান্ডারকে দিলে সিরু মিয়াদের ছেড়ে দেয়া হবে।’

আনোয়ারার ভাই ফজলু মিয়া ১ নভেম্বর কুমিল্লায় গেলেন চিঠি নিয়ে। চিঠি পড়ে রাজাকার কমান্ডার বললেন, ঈদের পরদিন কামালকে ছেড়ে দেয়া হবে। আর সিরু মিয়াকে পুলিশে যোগদানের জন্য পাঠানো হবে। ২৩ নভেম্বর ছিল ঈদ। পরদিন ফজলু মিয়া কুমিল্লা জেলখানায় কামালকে আনতে গেলে সেখানে তার হাতে সিরু মিয়া ও কামালের জামাকাপড় তুলে দেয়া হয়। ফজলু মিয়া জানতে পারেন, ঈদের আগে ২১ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিতাস নদীর পাড়ে ৪০ মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে সিরু মিয়া ও তার ছেলে আনোয়ার কামালকে। গোলাম আযমের দেয়া খামবন্ধ চিঠিতে ওই হত্যার নির্দেশ ছিল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গোলাম আযমের সেই চিঠি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেই রয়েছে।

এই যে দলিল, তারপরও কি বলা যাবে, এই পাষন্ড গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল না? না, তা বলার কোনো উপায় নেই। পাকিস্তানিদের আজকের এই পরিণতির জন্যই তারাই দায়ী। কারণ তারা কোনোদিনই গণতন্ত্র মানেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে আবার সামরিক শাসন আসবে। সামরিক শাসন তো এর আগেও এসেছে পাকিস্তানে। জিয়াউল হক, পারভেজ মুশাররফরা তো দেশকে জঙ্গিদের লীলাভূমিতে পরিণত করে গেছেন। বাংলাদেশেও এই চেষ্টা করে যাচ্ছে একাত্তরের সেই পরাজিতরা। ফিরে দেখা যাক সেই ঘটনাগুলো।

জামাত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২৫ অক্টোবর ২০০৭ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী বলে কেউ নেই, কখনো ছিলও না। এসব উদ্ভট ও বানোয়াট কথা। বাংলাদেশের সংবিধানেও যুদ্ধাপরাধের কথা কোথাও বলা হয়নি!! যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বা তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলে সংবিধান লঙ্ঘন করা হচ্ছে।’ তারা এভাবে, ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করেছে। তা না হলে, এই জাতির পরিণতি আরো ভয়াবহ হতো। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রবাহের এই যুগ, বর্তমান প্রজন্মকে রিসার্চ করে অনেক কিছু জানার সুযোগ এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। তা কাজে লাগিয়ে সত্য জানতে হবে। জানতে হবে, বিদেশের বিভিন্ন আর্কাইভে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম সম্পর্কে কী কী ইতিহাস সংরক্ষিত আছে।

ইমরান খান যা বলেছেন, তা তার উপলব্ধির সত্যস্তম্ভ। বাংলাদেশে থাকা পরাজিত রাজাকার নেতারা এখনো এই সত্য মানতে নারাজ। কারণ তারা এখনো বাংলাদেশের ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানকে মেনে নিতে পারছে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে যে চিঠিটি রয়েছে, তা একটি মূল্যবান দলিল। এমন দলিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী বাংলার মানুষের চোখে চোখে। এসব মানুষ হায়েনাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবেন। এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। হতেই হবে ইনশাআল্লাহ।