ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

গণতন্ত্রের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, বিশ্ব কর্তৃক স্বীকৃত। আর তা হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের ভোটে। জনগণের ইচ্ছায়। কোন আরোপিত গণতন্ত্র কিংবা দখলদারিত্বের গণতন্ত্র কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্রের রূপকল্প হতে পারে না। দুঃখের কথা হচ্ছে এই, প্রকৃত গণতন্ত্রের লেবাসে অনেক দেশেই এক ধরনের চক্রান্ত বিরাজ করে। ‘আমরাও গণতন্ত্রী’ এমন ঢাল দেখিয়ে মূলত কিছু রাজনীতিক পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মানস লালন করেন। ষড়যন্ত্রের প্রয়োজনে তারা রক্তারক্তি কা- ঘটাবার চেষ্টা করতেও পিছ পা হন না।

বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি আবারও একটি ক্যু নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন বিশ্বে আলোচিত বিষয়। ১৯ জানুয়ারি ২০১২ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, সামরিক বাহিনী একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ চলমান সরকারের বেশ কিছু শীর্ষ নেতা এই টার্গেটের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। সংবাদগুলো গোটা জাতির জন্য ভয়াবহ তো বটেই। কারণ বিশ্বের নানা দেশে মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী, স্বৈরতন্ত্রী একনায়করা যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা ছেড়ে পালাচ্ছেন তখন বাংলাদেশে একটি জঙ্গিবাদী শক্তি সামরিক কায়দায় সরকার উৎখাতের পাঁয়তারা করছে!

১৯৭৫ পরবর্তী, বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক শক্তিকে একটি মহল বরাবরই স্বাগত জানিয়েছে। এরা কারা, কারা তা থেকে ফল ভোগ করেছে তা এই দেশের মানুষের অজানা নয়। এর নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণটি হচ্ছে, একাত্তরে পরাজয়ের প্রতিশোধ। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়কে মেনে না নেওয়ার শোক ভুলতে পারছে না। না পারার কারণেই ‘গণতন্ত্রের চেয়ে সামরিকতন্ত্র কিংবা জঙ্গিতন্ত্র উত্তম’ এমন স্লোগান তারা বার বার দিচ্ছে ঘরে বাইরে।

বাংলাদেশে জামায়াত-বিএনপি চারদলীয় জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তারা জঙ্গিবাদী বিভিন্ন গ্রুপকে তাদের ‘বি-টিম’ হিসেবে তৈরি রেখেছিল, তা কালে বারবারই প্রমাণিত হচ্ছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গিবাদী পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার পরপরই তারা দেশে বিশৃঙ্খলা ঘটানোর জন্য নানাভাবে সক্রিয় হতে থাকে। এটা শঙ্কার কথা, একটি রাজনৈতিক ছত্রছায়া তাদের অতীতের মতো এখনো মদত দিচ্ছে।

১৯ জানুয়ারির সেনাসদরের ব্রিফিংয়ে যা বেরিয়ে এসেছে তার সারকথা হচ্ছে, অভ্যুত্থানকারীদের অনেকেই ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদিত্বে বিশ্বাসী। এরপর পরই হিযবুত তাহ্রীর নামে একটি ধর্মীয় খেলাফতবাদী গ্রুপের সদস্যদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গ্রেফতারের ঘটনা আমরা দেখছি। তাদের কাছে জেহাদি তরিকার বইপত্র, মেনোফেস্টো ইত্যাদিও পাওয়া যাচ্ছে। তাই সঙ্গতকারণে প্রশ্ন আসছে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের পর তালেবানি শক্তি কি বাংলাদেশের ওপর জোরেশোরে ভর করতে চাইছে?

ঘটনা পরম্পরায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু শীর্ষ নেতা মুখোমুখি বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ভারত সরকার নাকি যে কোন মূল্যে শেখ হাসিনা সরকারের পাশে থাকবে।

এখানে যে বিষয়টি না বললেই নয় তা হচ্ছে, ভারতের আনন্দবাজার গ্রুপটি সব সময়ই একটি মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থা। তাদের কাজই হলো আজগুবি, কাল্পনিক সংবাদ পরিবেশন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়, গর্হিত কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কি স্বয়ং এমন কোন ঘোষণা দিয়েছেন? না, দেননি। তাহলে আনন্দবাজার পত্রিকা অতি উৎসাহী হয়ে এমন সাংবাদিকতা করছে কোন হলুদ সাংবাদিকতার মাথা খেয়ে? তারা বিষয়টিকে উসকে দিচ্ছে কিংবা দিতে চাইছে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ঢাকায় যখন (ডিসেম্বর ১৫, ২০১১-জানুয়ারি ১৫, ২০১২) একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কালো মেঘ উড়ছে তখন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ নির্দয়ভাবে বাংলাদেশি মানুষকে মারধর করেছে। হাবিব নামে একজন বাংলাদেশিকে নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বের বিবেককে দংশন করেছে। লুৎফর রহমান নামের একজন বিজিবি সদস্যকে রক্তাক্ত করেছে বিএসএফ। যা অত্যন্ত অমানবিক, নীতিবর্জিত কাজ। প্রশ্ন জাগে চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, মায়ানমারসহ ভারতের প্রতিবেশী আরও যে দেশগুলো রয়েছে ওদের সঙ্গে তো ভারত এমন অমানবিক আচরণ করছে না। বাংলাদেশের প্রতি তারা এমন গুরুসুলভ আচরণ কেন করছে? এর কারণ কী?

সীমান্তে সংঘাত বিষয়ে অর্বাচীন বক্তব্য দিয়েছেন বর্তমান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সীমান্ত ইস্যু নিয়ে সরকার ভাবিত নয়। সরকার কেন ভাবিত কিংবা চিন্তিত নয়? বাংলাদেশি হাবিব যদি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়েও থাকে, তার বিচার হতে পারে। দুই দেশের সীমান্ত অতিক্রম তো প্রতিদিনই হচ্ছে। হাজার হাজার লোক প্রতিদিন যাতায়াত করছে। মানি, তা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। কিন্তু তাই বলে দুর্বৃত্তের মতো সীমান্ত পার হওয়া ব্যক্তির সবকিছু কেড়ে নেয়া হবে, তাকে অমানুষিকভাবে, বর্বরতম কায়দায় নির্যাতন করা হবে তা কোন সভ্য দেশই মেনে নিতে পারবে না। এমন কাজ কোনভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।

সমর্থনযোগ্য নয় বিজিবি সদস্য লুৎফুর রহমানের প্রতি বিএসএফের নির্যাতনও। তারপরও রাষ্ট্র চিন্তিত নয় কেন? কেন একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী এমন কা-জ্ঞানহীন কথাবার্তা বলবেন? এলজিআরডিমন্ত্রী আরও সংযত, বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলতে পারতেন। যে কোন জ্বলন্ত ইস্যু নিয়ে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করবেনই। তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে উত্তর দিতে বাধ্য এবং তা হওয়া দরকার জনগণের ইচ্ছার অনুকূলে। হওয়া উচিত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে।

সৈয়দ আশরাফ এমন কথা বলে মূলত ভারতবিরোধী একটি গোষ্ঠীর পালে হাওয়া দিয়েছেন। দেশে যখন ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টায় একটি চক্র সক্রিয়, তখন ভারতবিরোধী মৌলবাদী একটি মহল তাদের পাশেই দাঁড়াচ্ছে প্রকারান্তরে। কারণ বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অজানা নয়, ‘ভারত বাংলাদেশ নিয়ে নিল’ এমন বক্তব্য দিয়ে সেই চক্র অতীতে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। এখনো করতে চাইছে। তাদের আহার জোগাবার জন্য সৈয়দ আশরাফের এমন বক্তব্য কার্যকর তো বটেই। তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য জাতি কোন মতেই প্রত্যাশা করেনি।

বর্তমান সরকার কঠিন সময় পার করছে, তা মহাজোটের এমপিরাই বলছেন। সরকার শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে পারেনি। এটা তাদের চরম ব্যর্থতা। অর্থনীতির পঙ্গুত্ব একটি সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামায়। সরকার পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বের বেশ ক’টি দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির চরম বিপর্যয় সরকারের জন্য কাল হয়েছে, যে নজির আমরা দেখছি।

বর্তমান সরকারের তিন বছরপূর্তি সময়ে এসে একটি উৎখাত প্রচেষ্টা সেনাবাহিনী প্রতিহত করতে পেরেছে। এর জন্য সেনাবাহিনী, সম্মিলিত সামরিক বাহিনী অভিবাদন পাওয়ার দাবিদার। রাষ্ট্রের কল্যাণে, প্রজন্মের কল্যাণে তাদের এই পাহারা দেশবাসীকে সাহসী করেছে। যারা এই উৎখাত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই হবে। যারা সামরিক সদস্য তাদের সামরিক আইনে আর বেসামরিক কেউ ইন্ধনদাতা থেকে থাকলে, তাদের রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। সর্বোচ্চ শাস্তিত্ম প্রদান করতে হবে।

মনে রাখা দরকার, সময়টি বর্তমান সরকারের জন্য খুব অনুকূল নয়। সরকারের কিছু কিছু নীতিনির্ধারক বলে বেড়াচ্ছেন, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখছি, উৎখাতবাদী কালো শক্তি বর্তমান সরকারেরই কিছু সিনিয়র নেতার হাতে নাকি রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিতে চেয়েছিল। আমাদের মনে আছে, জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর মোশতাক মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকেই মন্ত্রী করা হয়েছিল। এরপরই দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। খুনিরা নিজ নিজ রূপে আবির্ভূত হয়ে ক্ষমতার হিস্যা বুঝে নেয়। বর্তমান সরকারের ভেতরে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব লাগিয়ে উৎখাতবাদীরা তৎপর হতে পারে- তা সরকারের না জানার কথা নয়। সব অপশক্তি এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে প্রজ্ঞার সঙ্গে। তাই দায়িত্বশীলদের সব কথাবার্তাই হওয়া উচিত ইস্পাতদৃঢ় এবং পরিমিত।

উৎখাতবাদী কালো শক্তিকে রুখতে রাষ্ট্রের প্রতিটি অবকাঠামো নিয়েই সরকারকে ভাবতে হবে। রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাগার, আইটি সিস্টেম, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ জরুরি বিভাগগুলোতে নবীন কাউকে চাকরিতে নিয়োগ দেয়ার আগে তার ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ আবশ্যিক করতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কোন ক্রিমিনাল, কিংবা উগ্রবাদীকে সেই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে পারে না। যে অশনিসংকেতের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা রুখতে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে চৌকস হয়ে। কে শত্রু কে মিত্র তা পরখ করা সবসময়ই ফার্স্ট প্রায়োরিটি হতে হবে।

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত